নারী অধিকার, প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ


প্রকাশিত :১৩.১১.২০১৭, ১১:১৫ পূর্বাহ্ণ

ইসরাত জাহান সিদ্দিকী

নারী ও পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীরা নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। যখন মানবাধিকারের কথা আমরা বলছি তখন দেখছি সেই মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় নারী অধিকার উপেক্ষিত রয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যদিও উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে কিন্তু এখনও আমরা বাংলাদেশে বিভিন্ন বৈষম্যমূলক আইন দেখতে পাই। এছাড়াও বাংলাদেশের পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রধান অন্তরায় হয়ে আছে।

২০১৭ সালের “হিউম্যান রাইটস সামার স্কুলের” ১৮তম আয়োজনের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছিল “মানবাধিকার ও নারী” যেখানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা সফলতার সাথে অংশগ্রহণ করে। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিভাগটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে সফলতার সাথে বিভিন্ন ধরনের সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের পরিসরে বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের গ্রহণযোগ্যতা যেমন তৈরি হচ্ছে তেমনি তারা নিজেদেরকে তৈরি করে নিতে পারছে বিভিন্ন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে। এরই ধারাবাহিকতায় ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের ৩ জন শিক্ষার্থী ২০১৭ সালে আয়োজিত “হিউম্যান রাইটস  সামার স্কুলে” সফলতার সাথে অংশগ্রহণ করে।

ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১৮তম সামার স্কুলে অংশগ্রহণের সার্কুলারটি পাবার পর নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি শিক্ষামূলক কার্যক্রমে তুলে ধরার সুযোগ পেয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। যেহেতু এই কার্যক্রম সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজন করা হয় তাই সবার অংশগ্রহন সম্ভব ছিল না। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে এই কার্যক্রমের জন্য অংশগ্রহণকারীদের নির্বাচন করা হয়। আনন্দের বিষয় হচ্ছে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে এই সামার স্কুলের নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর তাসমিয়া যূথী, জান্নাতুল শরীয়াত দিশা এবং আমি চূড়ান্তভাবে এই প্রশিক্ষন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাই যা আমাদের প্রত্যাশা ও আনন্দের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

“হিউম্যান রাইটস সামার স্কুল” বিশ্বাস করে আইন অঙ্গনের মানুষদের যথাযথ অবদানই পারে প্রকৃত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। আইনের শিক্ষার্থীরা অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যেমন করতে পারে তেমনি তারা সাধারন মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে করে তুলতে পারে সচেতন। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষার্থীদের সঠিক প্রশিক্ষণ। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০০০ সাল থেকে “হিউম্যান রাইটস সামার স্কুল”-এর আবাসিক প্রশিক্ষন কার্যক্রম আয়োজন করে আসছে “এমপাওয়ারমেন্ট থ্রু ল’ অব কমন পিপল (এলকপ)”।

“মানবাধিকার ও নারী” বিষয়টিকে সামনে রেখে সামার স্কুলের ১০দিন ব্যাপী আবাসিক কার্যক্রমকে সাজানো হয় যেখানে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ বিভিন্ন অধিবেশন পরিচালনা করেন। এ বছর সামার স্কুল মানিকগঞ্জের প্রশিকা এইচ.আর.ডি.সি ট্রাস্টে ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ই অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। সামার স্কুলের এই আয়োজনে বাংলাদেশ ও নেপালের ১৫টি সরকারী ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৪২ জন শিক্ষার্থী সফলভাবে অংশগ্রহণ করে।

১০ দিনের জন্য আয়োজিত এই সামার স্কুলে মূলত বিভিন্ন শ্রেণি কার্যক্রম, দলীয় অনুশীলন, দলভিত্তিক আলোচনা, মাঠ প্রদর্শনী ও শ্রেণীমূলক শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রতিপাদ্য বিষয়টি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানানো হয়। নারী অধিকার নিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে ও আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে আমরা জানতে পারি।

১০দিন ব্যাপী এই কার্যক্রমের একদিন ছিল মাঠ পরিদর্শনের ব্যবস্থা। মানিকগঞ্জের কইট্টা গ্রামের নারীদের পারিবারিক, সামাজিক, শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে জানা ছিল এই পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য। দিনব্যাপী এই পরিদর্শনের ফলাফলে বাংলাদেশের নারীদের যে আর্থসামাজিক অবস্থা উঠে আসে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। যদিও পূর্বের তুলনায় নারীদের শিক্ষার হার এখন বেশি ও তারা বিভিন্ন পেশায় কাজ করছে ঘরে-বাইরে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় নারীদের মূল্যায়ন করা হচ্ছেনা। এমনকি শিক্ষার ক্ষেত্রেও পরিবারের সিদ্ধান্তকেই তাদের মেনে নিতে হচ্ছে। পরিবারের মানুষদের মাঝে এখনও ধারণা যে যৌতুক দেয়া মেয়ের বাবা-মায়ের দায়িত্ব কারন তারা মনে করে যৌতুক দেয়ার মাধ্যমে তাদের মেয়ে সুখে থাকবে। সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার কথা আমরা বলি ঠিকই কিন্তু কাজের মজুরীর ক্ষেত্রে আমরা জানি নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা সমপরিমান মজুরি পায়না। এই সবগুলো বিষয়ই মাঠ পরিদর্শন থেকে উঠে আসে। এসব সমস্যার সম্ভাব্য সমাধান ও উঠে আসে মাঠ পরিদর্শন পরবর্তী দলীয় অনুশীলনের মাধ্যমে।

সামার স্কুলের এই ১৮তম আয়োজনে আমার মনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ এর পরিচালিত অধিবেশনটি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও নারীদের অবস্থান নিয়ে সিডো সনদ (কনভেনশন অন এলিমিনেশন অব ডিসক্রিমিনেশন অন ওমেন, ১৯৭৯) এর ভূমিকা নিয়ে ড. তুরিন আফরোজ এর আলোচনায় আমাদের সামনে উঠে আসে এই সনদের বিভিন্ন ইতিবাচক দিক এবং কিছু ক্ষেত্রে এই সনদের প্রয়োগের যথাযথ অভাব। ইতিবাচক দিক হিসেবে আমরা দেখতে পাই যে বাংলাদেশ এই সিডো সনদের উপর ভিত্তি করে নারীবান্ধব বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন নারী উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ এবং একইসাথে আইন প্রণয়ন করেছে। ২০০০ সালে গৃহীত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনটি সিডো সনদেরই প্রতিফলন। কিন্তু বাংলাদেশ এই সিডো সনদের ২টি অনুচ্ছেদ এ এখনও রিজার্ভেশন দিয়ে রেখেছে অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ২টি অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করা হবে না। সিডো সনদের ২ নং অনুচ্ছেদ এ বলা হয়েছে জাতীয় পর্যায়ে নারী পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করার কথা। অন্যদিকে অনুচ্ছেদ ১৬ এ বিয়ে ও পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দূর করার মাধ্যমে নারী পুরুষের সমতা আনয়নের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উপর দায়িত্ব অর্পণ করে।

বাংলাদেশের এই ২টি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদে রিজার্ভেশন রাখার ব্যাপারটি বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ হওয়াকেই ইঙ্গিত করে। শারিয়াহ আইন অনুযায়ী শুধুমাত্র আমাদের পারিবারিক ব্যাপার গুলোর মীমাংসা হয়। অন্য সকল ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই আমাদের জাতীয় আইনই বহাল থাকছে সবার জন্য। কিন্তু অনুচ্ছেদ ২ এর প্রয়োগের ফলে আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৯, ২৭, ২৮ এবং ২৯ এর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না যা সংবিধান লঙ্ঘনের সমতুল্য। আমরা যদি অন্যান্য মুসলিম প্রধান রাষ্ট্রের দিকে তাকাই তখন আমরা দেখতে পাই যে অনেক রাষ্ট্র মুসলিম প্রধান হওয়া সত্ত্বেও সিডো সনদকে পুরোপুরিভাবে গ্রহণ করেছে। সিডো সনদকে রিজার্ভেশন ছাড়া গ্রহণ না করা বাংলাদেশের একটি ব্যর্থতার জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ যেখানে নারীর ক্ষমতায়নের জন্য ও সম-অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন নীতিমালা গ্রহণ করছে এবং আইন প্রণয়ন করছে এমন একটি সময়ে এসে বাংলাদেশের সিডো সনদের পূর্ণ সমর্থন না করা বাংলাদেশে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারী ও পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা বাঁধার সম্মুখীন হচ্ছে।

“হিউম্যান রাইটস সামার স্কুল” শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করার যে প্রচেষ্টা সৃষ্টি করতে পেরেছে তা সম্ভব হয়েছে আয়োজনটির বৈচিত্র্যতার জন্য। নারী অধিকার নিয়ে আমার ও আমার অন্যান্য সহপাঠীদের চিন্তা করার ধরন পাল্টে গেছে। এখন আমরা যেমন চিন্তা করতে পারছি সিডো সনদের সাফল্যগুলো দেখতে একইসাথে এর ব্যর্থতার জায়গাটুকু ও বুঝতে পারছি। শুধুমাত্র সিডো সনদ নয়, এছাড়াও আরও বিভিন্ন সামাজিক, আর্থিক প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে আমাদের সামনে যা নারী অধিকার তথা প্রকৃত মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে যা মোটেই কাম্য নয়।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ; ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon