ঢাকা , ২৪শে জুন ২০১৮ ইং , ১০ই আষাঢ় ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
প্রচ্ছদ » সাক্ষাৎকার / মতামত » রসিকে লাঙ্গল ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ জয়

রসিকে লাঙ্গল ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ জয়

বদরুল হাসান কচি

ড. বদরুল হাসান কচি

প্রায় ৩ লাখ ৯৩ হাজার ভোটারের রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচন হয়ে গেল গতদিন। নির্বাচনে মেয়র পদে সাতজন; ৩৩টি সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ২১১ জন এবং ১১টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে ৬৫ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

কিন্তু মানুষের আগ্রহের জায়গাটি ছিল প্রধান ৩ দলের ৩ মেয়র প্রার্থীকে ঘিরে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু, বিএনপি দলীয় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা, জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার জয়-পরাজয়ই ছিল নির্বাচনের মূল আকর্ষণ। লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা প্রায় এক লাখ ভোট বেশী পেয়ে বিজয়ী হওয়া সত্যি বিশাল আকর্ষণই ছিল সবার কাছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে মোট ভোট পড়েছে ৭৪ শতাংশ।

কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে এটিই প্রথম বড় কোন নির্বাচন হওয়ায় যে কোন মূল্যে সুষ্ঠু ভোটের সর্বোচ্চ আশ্বাসও দিয়েছে কমিশন। এ কারণে কমিশনের জন্য এই নির্বাচন ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী বছরের শেষে কিংবা তার পরের বছরের শুরুতে জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। সেই নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন সরগরম হতে শুরু করেছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে বছরজুড়ে যে অনেকগুলো সিটি নির্বাচন হচ্ছে, তারই প্রথমটি হলো রংপুর। এরপর পর্যায়ক্রমে সিলেট, খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন হবে। মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুর কারণে মেয়র শুন্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনও আসন্ন। সে হিসেবে বলাই যায়, নির্বাচন কমিশনের প্রতি দেশের প্রধানতম বিরোধী দল বিএনপির যে অনাস্থা, অবিশ্বাস, সংশয় কাজ করছিল তা অনেকটাই পরিস্কার হয়েছে বলে ধারণা করা যায় এবং সামনের নির্বাচনগুলোতে সব প্রার্থীকে নিজেদের যোগ্যতা, নেতৃত্ব, ক্যারিশমা দিয়ে ভোটের লড়াইয়ে নামতে হবে তা নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।

রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচনে কমিশনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য প্রাপ্তি হল একটি কেন্দ্রে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণ হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ভোট গ্রহণে কোনো বিচ্যুতি ছিলনা, ছিলনা কোনো অভিযোগ। বরং ভোটারদের কাছ থেকে খুব ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। ভোট গ্রহণ শেষে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাক্ষাৎকারে অনেক ভোটারদের উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। ইভিএমের আরেকটি সার্থকতা টেলিভিশন খবরে দেখতে পেলাম- ভোট গ্রহণ শেষে মাত্র ৩০ মিনিটেই ঐ কেন্দ্রের প্রায় ১৫০০ ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। যেখানে অন্যান্য কেন্দ্রে ভোট গণনা তখনো শুরুই করা যায়নি। ধারণা করা যাচ্ছে, আমাদের ভোটিং সিস্টেমে ভবিষ্যতে পূর্ণভাবে ইভিএমে চালু করা গেলে বিপুল সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমে আসবে।

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনেক দিক দিয়েই রোল মডেল। উল্লেখ করার মতো আরেকটি দিক হল- নির্বাচনী প্রচারকাজ মোটামুটি শান্তিপূর্ণই ছিল। কোনো সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই নির্বাচনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। অথচ আমরা দেখি এই ধরণের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অন্তত কয়েকটি কেন্দ্রে হলেও কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। কিন্তু এ নির্বাচন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম- কোন রক্তারক্তি নেই, কোন কেন্দ্র দখল নেই, নেই কোন ভোট প্রদানে বাধা দেয়ার ঘটনা। এ জন্য নির্বাচন কমিশন অবশ্যই ধন্যবাদ পাবার দাবী রাখে। কারণ তারা প্রশাসনকে সেভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন।

সবমিলে বলা যায়, রসিক নির্বাচনে গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। কারণ একটি গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের অধিকার তখনই সুপ্রতিষ্ঠিত যখন একটি গণতান্ত্রিক উপায়ে জনরায় নিয়ে ক্ষমতার পরিবর্তন হয় এবং সে জনরায় গ্রহণের প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারাই মুখ্য বিষয়। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু যিনি পূর্বে মেয়র ছিলেন তিনি যখন তার নিজ কেন্দ্রেই ভাল ব্যবধানে হেরে যান তখন একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা জনগণের সামনে ফুটে উঠে।

তাই রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কেবল লাঙ্গল প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফার জয় হয়নি, জয় হয়েছে নির্বাচন কমিশনেও। নতুন মেয়র এবং নতুন নির্বাচন কমিশন উভয়কে অভিনন্দন।

লেখক: অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সম্পাদক, ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডট কম।