•  

  • রাষ্ট্রদ্রোহ বুঝতে নীতিমালা জরুরি


    মিজানুর রহমান খান

    ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নতুন করে আবারও বলেছেন, সরকারের সমালোচনা করা আর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ করা এক নয়। সরকার পরিচালনায় কোনো এক বা একাধিক দল থাকে। নানা কারণে তাদের কাজের সমালোচনা করার দরকার পড়ে। কিন্তু সহনশীলতার ঘাটতি দেখা দিলে সরকারগুলো তা সহ্য করতে চায় না। তাই তারা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করার প্রবণতা দেখিয়ে থাকে। তারা সরকার ও রাষ্ট্রের পার্থক্য রাখতে চায় না। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো ভারতেও এই ক্ষতিকর প্রবণতা প্রকট রূপ নিয়েছে।

    ৬ সেপ্টেম্বর ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, সরকারের সমালোচনা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়। এ কথা এবারই প্রথম উচ্চারণ করেননি তাঁরা। ভারতে একটি বিষয় দেখা যায়, সর্বোচ্চ আদালত অত্যন্ত দরকারি কথা বারংবার বলেন। আদর্শ অবস্থান হলো, এক কথা তাঁরা একবারই বলবেন। সর্বোচ্চ আদালত যা বলে দেবেন, সেটাই আইন। কিন্তু বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দেখতে পাই, তাঁরা এক কথা বারংবার বলেন। এবং গণমাধ্যমগুলো সেসব খবর এমনভাবে প্রকাশ করে, যা দেখে বা শুনে আনকোরা কারও মনে হবে, এটা বুঝি তাঁরা এই প্রথম বললেন। অনুমান করি, প্রায় একই কথা বারংবার বলা এবং গণমাধ্যমে তা মোটা হরফে শিরোনাম হওয়ার কারণে সমাজে ও সরকারের ভেতরে সচেতনতা ও সংবেদনশীলতা তৈরি হয়। আর এটাই সব থেকে কার্যকর ও শক্তিশালী রক্ষাকবচ সৃষ্টি করে। উপমহাদেশের যেসব সমাজে এর যত বেশি ঘাটতি, সেখানে এ ধরনের কালাকানুনের নির্দয় ও বেপরোয়া প্রয়োগ কখনো কখনো ভয়াবহ রূপ নিতে দেখা যায়।

    সরকারের সমালোচনা যে রাষ্ট্রদ্রোহ নয় এবং রাষ্ট্রদ্রোহ যে ঔপনিবেশিক প্রভুদের শোষণের হাতিয়ার ছিল, সেই সত্য ১৯৬২ সালে কেদারনাথ সিং বনাম বিহার মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পরিষ্কার করেছিলেন। এটা ভারতের গণতন্ত্র ও রাজনীতিকদের জন্য গৌরবের কথা নয় যে তাঁরা সেই রায়ের আলোকে আজ পর্যন্ত ১২৪ক ধারায় (রাষ্ট্রদ্রোহের শাস্তির বিধান) একটি প্রগতিশীল পরিবর্তন আনতে পারেননি। আবার একই সঙ্গে এটাও সত্য, ভারতের রাজনীতিবিদেরা অন্তত তাঁদের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা দায়ের করার অধিকারকে স্বীকার করেছেন; সহনশীলতা দেখিয়েছেন। রাষ্ট্রদ্রোহের হাতিয়ার দিয়ে যখনই সরকার কারও মুখ বন্ধ করতে এবং নিপীড়ন চালাতে বড় বেশি রকমের মাত্রা অতিক্রম করতে চেয়েছে, তখনই নাগরিক সমাজ শিরদাঁড়া খাঁড়া করেছে। দরখাস্ত হাতে ছুটে গেছে সুপ্রিম কোর্টে। এবং উল্লেখযোগ্য ক্ষেত্রে তারা অন্তত একটা প্রতিকার পেয়েছে।

    এবারে যে প্রেক্ষাপটে রিট হলো সেটা ভীষণ স্পর্শকাতর। বেঙ্গালুরুর পুলিশ অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা এনেছে। কারণ, তারা একটি সেমিনারের আয়োজন করেছিল, যার শিরোনাম ছিল, ‘জম্মু ও কাশ্মীরে মানবাধিকারের লঙ্ঘন ও ন্যায়বিচার প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ’। এই বিষয়ের সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রশ্ন জড়িত, এই যুক্তি দেখিয়ে জনচিত্তে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে খুব বেশি কাঠখড় পোড়ানোর দরকার হওয়ার কথা নয়। তার থেকেও গুরুতর কথা হলো, সুপ্রিম কোর্টে যাঁরা সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে দরখাস্ত হাতে ছুটে গেছেন, তাঁরা আবার এনজিও করেন। আমার নজরে পড়েনি, ভারতের দেশপ্রেমিক কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার বা তাদের ‘স্বনিয়োজিত’ সমর্থক ও মিত্ররা সংশ্লিষ্ট এনজিও কর্মীদের সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন কি না; এনজিওগুলোর ডলারের সুলুক সন্ধান করে কোনো বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়েছেন কি না। তবে এমন কিছু ঘটলেও দরখাস্তকারীদের তাতে খুব দুঃখিত হওয়ার কারণ নেই। কারণ তাঁরা দ্রুত প্রতিকার পেয়েছেন। শুনানির জন্য তাঁদের তীর্থের কাক হতে হয়নি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বাক্স্বাধীনতার পক্ষে তাঁদের কণ্ঠ উচ্চকিত করেছেন। যদিও ভারতের সরকারও এনজিওগুলোর বিদেশ থেকে অর্থ আনার ওপর কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে এবং সেই চেষ্টা তারা অব্যাহত রেখেছে। সেই তালিকায় অ্যামনেস্টিও আছে।
    তদুপরি এই রায় পাওয়া সম্ভব হয়েছে। কারণ, এটা হচ্ছে ভারতের সেই সুপ্রিম কোর্ট, যাঁরা বিচারক নিয়োগে নিজেদের তৈরি করা আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করেই ক্ষান্ত হন না; বাস্তবে সেটা প্রয়োগ করারও একটা সামর্থ্য অর্জন করেছেন। এবং শুধু করেছেন বললে সবটা বলা হবে না। বিচারক নিয়োগে দলীয়করণ বা অন্য কোনো অনভিপ্রেত বিবেচনা কাজ করে না বলেই সচেতন মহল ও জনগণের কাছে বিশ্বাসযোগ্যভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই শক্তি অর্জনকে আমরা সমীহ করি। গোটা বিশ্ব করে।
    তবে দ্য হিন্দুর রিপোর্ট পড়ে ধারণা করা যায়, আবেদনকারীরা যে আশায় দণ্ডবিধির ১২৪ক ধারা প্রশ্নে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হয়েছিলেন, তাতে তাঁরা যথেষ্ট সফল হয়েছেন বলে মনে না। এর প্রধান কারণ, আবেদনকারীরা এই রাষ্ট্রদ্রোহের অপপ্রয়োগের আধিক্যে বিচলিত ছিলেন। ২০১৪ সালেই সরকার ৪৭টি দেশদ্রোহের মামলা দায়ের ও ৫৮ জনকে আটক করেছিল। কুদানকুলামে একটি আণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প হবে। স্থানীয় লোকেরা পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কায় প্রতিবাদী হলেন। মনমোহন সিংয়ের আমলে সরকারি তদন্তে বিক্ষোভ উসকে দিতে বিদেশি হাতেরও খোঁজ মিলেছিল। কিন্তু দেখার বিষয় হলো, সুপ্রিম কোর্ট তা সত্ত্বেও বলেছেন—ওই প্রকল্পের যাঁরা বিরোধিতা করেছেন, তাঁরা আর যা-ই হোক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি! শায়েস্তা করতে চাইলে অন্য ধারায় করুন।

    এই মামলায় আবেদনকারীরা বুঝেছেন ঠিকই, তৃণমূলের পুলিশ কনস্টেবলই প্রথম ঝামেলাটা পাকান। তাঁরা দ্রুত ১২৪ক ধারার আওতায় মামলা ঠুকে দেন। আদালত যতক্ষণে প্রতিকার দেন, তত দিনে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষতি যা হওয়ার তা অনেকটা হয়ে যায়। তাই আবেদনকারীদের এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ নিবেদন করেছিলেন, পুলিশ ১৯৬২ সালের রায় বোঝে না, তারা বোঝে দণ্ডবিধি। তাই আদালত যাতে পুলিশের জন্য পালনীয় একটি গাইডলাইন করে দেন।
    বাংলাদেশেও এই সমস্যা দিনে দিনে প্রকট রূপ নিচ্ছে। সিলেটের এক পান দোকানদার এক যুদ্ধাপরাধীর মুক্তি চেয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলকে চিঠি লেখায় তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে আটক করা হয়। গত জুলাইয়ে বাঁশখালীর দুই শিক্ষক বিতর্কিত প্রশ্নপত্র তৈরি করলে, পুলিশের স্মরণ পড়ে দণ্ডবিধির রাষ্ট্রদ্রোহসংক্রান্ত ১২৪ক ধারাটি দিয়েই তাঁদের ঘায়েল করতে হবে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে ‘কুরুচিপূর্ণ’ মন্তব্য করার দায়ে কিশোরগঞ্জের ইটনায় বিএনপির এক নেতার বিরুদ্ধে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার মানহানির বিধান মনে পড়ে না, তাঁর মনে পড়ে এটা রাষ্ট্রদ্রোহ না হয়ে যায় না। আর আমরা সম্প্রতি অবাক বিস্ময়ে দেখলাম, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ৫৩ জেলায় দায়ের করা ৮৩টি মামলার মধ্যে ১৭টিতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হলো। এর সবটাই নির্দেশ করে যে থানা ও আদালতকে কোনো একটি উপযুক্ত গাইডলাইন অনুসরণ করতে বলা হলে আইনের যথা প্রয়োগ না হওয়ার ঝুঁকি কমানো যাবে।

    ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ বলেছেন, রাষ্ট্রদ্রোহ কী তা ‘কনস্টেবলদের বোঝার দরকার নেই।’ আমাদের ক্ষেত্রে ভারতের এই বাস্তবতা যথাযথ নয়। কারণ, তাঁদেরই ভালো করে বুঝতে হবে। ডিসি ও ওসিদের এ ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট অবশ্য এটা বলেছেন, ‘সরকারের সমালোচনা যে রাষ্ট্রদ্রোহ নয়, সেটা বুঝতে হবে হাকিমদের, তাঁরা ১৯৬২ সালের রায়ে প্রদত্ত গাইডলাইন মানবেন। এবং সেই মতে কোন অভিযোগ সরকারের সমালোচনা, কোনটা রাষ্ট্রদ্রোহ—তা সাব্যস্ত করবেন। যে কথা ও কাজ গণ-নৈরাজ্য বা সহিংসতা উসকে দেওয়ার নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকল্পে হবে না, তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে না।’

    শুধু এটুকুই নিবেদন রাখব—১৯৬২, ২০১৬ সালসহ এ-সংক্রান্ত যাবতীয় সুপ্রিম কোর্ট রায়ের আলোকে দেশেও একটি বিস্তারিত গাইডলাইন বা নীতিমালা দরকার। সরকার এটা করবে না। এতে ঝুঁকি ও জটিলতাও আছে। তাই বিচারিক আদালতগুলোর জন্য সুপ্রিম কোর্ট একটি লিখিত গাইডলাইন করে দিলে তা পুলিশও ব্যবহার করতে পারবে। আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, রায়ের যে অংশ অপারেটিভ (কার্যকর ও বাধ্যকর) সেটা যদি সংশ্লিষ্ট আদালতের বিচারপতিরাই চূড়ান্ত করে দেন, তাহলে বহু ধরনের জটিলতা, দ্ব্যর্থকতা ও বিভ্রান্তির হাত থেকে আমরা পরিত্রাণ পেতে পারি। সুতরাং কতিপয় জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের নিজের রায়ের আলোকেই গাইডলাইন গ্রন্থনার একটা রেওয়াজ গড়ে তোলা সমীচীন মনে করি।

    সেটা চালু করা সম্ভব হলে উপমহাদেশের বাসিন্দা হিসেবে আমরা হয়তো তা থেকে উপকৃত হতে পারি।


    লেখক: সাংবাদিক৷

     
    ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ বাংলাদেশ সময় ১০:৫৭