•  

  • আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল স্থানান্তর নয়, ইতিহাসের সাক্ষী থাকুক

     

    ড বদরুল হাসান কচি

    আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। একাত্তরে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত এই ট্রাইব্যুনাল অন্যত্র সরিয়ে নিতে আইন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন। এই খবর গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর শুরু হয় সমালোচনা। ঐদিনই বিকেলে সুপ্রিম কোর্ট মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীদের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক এবং খাদ্যমন্ত্রি অ্যাডভোকেট  কামরুল ইসলাম ঐ চিঠির বিরুদ্ধ অবস্থান থেকে বক্তব্য দিয়েছেন; সেই সাথে আদালতকে অনুরোধ জানিয়েছেন জনগণের চাওয়াকে গুরুত্ব দিতে। তাহলে দেখে আসি, জনগণ কি চায়?

    মিডিয়ার কল্যাণে দেখেছি মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ পরিবারের সদস্যরা এই চিঠিতে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন। একই সুরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বুদ্ধিজীবীরা। কারণ অনুসন্ধানে যাবার আগে এই ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে কিছু তথ্য টেনে আনার প্রয়োজন বোধ করছি।

    ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধসমূহের বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে বিজয় লাভ করার পরপরই নির্বাচিত দল আওয়ামী লীগ দ্বারা গঠিত সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়রি জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়। মৌখিক ভোটে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। বাংলাদেশের নাগরিক সমাজ  এবং শীর্ষ আইনজীবী, বিচারপতি ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকবৃন্দ ১৯৭৩ সালে প্রণীত  ট্রাইব্যুনাল আইনের কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংশোধন আনার জন্য সরকারকে পরামর্শ প্রদান করেন। অতঃপর আইন কমিশনের সুপারিশ বিবেচনা করে ১৯৭৩ সালে প্রণীত আইনকে যুগোপযোগী করার জন্য ২০০৯ সালের ৯ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কিছু অংশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে মৌখিক ভোটে পাস হয়। যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল, আইনজীবী প্যানেল এবং তদন্ত সংস্থা গঠন করা হয়। বিচার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পুরনো হাইকোর্ট ভবনকে আদালত হিসেবে প্রস্তুত করা হয়। সেই থেকে বিচার কাজ ঐ ভবনে চলে এসেছে।

    অনেক আগে থেকেই মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের দাবী ছিল সব বিচার কাজ শেষ হলেও এই আদালতটি স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষন রাখার কথা। কারণ প্রজন্মের সন্তানরা যাতে জানতে পারে, দেশ স্বাধীন হবার পথে এই দেশীয় কিছু দালাল দেশ ও জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে; শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে হত্যা, গণহত্যায় অংশ নিয়েছে, মা বোনদের নির্যাতন করেছে, সম্পদ লুট করে নিয়েছে, অগ্নিসংযোগ করে ভিটেমাটি জ্বালিয়ে দিয়েছে এবং নানান প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও স্বাধীন দেশে তাদের সেই ঘৃণ্য অপরাধের বিচার হয়েছে। তাছাড়া এই বিচার বিশ্বের কাছে ইতোমধ্যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে; সেই দৃষ্টান্তের সাক্ষর হিসেবেও এই আদালত সংরক্ষণের দাবী রাখে।

    এছাড়াও অন্য এলাকা থেকে সুপ্রিম কোর্ট এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো থাকার কারণে ট্রাইব্যুনাল বিচারক এবং সরকারী কৌঁসুলিরা বিচার কাজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আদালত অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হলে বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ নিরাপত্তা বলয় তৈরি করার প্রয়োজন হতে পারে; তাতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর বাড়তি চাপ পড়ার আশংকা রয়েছে।

    জনগণের প্রত্যাশা, মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট জনগণের এই অনুভূতিকে গুরুত্ব দিয়ে চিঠি পুনর্বিবেচনা করবেন। কারণ আদালতের প্রতি এখনো জনগণের আস্থা, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ অসীম।

     

    লেখক- আইনজীবী ও সম্পাদক- ল’ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ ডটকম।

     
    ২৪ আগস্ট, ২০১৬ বাংলাদেশ সময় ১৮:২৫