দুদককে সুপ্রিম কোর্টের দেয়া চিঠি নিয়ে হাইকোর্টের ৭ পর্যবেক্ষণ


প্রকাশিত :১৫.১১.২০১৭, ১১:২০ পূর্বাহ্ণ

আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগের অনুসন্ধান বন্ধে দুদককে সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসনের পাঠানো চিঠির বিষয়ে জারিকৃত রুল নিষ্পত্তি করে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। রায়ে সাত দফা পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলা হয়, ‘যদিও চিঠিটি সুপ্রিমকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে মামলা থেকে দায়মুক্তি দেওয়ার বার্তা দেয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একমাত্র রাষ্ট্রপতি তার মেয়াদকালীন সময়ের জন্য ছাড়া অন্য কেউ দায়মুক্তি পেতে পারে না।’ বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. সহিদুল করিমের বেঞ্চ গতকাল এ রায় দেন।

বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে দুদক ২ মার্চ সুপ্রিমকোর্টকে চিঠি দেয়। এর জবাবে আপিল বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার অরুণাভ চক্রবর্তীর স্বাক্ষরে ২৮ মার্চ এ বিষয়ে তদন্ত করা ‘সমীচীন’ হবে না উল্লেখ করে দুদককে পাল্টা চিঠি দেওয়া হয়। এ চিঠিটি হাইকোর্টের নজরে আনেন আইনজীবী বদিউজ্জামান তরফদার। এর পর আদালত গত ১০ অক্টোবর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করে ওই চিঠি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চান। এ বিষয়ে চূড়ান্ত শুনানি শেষে গতকাল রায় দেওয়া হয়।

রায়ে আদালত বলেছেন, ‘চিঠিটি ইস্যু করার পরও সুপ্রিমকোর্ট প্রশাসন ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য দুদককে সরবরাহ করেছে। একই সঙ্গে দুদক তার অনুসন্ধান প্রক্রিয়া চলমান রেখেছে। এসব বিবেচনায় নিয়ে আমরা রুল নিষ্পত্তি করে পর্যবেক্ষণ দিচ্ছি।’ এর পর আদালত সাত দফা পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

প্রথম দফায় বলা হয়, ‘যেহেতু আপিল বিভাগ তার প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে চিঠিটি ইস্যু করেছে, সে কারণে এটি বিচারিক পর্যালোচনার দাবি রাখে। রুলটি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য।’

দ্বিতীয় দফায় বলা হয়েছে, ‘চিঠিটি ইস্যু করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কিছু অপ্রাসঙ্গিক ও অগ্রহণযোগ্য বিষয়কে বিবেচনায় নিয়েছে, যা ওই কর্তৃপক্ষের সুনামকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’

তৃতীয় দফায় বলা হয়, ‘আপিল বিভাগের দপ্তর থেকে প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে পাঠানো চিঠিটি নিছক দাপ্তরিক যোগাযোগ এবং এটাকে সর্বোচ্চ আদালতের মতামত হিসেবে চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই।’

চতুর্থ দফায় বলা হয়েছে, ‘জনগণের চোখে এ চিঠি দেশের উচ্চ আদালতের সম্মান ও মর্যাদাকে দুর্বল ও ক্ষুণ্ণ করেছে।’

পঞ্চম দফায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি ব্যতীত অন্য কেউ দায়মুক্তি পেতে পারে না।’

ষষ্ঠ দফায় বলা হয়েছে, ‘আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি জয়নুল আবেদীনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান প্রক্রিয়া আদৌ সন্তোষজনক নয়। কারণ তারা দীর্ঘ সাত বছরেও অনুসন্ধান শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে।’

সপ্তম দফায় বলা হয়েছে, ‘কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের বিরুদ্ধে তদন্ত বা অনুসন্ধান পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ বা এজেন্সির বাড়তি সতর্কতা ও তদারকি থাকা উচিত। এটি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। এর সঙ্গে বিচার বিভাগের মর্যাদার পাশাপাশি বিচারের মান, জনগণের আস্থা এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেসব বিষয় জড়িত থাকে।’

জানা যায়, জয়নুল আবেদীন ১৯৯১ সালে হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। পরে ২০০৯ সালে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে অবসরে যান। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সন্দেহে ২০১০ সালের ১৮ জুলাই সম্পদের হিসাব চেয়ে তাকে নোটিশ দেয় দুদক। দুদকের দেওয়া ওই নোটিশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে বিচারপতি জয়নুল আবেদীন ২০১০ সালের ২৫ জুলাই হাইকোর্টে একটি রিট করেন। রিটের শুনানি নিয়ে একটি বেঞ্চ বিষয়টি উত্থাপিত হয়নি বিবেচনায় খারিজ করে দিয়েছিলেন। এর সাত বছর পর ফের এ বিচারপতির বিরুদ্ধে বিদেশে ‘অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে’ উল্লেখ করে তার বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য সুপ্রিমকোর্টের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চেয়ে চলতি বছরের ২ মার্চ চিঠি দেয় দুদক।

 

সুপ্রিমকোর্ট প্রতিনিধি/ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon