• প্রচ্ছদ » আর্টিকেল » স্ত্রীর গর্ভপাতের সিদ্ধান্তে স্বামীর অনুমতি নিষ্প্রয়োজন বনাম আমাদের বিচার ব্যবস্থা



স্ত্রীর গর্ভপাতের সিদ্ধান্তে স্বামীর অনুমতি নিষ্প্রয়োজন বনাম আমাদের বিচার ব্যবস্থা


প্রকাশিত :১৪.১১.২০১৭, ১২:১৭ অপরাহ্ণ

সিরাজ প্রামাণিক

গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নারীর একার; স্বামীর অনুমতির আর প্রয়োজন নেই বলে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি রায় দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী যদি তাঁর গর্ভের ভ্রূণকে জন্ম দিতে না চান, তাহলে সেই সিদ্ধান্তে অন্য কারও হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। দেশটির প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র সহ তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ এক ব্যক্তির আবেদন ২৮ অক্টোবর’২০১৭ খারিজ করে দিয়ে এই রায় দিয়েছেন। আদালত জানিয়েছেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী যদি তাঁর গর্ভের ভ্রূণকে জন্ম দিতে না চান, তাহলে সেই সিদ্ধান্তে অন্য কারও হস্তক্ষেপ করার কোনো অধিকার নেই। উল্লেখ্য, ভারতীয় আইনে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ২০ সপ্তাহ পর গর্ভপাত নিষিদ্ধ।

১৯৯৪ সালে ওই দম্পতি বিয়ে করেন। পরের বছর তাঁদের পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। দাম্পত্য কলহের কারণে সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী ১৯৯৯ সাল থেকে তাঁর বাবার বাড়ি চণ্ডীগড়ে থাকেন। বিয়ে বিচ্ছেদের মামলা চলাকালে চণ্ডীড়ের একটি আদালত ওই নারীকে আবার কিছুদিন স্বামীর বাড়িতে একসঙ্গে থেকে বিষয়টি মীমাংসা করে নেওয়ার নির্দেশ দেন। ২০০২ সাল থেকে তাঁরা একসঙ্গে থাকা শুরু করেন। ২০০৩ সালে তিনি আবারও অন্তঃসত্ত্বা হন। কিন্তু এতেও তাঁদের দাম্পত্য সম্পকেঅর কোনো উন্নতি না হওয়ায় গর্ভপাত করাতে চান ওই নারী। কিন্তু এতে বাঁধা দেন স্বামী। পরে ওই নারীর বাবা তাঁকে স্বামীর বাড়ি থেকে চণ্ডীগড়ে নিয়ে যান। সেখানে চ-ীগড় হাসপাতালে তিনি গর্ভপাত করান। কিন্তু স্বামী হিসেবে হাসপাতালের কাগজপত্রে ওই ব্যক্তি কোনো সম্মতিসূচক কোনো স্বাক্ষর করেননি।

অনুমতি না নিয়েই গর্ভপাত করানোর কারণে বাবা হিসেবে যে মানসিক যন্ত্রণা পেয়েছেন এর ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন ওই ব্যক্তি। তিনি স্ত্রী, তাঁরা বাবা, ভাই ও চ-ীগড় হাসপাতালের দুই চিকিৎসকের কাছে ৩০ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন। তাঁর দাবি, অনাগত সন্তানের বাবাকে না জানিয়ে ও কোনো প্রয়োজন ছাড়াই গর্ভপাত ঘটানো আইনের দৃষ্টিতে অবৈধ ও অপরাধ। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট ওই ব্যক্তির আবেদন খারিজ করে দেন। পরে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। সুপ্রিম কোর্টও একই রায় দেন।

সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছেন, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী যদি তাঁর গর্ভের ভ্রূণকে জন্ম দিতে না চান, তাহলে সেই সিদ্ধান্তে অন্য কারও হস্তক্ষেপের কোনো অধিকার নেই। এমনকি মানসিক ভারসাম্যহীন কোনো নারীও চাইলে গর্ভের ভ্রূণের গর্ভপাত করাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর একার পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট আরও জানিয়েছেন, সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য একজন নারীর মানসিক প্রস্তুতি দরকার। অপ্রত্যাশিত সন্তানের জন্ম নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তাই গর্ভের সন্তান রাখবেন না-কি গর্ভপাত করাবেন তা অন্তঃসত্ত্বা একাই সিদ্ধান্ত নেবেন। এই রায় দেওয়ার পাশাপাশি আদালত ওই মামলার বিবাদীদের (স্ত্রী, স্ত্রীর বাবা, ভাই ও দুই চিকিৎসককে) প্রত্যেককে ২৫ হাজার রুপি করে ক্ষতিপূরণ দিতে মামলাকারী ব্যক্তিকে নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে ৩১ মে’২০১৭ তারিখে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ভ্রুন হত্যার অভিযোগে স্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন স্বামী আবুল কালাম। কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট মো: মনিরুজ্জামান এর আদালত ফরিয়াদীর অভিযোগ গ্রহন করে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য প্রশাসককে তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। ওই দম্পতির বিয়ের কিছুদিন পর স্ত্রী ৬ সপ্তাহের অন্তস্বত্তা হয়ে পড়ে। অত:পর আসামীরা অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার জন্য বাদীর উপর চাপ সৃষ্টি করে বাদীর অজান্তে গ্রাম্য ডাক্তার মো: নাজমুল হাসান এর মাধ্যমে ভ্রুন হত্যার অপরাধ করে।

বাংলাদেশ দন্ডবিধি আইনের ৩১২ থেকে ৩১৬ ধারা পর্যন্ত গর্ভপাত সংক্রান্ত আইন ও সাজার কথা বলা হয়েছে। ৩১২ ধারায় বলা হয়েছে কোন নারী গর্ভপাত ঘটালে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তিন বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ড বা জরিমানা বা উভয় প্রকার শাাস্তি পেতে পারে।

৩১৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীলোকটির সন্মতি ছাড়া গর্ভপাত ঘটায়, তাহলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাবাস, জরিমানা বা দশ বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত হতে পারেন।

৩১৪ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি স্ত্রীলোকটির সন্মতি ছাড়া গর্ভপাত ঘটাইবার উদ্দেশ্যেজনিত কার্যে মৃত্যু ঘটায়, তাহলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাবাস বা উপযুক্ত দন্ডে দন্ডিত হবে।

৩১৫ ধারায় বলা হয়েছে, শিশু যাহাতে জীবন্ত জন্মিতে না পারে, বা উহা যাতে জন্মের পর পর মারা যায় সেই উদ্দেশ্যে কোন কার্য করিলে উক্ত ব্যক্তি দশ বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ড বা জরিমানা বা উভয় প্রকার শাস্তি পেতে পারে।

৩১৬ ধারায় বলা হয়েছে, এমন কোনো কার্য দ্বারা আসন্ন প্রসব গর্ভস্থ সন্তানের মৃত্যু ঘটানো, যাহা অপরাধজনক প্রাণনাশ বলিয়া গণ্য হয়, এমন কোনো কার্য করিলে উক্ত ব্যক্তি দশ বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদন্ড ও জরিমানা দন্ডে দন্ডিত হবে।

বাংলাদেশের গর্ভপাত-সংক্রান্ত অধিকাংশ আইন মূলত ব্রিটিশ আমলের ১৮৬০ সালের পেনাল কোড থেকে আসা। তবে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী গর্ভপাত আইনের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিলতা আনা হয়। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন তাদের জন্য গর্ভপাত বৈধ করা হয়েছিলো। এছাড়া, ১৯৭৯ সালে মাসিক নিয়মিতকরণ বা নারীদের ঋতুস্রাব নিয়মিত করার জন্য গর্ভপাত বৈধ করা হয়। গর্ভধারিণীর জীবন রক্ষায় গর্ভপাত বৈধ বলা হলেও নানা জটিলতার সম্মুখীন হন একজন নারী। যেমন, গর্ভধারিণী জীবনসংকটাপন্ন কোনো রোগে আক্রান্ত কি-না তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেই তবে বৈধভাবে গর্ভপাত ঘটানোর চেষ্টা করতে হয়।

এছাড়া, নারীর গর্ভপাত একজন নারীর জন্মগত অধিকার হওয়া উচিত, নারীর শরীর নারীরই। প্রজনন দুটো মানুষের ফসল। কাজেই বাংলাদেশের গর্ভপাত-সংক্রান্ত আইন মূলত বৈষম্যমূলক এবং আন্তর্জাতিক সার্বজনীন মানব অধিকারের বিপক্ষে। যে আইন মানবাধিকার রক্ষা করতে পারে না, যে আইন মানুষকে স্বাধীনতা বঞ্চিত করে, যে আইন সংবিধান সমুন্নত রাখতে পারে না, সেই আইন আর যাই হোক নারীর অধিকার ও সুবিধা-অসুবিধা রক্ষা করতে সক্ষম এ কথা বিশ্বাস করার কোনো যৌক্তিক অবকাশ নেই। কাজেই মানবিকতার দিক দিয়ে হলেও এ আইনের শীঘ্রই সংশোধনের প্রয়োজন।

 

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, গবেষক ও আইন গ্রন্থ প্রণেতা।



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon