যুদ্ধাপরাধ: বাঙালি ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে, শর্ত সাপেক্ষে জামিন


প্রকাশিত :১৪.১১.২০১৭, ৩:০৯ অপরাহ্ণ

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালিদের সহযোগিতা না করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে কুমিল্লায় হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত হওয়া ক্যাপ্টেন (অব.) মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্’র বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে এক বছর তিন মাস ধরে কারাগারে থাকা শহীদুল্লাহকে শর্ত সাপেক্ষে জামিন দিয়েছেন আদালত।

আজ মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলামের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের হয়ে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম ও আবুল কালাম। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান ও মাসুদ রানা। মামলার পরবর্তী শুনানি ১১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে।

তার জামিনের বিষয়টি আইনজীবী মাসুদ রানা গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন।

তিনি জানান, ওই সেনা কর্মকর্তার জামিন শর্তের মধ্যে রয়েছে- দুই লাখ টাকার বন্ড, পাসপোর্ট জমা রাখা, একজন আইনজীবী ও নিকটাত্মীয়ের জিম্মায় ঢাকায় বসবাস এবং মিডিয়ার সঙ্গে কথা না বলা।

ক্যাপ্টেন শহীদুল্লাহর বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ১১ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আলতাফুর রহমান তদন্ত শুরু করেন। ২১ মার্চ তদন্ত শেষ হয়। ওইদিন ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বিরুদ্ধে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, নির্যাতন ও অগ্নিসংযোগের তিনটি অভিযোগ আনা হয়। মামলায় মোট সাক্ষী ২১ জন।

২০১৬ সালের ২৪ জুলাই এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২ আগস্ট ওই আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। সেদিন কুমিল্লার দাউদকান্দির আমিরাবাদ গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে তাকে গ্রেফতার করে দাউদকান্দি থানা পুলিশ। ওইদিন কুমিল্লা জেলা পুলিশ তাকে গ্রেফতার দেখায়। ৩ আগস্ট আসামিকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

মামলার প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামি ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (৭৫) মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে থেকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি ঢাকা সেনানিবাসে যোগ দেন। পরে ঢাকা থেকে কুমিল্লার সেনানিবাসে যোগ দিয়ে নিজ এলাকা দাউদকান্দি সদরে ক্যাম্প স্থাপন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় ওই এলাকায় আটক, নির্যাতন, অপহরণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেন তিনি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার পর ১৯৬৯ সালে তিনি ক্যাপ্টেন হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৭০ সালে তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পোস্টিং দেয়া হয়।

পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে তিন অভিযোগ

১৯৭১ সালের ৭ জুন শহীদুল্লাহ পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর ৮/১০ জন সদস্যসহ দাউদকান্দি বাজারে একটি হোমিও ওষুধের দোকানে হামলা চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ডা. হাবিবুর রহমানকে আটক করে দাউদকান্দি সেনা ক্যাম্পে নির্যাতন করেন। পরে দাউদকান্দি ফেরিঘাট সংলগ্ন গোমতি নদীতে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয় এবং মরদেহ নদীতে ফেলে দেয়া হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ জুন শহীদুল্লাহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ৪০/৫০ জন সদস্যসহ চেঙ্গাকান্দি ও গোলাপেরচর গ্রামে নিরীহ ও নিরস্ত্র ২০ জনকে আটক করে নির্যাতন, পাঁচটি বাড়ির মালামাল লুণ্ঠন ও আগুন দেয়। আটক ২০ জনের মধ্যে ছয়জনকে ছেড়ে দিয়ে ১৪ জনকে গোমতী নদীর কিনারে নিয়ে যায়। সেখানে শহীদুল্লাহ একজনকে গুলি করে হত্যা করে এবং মরদেহ নদীর কিনারে ফেলে দেয়। বাকি ১৩ জনকে নৌকাযোগে দাউদকান্দি ক্যাম্পে নিয়ে নির্যাতন করে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের খবরা-খবর দিতে এবং হত্যার ঘটনা কাউকে না জানানোর শর্তে সন্ধ্যার আগে ছেড়ে দেয়।

১৯৭১ সালের ২১ জুলাই শহীদুল্লাহ পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে দাউদকান্দি বাজারে হামলা চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরীহ নিরস্ত্র ড্রাইভার কালা মিয়াকে আটক এবং নির্যাতন করে পাকিস্তানি সেনাদের গাড়িতে তুলে দেয়। পরে তাকে চান্দিনা হাসপাতালের পেছনে নিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যার পর তার মরদেহ খালে ফেলে দেয়া হয়।

 

সুপ্রিমকোর্ট প্রতিনিধি/ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon