৫ বছর ধরে বিনা বিচারে বন্দি সাড়ে পাঁচশ’


প্রকাশিত :১৫.১১.২০১৭, ১১:৩৫ পূর্বাহ্ণ

ঢাকার নিউমার্কেট থানায় একটি হত্যা মামলার আসামি জসিম উদ্দিনসহ চারজন। ২০০৯ সালে করা এ মামলার বিচার কাজ শেষ হয়নি গত আট বছরেও। চার আসামিই এখনও কারাগারে বন্দি রয়েছেন। পুরান ঢাকার লালবাগের বাসিন্দা মো. ফরিদের বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালের এবং লক্ষ্মীপুরের রায়পুরের বাসিন্দা সোহেল রিয়াজ পাপ্পুর বিরুদ্ধে ২০০৫ সালের হত্যা মামলা রয়েছে। এক যুগের বেশি সময় পেরোলেও ওই দুই আসামির বিচার কাজ এগোয়নি। বিনা বিচারে কারাগারে বন্দি আছেন তারাও।

শুধু হত্যা মামলার আসামি জসিম, ফরিদ কিংবা পাপ্পুরা নন, তাদের মতো অন্তত ৫৪২ জন রয়েছে যাদের বিচার ছাড়াই কারাগারে থাকতে হচ্ছে বছরের পর বছর। আদালতের চূড়ান্ত রায়ে তাদের সাজা হবে কি হবে না- এমন আশা-নিরাশার দোলাচলের মধ্যে দেশের বিভিন্ন কারাগারে বিচার ছাড়াই বন্দিজীবন পার করতে হচ্ছে হত্যাসহ বিভিন্ন মামলার এ আসামিদের।

বিনা বিচারে তাদের দীর্ঘদিন বন্দি থাকার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, তারা সব সময়ই বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। বিনা বিচারে একজন মানুষ বন্দি থাকতে পারেন না। এতে মানবাধিকার যেমন লঙ্ঘিত হয়, তেমনি বিচারপ্রার্থী ও আসামিপক্ষ উভয়েই ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

কেন বিচার নিষ্পত্তি হচ্ছে না : বিভিন্ন মামলায় এত আসামি বছরের পর বছর ধরে কেন বিনা বিচারে কারাগারে রয়েছেন বা কেন তাদের বিচার হচ্ছে না- এর অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে নানা নেপথ্য কাহিনী। সংশ্নিষ্ট মামলাগুলোর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী, কারাগারের কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাক্ষীর অভাবে তাদের বিচার শুরু করা যাচ্ছে না। কারও কারও অভিযোগের বিচার শুরু হলেও সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছে না। পুরনো এসব মামলার প্রয়োজনীয় অনেক নথিও খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে আসামির হাজিরার তারিখই নির্ধারণ হয় না। চার্জশিটে অনেক আসামির নাম বা ঠিকানা ভুল রয়েছে। অনেক সাক্ষীর নামের সঙ্গে ঠিকানার মিল নেই। অনেক আসামির স্বজন বা বাদীপক্ষও মামলায় আগ্রহ দেখান না। এসব কারণে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি রয়েছে এ আসামিরা।

আইনজীবীরা জানান, বিচারহীন অবস্থায় অনেক বিদেশি বন্দিও রয়েছেন। অনেক অভিযুক্ত জঙ্গি রয়েছে। খোঁজ নিয়ে তাদের ঠিকানা ভুয়া পাওয়া যায়। সাক্ষীদের ঠিকানাও ভুয়া পাওয়া যায়। এজন্য বিচার কাজ শুরু করা সম্ভব হয় না। এসব আসামির লোকজন না পাওয়ায় তদন্ত থেকে শুরু করে বিচার কার্যক্রমে যাওয়ার আগে সব পক্ষের একটা অনীহাও থাকে।

অনেক বছর ধরে বিচারহীন অবস্থায় বন্দি আসামিদের মুক্তির জন্য আইনি সহায়তা দিয়ে আসছে জাতীয় আইন সহায়তা ও মানবাধিকার সংগঠন বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। সংস্থাটির ঢাকা ইউনিটের কো-অর্ডিনেটর এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট খোন্দকার আবদুল মান্নান গণমাধ্যমকে বলেন, তাদের অনেকেরই মামলার নথি পাওয়া যায় না। সাক্ষী পাওয়া যায় না। অনেক সময় তাদের হাজিরা তারিখও দেওয়া হয় না। এসব কারণে মামলাগুলোর বিচার শুরু হয়নি। তবে ব্লাস্টের পক্ষ থেকে এ ধরনের মামলা খুঁজে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার অন্য একটি আদালতের বিশেষ পিপি ফিরোজুর রহমান (মন্টু) গণমাধ্যমকে বলেন, এসব বন্দির অনেকে হয়তো ১০ বছর বা আরও বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছে। তাদের কারও কারও হয়তো সর্বোচ্চ সাজা হবে। আবার এমনও হতে পারে, চূড়ান্ত বিচারে কারও কারও সাজা আরও কম হবে।

মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি : এদিকে পাঁচ বছর বা এর বেশি সময় ধরে কারাবন্দি আসামিদের বিচার কার্যক্রম দ্রুত নিষ্পত্তি করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। গত ১৯ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে এ চিঠি পাঠানো হয়। একই দিন এ বন্দিদের বিরুদ্ধে যেসব জেলায় মামলা রয়েছে এবং তারা যেসব জেলার কারাগারে রয়েছে, সেসব জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ সুপারকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। পিপি বা স্পেশাল পিপির মাধ্যমে এসব অনিষ্পন্ন মামলার বিচারকাজ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত অগ্রগতি প্রতিবেদনও মাসিক ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানাতে বলা হয়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি আসামিদের বিচার দ্রুত শেষ করার জন্য সরকার চেষ্টা করছে। সম্প্রতি এ ব্যাপারে সহায়তার জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী আরও বলেন, এসব মামলা কেন দ্রুত নিষ্পত্তি হচ্ছে না, তার কারণও অনুসন্ধান করা হয়েছে। এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করা এককভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সম্ভব নয়। আইনি প্রক্রিয়া আরও সহজতর করতে আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতসহ সহযোগিতা প্রয়োজন।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির আলোকে ঝুলে থাকা মামলাগুলোর বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বিভিন্ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

কোন কারাগারে কত বন্দি : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কারাগার সূত্র জানায়, দেশের মোট ৬৮টি কারাগারের মধ্যে ৫৬টি কারাগারে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ৫৪২ জন বন্দি রয়েছে। মাদক, খুন, দ্রুত বিচার আইন ও সন্ত্রাস দমন আইনসহ বিভিন্ন আইনে নানা অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। বন্দিদের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটজন, গাজীপুরের কাশিমপুরের চারটি কারাগারে ১৩৫ জন, নারায়ণগঞ্জে ৩৭ জন, ময়মনসিংহ কারাগারে ৩০ জন, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৫ জন, কিশোরগঞ্জে নয়জন, নীলফামারী কারাগারে সাতজন, নরসিংদী ও দিনাজপুর জেলা কারাগারের প্রতিটিতে ছয় জন করে, ফরিদপুর, পাবনা, বগুড়া, হ্নঠাকুরগাঁও, জয়পুরহাট ও সিরাজগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঁচজন করে, লালমনিরহাট কারাগারে চারজন করে, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল, শেরপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলা কারাগারে তিনজন করে, মাদারীপুর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ কারাগারে দু’জন করে এবং রাজবাড়ী, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, রংপুর ও নাটোর কারাগারে একজন করে আসামি বিনা বিচারে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি রয়েছে।

এ ছাড়া চট্টগ্রামে ৯১ জন, কক্সবাজারে ২৮ জন, সিলেটে ১৯ জন, কুমিল্লায় ১৪ জন, খুলনায় ১৩ জন, মৌলভীবাজার ও চুয়াডাঙ্গায় ১১ জন, খাগড়াছড়ি ও ঝিনাইদহে ১০ জন, সাতক্ষীরায় নয়জন, নোয়াখালীতে সাতজন, চাঁদপুরে পাঁচজন, ফেনী, পটুয়াখালী ও ভোলা কারাগারে তিনজন করে, সুনামগঞ্জ ও যশোরে চারজন করে, ব্রাহ্মহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর ও বরগুনায় দু’জন করে এবং বরিশাল, হবিগঞ্জ, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর কারাগারে একজন করে বিনা বিচারে বন্দি রয়েছে।

কারা অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, সাধারণত কারাগারের জায়গার তুলনায় বন্দির সংখ্যা বেশি। তার ওপর আবার বিচার ছাড়াই পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে বন্দি রয়েছে পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি। দীর্ঘদিনেও এসব বন্দির বিচার নিষ্পত্তি না হওয়ায় তাদের নিয়ে কারা কর্তৃপক্ষও বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছে।
-সমকাল

 

সম্পাদনা- ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon