শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র সংশোধনাগার নাকি কারাগার!


প্রকাশিত :১৮.১১.২০১৭, ৬:১৫ অপরাহ্ণ

প্রধান ফটক পেরিয়ে ঢুকতেই বাম পাশে ছোট ফুলবাগান গাজীপুরের টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক)। সেখানে বলতে গেলে শুধু পাতাবাহারই আছে। অবশ্য মাসখানেকের মধ্যেই ফুলের দেখা মিলবে- এমন আশ্বাস দিলেন সংশ্নিষ্ট কর্মচারীরা। এ বাগানই যেন প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক সংকটের প্রতীক হয়ে শুধু পাতা দোলাচ্ছে। ফুল ফোটার সম্ভাবনা আটকে আছে ভবিষ্যতে- ‘হবে’ এমন আশ্বাসে। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা সরিয়ে সত্যিই বাগানে কবে ফুল হাসবে, কেউ জানে না। প্রায় একই অবস্থা গাজীপুরের কোনাবাড়ী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালিকা)। এগুলোকে সংশোধন বা উন্নয়ন কেন্দ্র বলা হলেও বাস্তবে যেন শিশুদের কারাগার। নানা সমস্যায় জর্জরিত কেন্দ্রগুলোরই উন্নয়নের বড় প্রয়োজন।

অপরাধে জড়িয়ে বা কোনো না কোনোভাবে আইনের সংস্পর্শে এলে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের সাধারণ কারাগারের পরিবর্তে এসব কেন্দ্রে রাখা হয়। এখানে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে তাদের মানসিক উন্নয়ন ঘটানোর কথা। কিন্তু সরেজমিন চিত্র জানাচ্ছে, এই কেন্দ্রগুলোরই উন্নয়ন ও সংস্কার প্রয়োজন। তাহলে হয়তো এখানে অবস্থানকারী শিশুরা খানিকটা ভালো পরিবেশ পেতে পারে। তাদের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ খাবার নিয়ে। পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হয় না, যা-ওবা জুটছে তাও নিম্নমানের। টয়লেট ও ঘর পরিস্কারসহ নানা কাজে তাদের বাধ্য করা হচ্ছে। নির্দেশ পালনে গড়িমসি করলেই শুরু হয় নির্যাতন। এভাবে নির্যাতিত পুরনো শিশুরা আবার নির্যাতন করছে নতুন করে আসা শিশুদের। কেন্দ্রের প্রায় ৫০০ শিশুর জন্য একজনও চিকিৎসক নেই। সুযোগ নেই পঞ্চম শ্রেণির ওপরে পড়ালেখা করার।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) জুলিয়েট বেগমের সঙ্গে পরপর দুই দিন কয়েক দফায় কথা বলতে চাওয়া হয়। কিন্তু সদ্য এই পদে যোগ দিয়েছেন- এমন অজুহাত দেখিয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।

টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালক) তত্ত্বাবধায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী বলেন, সীমিত আর্থিক বরাদ্দ দিয়ে সাধ্যমতো ভালো খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়। শিশুরা নিজেদের ঘর পরিস্কার করে এটি ঠিক, তবে টয়লেটের জন্য পরিচ্ছন্নকর্মী রয়েছে। কাউকে নির্যাতন করার অভিযোগ সঠিক নয়। তবে চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তার কথা তিনিও স্বীকার করেন।

কোনাবাড়ী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালিকা) তত্ত্বাবধায়ক মাহফুজা বেগম বলেন, খাবার কম দেওয়া বা মারধরের অভিযোগ সঠিক নয়। সব কর্মীই আন্তরিকভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পঞ্চম শ্রেণির ওপরে পড়ার মতো শিশুরা সাধারণত এখানে আসে না। তাই শিক্ষকের সমস্যা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

শিশু ও স্বজনদের যত অভিযোগ :প্রতি মাসের ৭ ও ২২ তারিখে কেন্দ্রে থাকা শিশুদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পান স্বজনরা। গত ৭ নভেম্বর টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে স্বজনদের সাক্ষাতের দিন গিয়ে দেখা যায়, প্রচুর অভিভাবক নানারকম খাবার নিয়ে ভিড় করেছেন। কেন্দ্রের প্রশাসনিক ভবনের নিচতলার তিনটি কক্ষে একে একে আসছে শিশুরা। অপেক্ষমাণ বাবা-মায়ের সঙ্গে তারা কথা বলছে। স্বজনের আনা খাবার খাচ্ছে। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা থাকায় সেখানে তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি। তবে বের হওয়ার সময় তাদের স্বজনের সঙ্গে কথা হয়।ঢাকার কেরানীগঞ্জের পঞ্চম শ্রেণি পড়ূয়া এক শিশুর মা সাবিনা ইয়াসমীন সুলতানা জানান, দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে তার ছেলে। শিশুটির অভিযোগ, তাকে দিয়ে নিয়মিত টয়লেট পরিস্কার করিয়ে নেওয়া হয়। বিত্তশালী পরিবারের ছেলেটি এসব কাজ করতে অভ্যস্ত না হওয়ায় তার খুব সমস্যা হচ্ছে। তার হাতের ত্বকে সংক্রমণ হয়েছে। আবার কাজ করতে আপত্তি করায় কেন্দ্রের দায়িত্বরত কর্মী তাকেসহ কয়েক শিশুকে মারধরও করেছেন। এখানকার নিম্নমানের খাবারও সে খেতে পারছে না। কেরানীগঞ্জের কদমতলী গোলচত্বর এলাকার হত্যা মামলায় গ্রেফতার চতুর্থ শ্রেণি পড়ূয়া এক শিশুর মা মনোয়ারা বেগমও জানান, তার ছেলেও অভিযোগ করেছে তাকে দিয়ে টয়লেট পরিস্কার করানো হয়।

চট্টগ্রাম থেকে আসা এক নারী জানান, তার ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ূয়া ছেলে হত্যা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কেন্দ্রে রয়েছে। ছেলে তাকে জানিয়েছে, এখানকার ভাত সে খেতে পারে না। ভাতে এত বাজে গন্ধ যে তার ধারণা, এতে কোনো ‘ওষুধ’ দেওয়া হয়, যেন শিশুরা ঠিকমতো খেতে না পারে।

তবে খাবারের মানের চেয়েও শিশুদের অভিযোগ এর পরিমাণ নিয়ে। জামালপুরের ইসলামপুরের একটি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেফতার দশম শ্রেণির এক ছাত্রের বাবা আবদুর রহমান অভিযোগ করেন, কেন্দ্রে যে ভাত-তরকারি দেওয়া হয়, তা খেয়ে তার ছেলের পেট ভরে না। টাঙ্গাইলের বাসাইলের ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরের বাবা নবীন মিয়াও একই অভিযোগ করেন।

ফেনী থেকে আসা রিকশাচালক সেলিম মিয়ার অভিযোগ, চুরিতে জড়িত সন্দেহে গ্রেফতারের পর গত বছর থেকে তার ছেলে এ কেন্দ্রে আছে। এর মধ্যে তিনি চারবার এলেও তাকে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। চাঁদপুরের কচুয়ার দুর্গাপুর থেকে এসেছিলেন আরেক রিকশাচালক আহমেদ আলী। কেন্দ্রে থাকা ১৪ বছরের ছেলের বরাত দিয়ে তিনি জানান, পুরনো নিবাসীরা নতুনদের ওপর জুলুম করে। নতুনদের খাবার কেড়ে নিয়ে খায়।

নেই চিকিৎসক : কেন্দ্রগুলোয় অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য নেই কোনো চিকিৎসক। সপ্তাহে এক বা দু’দিন বাইরে থেকে চিকিৎসক এসে সেবা দেন এখানে। অন্য সময় কেউ অসুস্থ হলে তাকে নিতে হয় কাছের হাসপাতালে। টঙ্গী সরকারি হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক পারভেজ হোসেন জানান, প্রতি মাসে ৩৫০ থেকে ৪০০ শিশু তাদের হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়। তাদের বেশিরভাগই পেটের অসুখ ও ত্বকের সমস্যা নিয়ে আসে।

টঙ্গী কেন্দ্রে থাকা শেরপুরের কাচারীপাড়ার এক কিশোরের বাবা নূর মোহাম্মদ খান জানান, এখানকার চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো নয়। জ্বর-সর্দি হলে শুধু প্যারাসিটামল দেওয়া হয়। বাড়তি ওষুধ লাগলে বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়।

মাত্র ২৬০০ টাকায় এক মাস : এই শিশুদের জন্য মাথাপিছু মাসিক বরাদ্দ দুই হাজার ৬০০ টাকা। এর মধ্যে খাবারের জন্য ২০০০, শিক্ষা ও খেলাধুলার জন্য ২০০, প্রশিক্ষণের জন্য ১২০, পোশাকের জন্য ১২০, চিকিৎসার জন্য ৬০ ও তেল-সাবান-প্রসাধন সামগ্রীর জন্য ১০০ টাকা। কর্মকর্তারা জানালেন, বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। তবু তারা শিশুদের ভালো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে বর্তমান বরাদ্দের টাকা থেকেও লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে শিশুর স্বজনদের।

নির্ধারিত খাদ্য তালিকা অনুযায়ী সপ্তাহে দুই দিন মুরগি ও একদিন গরুর মাংস দেওয়ার কথা। তবে আশুলিয়ায় ‘সিনিয়র-জুনিয়র’ দ্বন্দ্বে শিশু আল-আমিন হত্যা মামলায় গ্রেফতার এক শিশুর মা রাশিদা বেগম জানালেন, সারা সপ্তাহ কুমড়ার তরকারি, ডাল, ভর্তা এবং শুধু একদিন মুরগির মাংস দেওয়া হয়।

আসনের চেয়ে নিবাসী বেশি : টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালক) আসন সংখ্যা ৩০০। কিন্তু ৭ নভেম্বর গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রয়েছে ৪৭৮ জন। এর মধ্যে রয়েছে জিআর মামলায় কিশোর হাজতে ৪৭৩ ও সংশোধনী শাখায় পাঁচজন। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক জানান, সারা বছরই তাদের আসনের চেয়ে নিবাসী বেশি থাকে। এ কারণে ব্যবস্থাপনাতেও বেগ পেতে হয়। তবে কোনাবাড়ীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে (বালিকা) আসনের চেয়ে নিবাসী কম। এখানে ১৫০ আসন থাকলেও ৫ নভেম্বর নিবাসী ছিল ৮৮ জন।

কেন্দ্রে যৌন নিপীড়ন, মারামারি, আত্মহত্যা : কেন্দ্রগুলোর পরিবেশ নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার সুযোগে প্রায়ই মারামারি, যৌন নিপীড়ন, আত্মহত্যা ও মাদক সেবনের মতো ঘটনা ঘটছে। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি কোনাবাড়ীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের নিবাসী মনিরা বেগম আত্মহত্যা করে। তখন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে তদন্ত কমিটি নিরাপত্তা বাড়ানোসহ কিছু সুপারিশ করে, যা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে একই বছরের আগস্টে বাবা-মা হত্যা মামলায় অভিযুক্ত ঐশী রহমান এবং ২০১৪ সালের ২৮ এপ্রিল আনিকা হক সিরাজী আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। বছর দু-এক আগে এই কেন্দ্রের এক কিশোরীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে নিরাপত্তাকর্মীর বিরুদ্ধে। পরে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

এদিকে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত অভিযোগে কয়েক মাস আগে টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তিন আনসারকেও সরিয়ে দেওয়া হয়। তাদের বিরুদ্ধে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার ও নিবাসীদের মাদক সরবরাহ করার অভিযোগ রয়েছে।

২০১৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি টঙ্গী কেন্দ্রের ভেতরে নিজেদের শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে ২০ কিশোর। হাসপাতালে তারা জানায়, কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের নির্যাতন ও ঠিকমতো খাবার না দেওয়ার প্রতিবাদে তারা এ ঘটনা ঘটায়। অবশ্য সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, কফ সিরাপ খেয়ে তারা মারামারি করেছে।

২০১৬ সালের ৩০ মার্চ এই কেন্দ্রে টেকনাফের নয়াপাড়া এলাকার এক কিশোরকে বলাৎকার করে চার নিবাসী। একই বছরের ৫ মার্চ নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর কিশোর সাখাওয়াতসহ তিনজনকে পিটিয়ে জখম করে পুরনো নিবাসীরা।

কৃতজ্ঞতা -সমকাল

 

সম্পাদনা- ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon