•  

  • হেঁটে চলার অধিকার


    মশিউল আলম

    প্রতিবছর ২২ সেপ্টেম্বর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওয়ার্ল্ড কার-ফ্রি ডে বা বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালন করা হয়। বাংলাদেশে এই দিবসটির খবর তেমন প্রচারিত হয় না। এ বছর অবশ্য এক দিন আগেই খবর বেরিয়েছে, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) দিবস উদ্‌যাপন করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ উপলক্ষে সংগঠনটি ২০ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে এক আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল। প্রেসক্লাবের সামনে একটা মানববন্ধনেরও আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণকারী নারী-পুরুষদের হাতে ব্যানার-ফেস্টুনে লেখা ছিল: ‘হাঁটার অধিকার নিশ্চিত করুন’, ‘হাঁটা মানুষের অধিকার’, ‘পথচারীদের অগ্রাধিকার দিন’, ‘হাঁটার উপযুক্ত পথ চাই’ ইত্যাদি। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শারীরিক প্রতিবন্ধী কিছু নারী-পুরুষও ছিলেন।

    প্রেসক্লাবের ওই আলোচনা সভা ও মানববন্ধনের খবর সব সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়নি। এ থেকে অনুমান করা যায়, বাংলাদেশে হেঁটে চলাচলকারী নাগরিকদের অধিকার, কিংবা সুবিধা-অসুবিধার বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমেও বিশেষ গুরুত্ব পায় না। এটা আমাদের সমাজের সাধারণ মানসিকতারই প্রতিফলন। যানবাহন চলাচলের জন্য সড়ক নির্মাণ করা, সময়ে সময়ে সেগুলো মেরামত করা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে সিগন্যাল ব্যবস্থা কেনা, হাজার হাজার ট্রাফিক পুলিশকে দিন-রাত নিয়োজিত রাখা, যানজটের সমস্যা সমাধানের জন্য নানা রকমের উদ্যোগ নেওয়া—ইত্যাদি তৎপরতা সারা বছর ধরে চলে; যদিও সেগুলো খুব একটা কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয় না। কিন্তু সড়ক দিয়ে যানবাহন চলাচলের অধিকারের মতোই ফুটপাতে হেঁটে চলাচল করার অধিকারও যে নাগরিকদের থাকা উচিত—এ কথা সম্ভবত কেউই ভাবেন না। যদি ভাবতেন, তাহলে নগর কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক পুলিশের দৃষ্টি ফুটপাতের দিকেও থাকত।

    কিন্তু এই মহানগরীর কোনো সড়কের দুই পাশে ফুটপাত আদৌ আছে কি নেই, থাকলেও সেই ফুটপাতগুলো দিয়ে মানুষ হেঁটে চলাচল করতে পারে কি না—এসব দিকে দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন কোনো কর্তৃপক্ষ বোধ করে বলে মনে হয় না। কারণ, আমরা দেখে আসছি, ঢাকা মহানগরের অধিকাংশ সড়কের উভয় পাশের ফুটপাত ভাসমান দোকানপাটের দখলে। সেসব দোকানের ফাঁকফোকর দিয়ে যেটুকু সরু পথ থাকে, সেগুলো দিয়ে স্বচ্ছন্দে হেঁটে চলা যায় না, ঠেলাঠেলি করতে হয়। আর যে অল্প কয়েকটি সড়কের দুই পাশে ফুটপাতে মোটামুটি হাঁটাচলা করা যায়, সেগুলোতে মোটরসাইকেলের উপদ্রব এত বেশি যে খুব সতর্কভাবে পথ না চললে দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফুটপাতে মোটরসাইকেল চালানোর বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞাও মেনে চলা হয় না। ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা মনে করেন, তাঁদের দায়িত্ব সড়কের যানবাহন চলাচলের শৃঙ্খলা রক্ষা করা, ফুটপাতগুলো যেন তাঁদের দায়িত্বের বাইরে। সেখানে কোনো পদচারীর গায়ের ওপর কেউ মোটরসাইকেল তুলে দিলে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা চেয়ে চেয়ে দেখেন, প্রতিকারের জন্য এগিয়ে আসেন না।
    আরও একটা অবাক করা বিষয় হলো, এই মহানগরের বিভিন্ন রাস্তায় ফুটওভার, আন্ডারপাস ইত্যাদি নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে পদচারীরা নিরাপদে সড়কের এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে পারেন। হাঁটাচলার উপযোগী ফুটপাত আছে কি না, সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে পদচারী পারাপারের জন্য ফুটওভার ও আন্ডারপাস নির্মাণ করার উদ্যোগ হাস্যকর। কিন্তু এগুলো নির্মাণের পেছনের একটা কারণ বুঝতে কষ্ট হয় না: এসব স্থাপনা নির্মাণের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়, আর যেখানেই জনগণের করের টাকা ব্যয় করার সুযোগ বা অজুহাত মেলে, সেখানেই সংশ্লিষ্ট মহলের বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ করা যায়। এই মহানগরে এমন অনেক ফুটওভার নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলো নগরবাসী ব্যবহার করেন না। কিন্তু সেগুলো নির্মাণ করার মধ্য দিয়ে কিছু মানুষ পকেট ভারী করার সুযোগ পেয়েছে। ফুটপাতগুলো হাঁটাচলার উপযোগী করার পেছনে তো অন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয় না, তাই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলগুলোর কোনো উৎসাহ নেই। বরং ফুটপাত দখল করে ব্যবসা-বাণিজ্য হলে ওই ব্যবসায়ীদের যেমন রুজিরোজগার হয়, তেমনি প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি ও মহলেরও নিয়মিত হারে অর্থপ্রাপ্তির ব্যবস্থা হয়।

    একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে: ঢাকা মহানগরে পদচারী বয়স্ক মানুষ অত্যন্ত বিরল; কারণ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের পক্ষে এই শহরের কোনো ফুটপাত ব্যবহার করা আদৌ সম্ভব নয়। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের নিয়ে তো আমাদের মোটেই কোনো মাথাব্যথা নেই। নারীদের জন্যও ফুটপাতে চলাচল করা অত্যন্ত ঝামেলাপূর্ণ, বিব্রতকর, কখনো কখনো হয়রানিমূলক। তাই নিতান্তই বাধ্য না হলে কোনো নারী ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলাচল করতে চান না। প্রধানত তৈরি পোশাকশিল্পের নারী কর্মীদেরই ঢাকার ফুটপাতগুলো ব্যবহার করতে দেখা যায়; আর কিছু নারীকে স্বল্প দূরত্বে হেঁটে যাওয়া-আসা করতে দেখা যায়, যাঁরা মানুষের বাসা-বাড়িতে গৃহস্থালি কাজ করেন। শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারীদের ঢাকার ফুটপাতে নিয়মিতভাবে হেঁটে চলাচল করতে দেখা যায় না।

    সবকিছু মিলিয়ে আমাদের প্রিয় রাজধানীর ফুটপাতগুলোর যে অবস্থা, তাতে নগরবাসীর হেঁটে চলাচল করার অধিকার ভোগ করার কোনো সুযোগ নেই। কোনো সভ্য দেশের রাজধানী শহরে এমন অবস্থা কল্পনা করা যায় না। এসব বিবেচনায় নগরবাসীর হেঁটে চলাচল করার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা বিপুলসংখ্যক নগরবাসীর স্বার্থের বিষয়। আমার ধারণা, এমনকি সচ্ছল, ধনী, অতি ধনাঢ্য পরিবারগুলোর সদস্যরাও এই দাবির বিরুদ্ধে নন। ফুটপাত মানেই পায়ে চলার পথ; সুতরাং যাঁরা পায়ে হেঁটে চলাচল করতে চান, মহানগরীর ফুটপাতগুলো তাঁদের ব্যবহারের উপযোগী করতে হবে—এটা অত্যন্ত যুক্তিসংগত দাবি। এই দাবিতে গোটা নগরবাসীর সোচ্চার হওয়া উচিত, এ দাবি আদায়ের জন্য ব্যাপক নাগরিক আন্দোলন করে তোলা প্রয়োজন।


    লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

     
    ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ বাংলাদেশ সময় ১৮:৫০