•  

  • ‘দরিয়া-ই নূর’ ঘিরে সৃষ্ট রহস্যের জট খুলছে না


    ঢাকার নবাবি আমলের মহামূল্যবান হীরকখণ্ড ‘দরিয়া-ই নূর’ ঘিরে সৃষ্ট রহস্যের জট খুলছে না। আসল হীরকখণ্ডটি সোনালী ব্যাংক সদরঘাট শাখার ভল্ট থেকে উধাও হয়ে গেছে বলে দাবি উঠেছে নানা মহল থেকে। নবাবদের উত্তরসূরি এবং প্রত্নসম্পদ গবেষকরাও একই আশঙ্কা করছেন।
     
    এর আগে ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি খতিয়ে দেখার তাগিদ দিয়েছিল। ক্যাবিনেট সচিবের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সোনালী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা পরিদর্শনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। এরপর চলে গেছে দীর্ঘ সময়। পরিদর্শন তো দূরে থাক, এখন পর্যন্ত তদন্ত কমিটিই গঠিত হয়নি।
     
    বুধবার (২৮ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত ভূমি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

    কেন, কী কারণে এই রহস্য ভেদ করা হচ্ছে না- এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের ব্যাখ্যা চাওয়ার পাশাপাশি কমিটির পক্ষ থেকে শিগগিরই বিদেশি বিষেশজ্ঞদের উপস্থিতিতে ব্যাংকের ভল্ট খুলে তা যাচাইয়ের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

    কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাইলে ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান জানান, ‘ক্যাবিনেট সচিবের নেতৃত্বে কমিটি করে দরিয়া নূর পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই কমিটির কোনো বৈঠক হয়নি এবং পরিদর্শনে যাওয়া হয়নি’।
     
    বৈঠকে জানানো হয়, দরিয়া-ই-নূর আলোর নদী বা আলোর সাগর বিশ্বের অন্যতম বড় হীরকখণ্ড, যার ওজন প্রায় ১৮২ ক্যারেট। এটির রঙ গোলাপি আভাযুক্ত, এ বৈশিষ্ট্য হীরার মধ্যে খুবই দুর্লভ। প্রত্নসম্পদ গবেষকদের মতে, সারাবিশ্বে বড় আকৃতির দুটি হীরকখণ্ড সবচেয়ে মূল্যবান ও ঐতিহাসিক। এর একটি কোহিনূর, অন্যটি দরিয়া-ই-নূর। কোহিনূর আছে ব্রিটেনের রানির কাছে এবং দরিয়া-ই-নূর ঢাকায় সোনালী ব্যাংকের ভল্টে।
     
    বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, কমিটির সদস্য এ কে এম মাঈদুল ইসলাম বলেন, ব্রিটেনের রানি প্রতিবছর তার গহনা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতেন। শোনা যায়, প্রদর্শনীর পর নকল গহনা ফেরত পাঠানো হয়েছে। আইসিএস অফিসার একটি প্যাকেট সোনালী ব্যাংকের সদরঘাট শাখায় জমা দেয়। কিন্তু ওই প্যাকেটের মধ্যে কী আছে তা অজানা থাকায় এটি ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিদর্শন করা সঠিক হবে না মনে করে তখন আর পরিদর্শন করা হয়নি। এখন বিষয়টি নিয়ে যেহেতু প্রশ্ন উঠছে তাই এটি খুলে দেখা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে ব্যাংকের ভল্ট থেকে প্যাকেটটি নিয়ে দেখার প্রস্তাব দেন তিনি।  
     
    এ প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম হীরা বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে ভূমিমন্ত্রী চাইলে তার নেতৃত্বে সংসদীয় কমিটিও দরিয়া-ই নূর পরিদর্শন করে একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত দিতে পারে।  
     
    সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সপ্তদশ শতাব্দীতে দরিয়া-ই-নূর অন্ধ্রপ্রদেশের মারাঠা রাজার কাছ থেকে হায়দরাবাদের নবাবদের পূর্বপুরুষ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় কিনে নেন (যখন বাংলাদেশে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত)। বিভিন্ন হাত ঘুরে অবশেষে এটি পাঞ্জাবের শিখ মহারাজ রণজিৎ সিংহের হাতে পৌঁছে। তার বংশধর শের সিংহ ও নেল সিংহের হাতে এটি ছিল। ১৮৫০ সালে পাঞ্জাব দখলের পর ইংরেজরা কোহিনূরের সঙ্গে দরিয়া-ই-নূরও করায়ত্ত করে। ১৮৫০ সালে প্রদর্শনীর জন্য কোহিনূর ও দরিয়া-ই-নূর ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়। হীরকখণ্ড দুটি মহারানি ভিক্টোরিয়াকে উপহার হিসেবে দেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। পরে মহারানি কোহিনূর নিজের কাছে রাখলেও দরিয়া-ই-নূর বিক্রি করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তখন এটি বিক্রির জন্য ভারতে ফেরত আনা হয়। ব্রিটিশ-ভারতীয় সরকার ১৮৫২ সালে দরিয়া-ই-নূর নিলামে তুললে ঢাকার ভাগ্যবান জমিদার খাজা আলিমুল্লাহ ৭৫ হাজার টাকায় এটি কেনেন।
     
    দরিয়া-ই-নূর ঢাকার নবাবরা সাধারণত আনুষ্ঠানিক পোশাক পরিধানকালে বাজুবন্দ হিসেবে ব্যবহার করতেন। নবাব সলিমুল্লাহর মৃত্যুর পর এটি নবাব এস্টেটের চিফ ম্যানেজারের তত্ত্বাবধানে চলে যায়। এরপর বহুদিন ধরে কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির হেফাজতে ছিল। প্রতি বছর ফি বাবদ ২৫০ টাকা দিতে হতো নবাবদের। পাকিস্তান সৃষ্টির পর বিভাগীয় কমিশনার এবং রাজস্ব  বোর্ডের অনুমতিক্রমে নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নসুরুল্লাহর সঙ্গে এস্টেটের ডেপুটি ম্যানেজার বেলায়েত হোসেন কলকাতার হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানির কাছ থেকে ১৯৪৯ সালে দরিয়া-ই-নূর ঢাকায় নিয়ে আসেন। এরপর ইম্পেরিয়াল ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ঢাকা শাখায় রাখা হয়। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর ঢাকা ইম্পেরিয়াল ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। তখন দরিয়া-ই-নূর রাখা বাক্সটি ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের সদরঘাট শাখায় গচ্ছিত রাখা হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ব্যাংকটির নতুন নামকরণ হয় সোনালী ব্যাংক।
     
    সূত্রমতে, নানা অব্যবস্থাপনার কারণে জমিদারি আয় কমে গেলে আর্থিক দৈন্যে পড়েন নবাব সলিমুল্লাহ। হাতি, ঘোড়া, উটের বহরসহ স্থাবর-অস্থাবর অনেক সম্পত্তি তিনি বিক্রি করে দেন। তাতেও না কুলালে তিনি ঋণ নেন। ১৯০৮ সালে নবাব সলিমুল্লাহ যখন তার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বন্ধক রেখে ৪১৪২ নং দলিলমূলে ৩ শতাংশ সুদে ৩০ বছরের মধ্যে পরিশোধের শর্তে ১৪ লাখ রুপি ঋণ নেন। কিন্তু অদ্যাবদি এ ঋণটি নবাব পরিবার পরিশোধ করেনি বিধায় এই হীরকখণ্ডটিসহ ঢাকার নবাবদের অন্যান্য অলঙ্কার ও মূল্যবান সামগ্রী সোনালী ব্যাংকেই রক্ষিত আছে।

    এক গবেষণায় ২০ বছর আগে দরিয়া-ই-নূরের মূল্য ধরা হয়েছিল ৫২ কোটি টাকা। যখন টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত তখন দরিয়া-ই-নূরের মূল্য ছিল ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। ওই হিসাব অনুযায়ী এখন চালের প্রতি কেজির মূল্যমান ধরলে দরিয়া-ই-নূরের বর্তমান বাজারমূল্য শতকোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

    কমিটির সভাপতি মো. রেজাউল করিম হীরার সভাপতিত্বে বৈঠকে কমিটির সদস্য ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ, এ কে এম মাঈদুল ইসলাম, জাহান আরা বেগম সুরমা এবং গাজী মম আমজাদ হোসেন মিলন অংশ নেন। ভূমি সচিবসহ মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

     

    নগর প্রতিনিধি/ল'ইয়ার্সক্লাববাংলাদেশ.কম

     
    ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ বাংলাদেশ সময় ১৩:৫০