শিশু সুরক্ষা আইন বনাম বাস্তব চিত্র


প্রকাশিত :২০.১১.২০১৭, ১১:০৫ পূর্বাহ্ণ

শান্তা ইসলাম নিতু

একটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার কেন্দ্র বিন্দুতে থাকে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তিগত বিপ্লবের কারনে ‘মানবসম্পদ’ প্রপঞ্চটির ব্যাপ্তি আরো বিস্তৃত হয়েছে। প্রতিটি মানুষ অপার সম্ভাবনা নিয়ে জন্মায়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে প্রতিটি শিশুর পূর্ণাঙ্গ বিকাশের সহায়ক পরিবেশ প্রতিবেশ নিশ্চিত করা। শিশুরা হচ্ছে সমাজের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। শিশুর প্রতি আমাদের আচরণ কেমন হবে সে ব্যাপারে সর্তকতা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

১৯৮৯ সালের ২০ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন ও গ্রহণ করে। ১৯৯০ সালের আগষ্ট মাসে বাংলাদেশ এই সনদে অনুসমর্থন দান করে, অর্থাৎ সনদের বাস্তবায়নে রাষ্টের অঙ্গীকার গ্রহণ করে। শিশু অধিকার সনদের অধিকারগুলোর মধ্যে তাদের বেঁচে থাকার অধিকার, বিকাশের অধিকার, সুরক্ষার অধিকার, অংশগ্রহণেরঅধিকার এর কথা বলা আছে। শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী,অনুর্ধ্ব ১৮ (আঠার) বৎসর বয়স পর্যন্ত সকল ব্যক্তি শিশু হিসাবে গণ্য হবে। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ১৪ বৎসর বয়স পূর্ণ করেছে কিন্তু ১৮ বৎসর পূর্ণ করে নাই এমন ব্যক্তিকে কিশোর বলা হয়েছে। যেখানে স্পষ্ট বলে দেয়া হয়েছে কোন শিশুকে প্রতিষ্ঠানে বা পেশায় কাজ করতে দেয়া যাবে না। তাকে দিয়ে কোন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে না। অথচ শিশুদেরকেই দেখা যায় বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় কাজ করতে।

বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলও এর মতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে ৪৫ ধরনের। আর এর মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে অংশগ্রহণ করছে শিশুরা। শিশু শ্রমিকদের মধ্যে ৭৩ দশমিক ৫০ ভাগ পুরুষ শিশু এবং ২৬ দশমিক ৫০ ভাগ নারী শিশু। এসব ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে রয়েছে মোটর ওয়ার্কসপে কাজ করা, ওয়েল্ডিং, গ্যাস কারখানা, লেদ মেশিন, রিকশা চালানো, মাদক বাহক, বিড়ি শ্রমিক, বাসের হেল্পার, লেগুনার হেল্পার, নির্মাণ শ্রমিক, গৃহ শিশু শ্রমিক, এমব্রয়ডারি, জাহাজ শিল্প, চিংড়ি হ্যাচারি, শুঁটকি তৈরি, লবণ কারখানা, বেডিং স্টোরের শ্রমিক, ইট ভাঙা, ইট ভাটা শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, ট্যানারি এবং রঙ মিস্ত্রিসহ আরো বিভিন্ন ধরনের কাজ।

শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে আইন থাকলেও তাদের প্রতি সহিংস আচরণ দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। আমরা দৈনন্দিন খবরের কাগজে, মিডিয়ার মাধ্যমে এমন সহিংসতার হাজার উদাহরণ পাই। বাংলাদেশে এক থেকে ১৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৮২ শতাংশ শিশু সহিংসতার শিকার হয়। কর্মক্ষেত্রে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয় ৫৭ শতাংশ শিশু। আর ৭৭ দশমিক ১ শতাংশ শিশু বিদ্যালয়ে শারীরিক সহিসংতার শিকার হয়। ২০১৬ সালে মোট ৩৫৮৯টি শিশু বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে যাদের মধ্যে ১৪৪১ শিশু অপমৃত্যুর শিকার হয়েছে এবং ৬৮৬ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে।বর্তমানে শিশু ওঅপহরণের সংখ্যা দিন দিন ভয়ঙ্করভাবে বেড়ে যাচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসেব মতে ২০১৬ এর , (জানুয়ারী- সেপ্টেম্বর), এই নয় মাস এর মধ্যে শিশু অপহরন হয়েছে ১২৬ জন, অপহরণ করে গুম করা হয়ছে ১১১ জন কে, মেরে ফেলা হয়েছে ১৩ জনকে। প্রতিদিন আমরা সংবাদপত্রের শিশু অপহরণ ঘটনার অনেক ঘটনা দেখে থাকি।

শিশু নির্যাতনের আর একটি চিত্র পাওয়া যায় গৃহকর্মী নির্যাতন দিয়ে। গৃহকর্মীদের মধ্যে ২৫ ভাগ এর বেশি হচ্ছে শিশু। যাদের কোন না ভাবে নির্যাতন করা হচ্ছে। শিশুদেরকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বিভিন্ন বাসা বাড়িতে আর যেখানে কিনা তাদের উপর করা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম-(বিএসএএফ) এর তথ্য মতে, চলতি বছরে জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৮ মাসে ৩৯৯ শিশু নিপীড়নের শিকার হয়। এসময় নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ২২২ শিশুকে।সরকার শিশুদের অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অনেক আইন প্রণয়ন করলেও অনেক সীমাবদ্ধতার কারনে তা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। শিশুদের জন্য আইনথাকা সত্ত্বেও তারা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা কি সত্যি ই পারছি তাদের অধিকারগুলোকে নিশ্চিত করতে?

অনেকের মতে বিশাল জনগোষ্ঠীর সীমাহীন দারিদ্র্যই শিশুশ্রমের প্রধান কারন । তবে অশিক্ষা,সামাজিক নিরাপত্তার অভাব , সচেতনতার অভাব পরিস্থিতি উত্তরনে বাধা সৃষ্টি করছে।টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সবার জন্য শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করা । তাই আমাদের প্রথম প্রচেষ্টা হওয়া উচিত শিশুদেরকে তাদের নির্মল শৈশব ফিরিয়ে দেয়া অন্যথায় সূচকের পর্দার আড়ালেই ঢেকে যাবে আমাদের প্রকৃত উন্নয়ন ।

তাই শিশু সুরক্ষা আইন ও তা বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জে সমূহ নিয়ে এখনি নতুন করে ভাবার সময়।

 

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ; ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি



ট্রেডমার্ক ও কপিরাইট © 2016 lawyersclubbangladesh এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
Designed By Linckon