দুর্নীতি দমন ও বিচারিক প্রক্রিয়া

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১২ এপ্রিল, ২০১৮ ৫:৩২ অপরাহ্ণ
গোলাম রহমান

গোলাম রহমান:

দুর্নীতি নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। শেষ নেই আলোচনার। মাঠে-ময়দানে রাজনীতিবিদরা সোচ্চার। সুশীল সমাজ সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে ঝড় তুলছে। প্রতি বছরই টিআইবি দুর্নীতির ধারণা সূচক প্রকাশ করে পত্রিকার হেডলাইন দখল করছে। আবার কখনও কখনও এ খাতে-সে খাতে জরিপ করে সংবাদ সম্মেলন করে দুর্নীতির তথ্য উপস্থাপন করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগী হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন গণশুনানি করছে। পালন করছে দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ। কিন্তু দুর্নীতি থেমে নেই। দুর্নীতি বাড়ছে।

ভিনদেশি এক সাংবাদিক বহুদিন আগে বাংলাদেশে এসে কয়েকদিন থাকার পর এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, এ দেশে সামান্যতম ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিও তার সে ক্ষমতা অর্থ উপার্জনে ব্যবহার করে। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে অর্থসম্পদ অর্জন নতুন কিছু নয়। আড়াই হাজার বছর আগে কৌটিল্য তার ‘অর্থশাস্ত্রে’ রাজকর্মচারীদের নানা উপায়ে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থসম্পদ অর্জনের বিবরণ লিখে গেছেন। সে সময় সংকলিত ‘মনুস্মৃতি’তে রাজকর্মচারীদের অত্যাচার আর দুর্নীতি থেকে প্রজাদের রক্ষা করা রাজার দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দেশে এখন রাজা নেই। আছে রাজনীতিবিদ আর গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা। জনগণের ভোটে রাজনীতিবিদরা নির্দিষ্ট সময়ান্তে জনপ্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল দেশ পরিচালনার ক্ষমতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। রাষ্ট্রপতির আহ্বানে তিনি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী আর উপমন্ত্রীদের সমন্বয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেন। মন্ত্রিসভার সদস্যরা ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন। শপথ গ্রহণ করেন আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের, বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণের, সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের এবং অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে সবার প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণের। দায়িত্ব গ্রহণের সময় ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার যে শপথবাক্য তারা পাঠ করেন, তা বাস্তবায়নে তাদের সফলতা বহুলাংশে প্রশ্নবিদ্ধ। ঘুষ-দুর্নীতি দমনে তাদের সফলতা নেই বললেই চলে। আবার কেউ কেউ নিজেরাই দুর্নীতির পঙ্কিল পথে পা বাড়ান।

দেশে দুর্নীতি প্রতিরোধের নানা আইন আছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন। আমি ২৪ জুন, ২০০৯ থেকে ২৩ জুন, ২০১৩ দীর্ঘ চার বছর কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি। দায়িত্ব গ্রহণের পর কমিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করি, দুর্নীতির দায়ে কখনও কি নামিদামি কেউ সাজা ভোগ করেছেন? তারা কেবল একজন প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির নাম উল্লেখ করেন। কমিশনের আইনজীবীদের সভায় একই প্রশ্নের উত্তরে একজন জ্যৈষ্ঠ আইনজীবী বলেন, তা ছাড়া দু’চারজন ইউনিয়ন কাউন্সিলের মেম্বার-চেয়ারম্যান সাজা ভোগ করে থাকতে পারেন। আমার চার বছরের মেয়াদে অবস্থার হেরফের তেমন একটা হয়নি। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে কেবল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমানের অনুপস্থিতিতে দুর্নীতির দায়ে সাজা হয়। ঘুষ হিসেবে তার নেওয়া বিদেশি ব্যাংকে জমাকৃত-বাজেয়াপ্তকৃত অর্থ দেশে ফেরত আনা হয়। তবে সে সময়ে কমিশনের কর্মকাণ্ড, আমার কথা বারবার পত্রিকার হেডলাইন হয়েছে, টেলিভিশনের পর্দায় ঝড় তুলেছে, আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক খাতের দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর নানা ঘটনা, হলমার্ক, ডেসটিনি ইত্যাদির তদন্ত হয়েছে, মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে, দোষীদের জেলে পাঠানো হয়েছে। তবে অধিকাংশ মামলার বিচার প্রক্রিয়া এখনও শেষ হয়নি, সাজা হয়েছে হাতেগোনা দু’চারজনের। বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে সাধারণভাবে বলা হয়, ‘Justice delayed is justice denied.’ যদি কখনও এসব চাঞ্চল্যকর মামলায় বিচারিক আদালতে অপরাধীদের আদৌ সাজা হয়, তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবে। নামিদামি উকিল-ব্যারিস্টার তাদের পক্ষে মামলা লড়বেন। আরও কয়েক বছর কেটে যাবে। অবশেষে হয়তোবা অপরাধীদের সাজা হবে অথবা আইনের ফাঁকফোকরে তারা ছাড়া পাবেন। কেউ কেউ হয়তোবা ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে সব বিচারের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন বা যাবেন। আর অকাট্য সত্য, ‘In the long run we all are dead.’ এমন প্রেক্ষাপটে দুর্নীতি মামলার ফলাফলের কোনো প্রভাব সমাজে পড়ছে না। বিচারিক প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি মামলার নিষ্পত্তি থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করছেন না। সাজার ভয়ে দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা দুর্নীতি থেকে বিরত থাকছেন না। বরং অনুসন্ধান-তদন্তের ধীরগতি, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা আর আইনের ফাঁকফোকরে বা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে পার পেয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির ব্যাপকতা দিন দিন বাড়ছে। এমতাবস্থায় দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন বহুলাংশে অকার্যকর। এই বাস্তবতায় দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাসের মাথায় এক সংবাদ সম্মেলনে আমি দুর্নীতি দমন কমিশনকে ‘দন্তহীন বাঘ’ বলে মন্তব্য করেছিলাম। নানাজন নানা ব্যাখ্যা করেছেন। বস্তুত রূপক ব্যবহার করে আমি বাস্তবতার প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম। তবে অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন এর পরও হয়নি।

কেবল দুর্নীতির মামলা নয়, বস্তুত সব মামলার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেই বর্তমান বিচারিক প্রক্রিয়া প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। ৩৩ লাখ মামলা বিচারাধীন আছে। প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেছিলেন, যদি নতুন কোনো মামলা রুজু না হয়, বর্তমানে বিচারাধীন মামলাগুলোর বিচারকার্য সম্পন্ন করতে ৩০ বছর সময় লাগবে। বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এ জট কমানো সম্ভব বলে মনে হয় না। মামলা তদন্ত ও পরিচালনায় দুর্বলতা, বিচার কার্যক্রমের দীর্ঘসূত্রতা আর জটিলতা কেবল দুর্নীতি প্রতিরোধে নয় বরং দেশে ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠায় অন্যতম প্রধান অন্তরায়। বিচার প্রক্রিয়ার আমূল সংস্কার আর বিচার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত সব মহলের মানসিকতার পরিবর্তন ব্যতীত এ অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়। যদি আইনি প্রক্রিয়ার সংস্কার করে মামলা রুজুর এক বছরের মধ্যে বিচারিক আদালতে এবং পরবর্তী এক বছরের মধ্যে উচ্চ আদালতে মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা যায়, তবে দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশন কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে এবং দেশে আইনের শাসনও সুপ্রতিষ্ঠিত হবে। প্রতি বছর যদি একশ’ নামিদামি দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তি সব বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে শাস্তি ভোগ করেন, তাহলে দুর্নীতি ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। তবে এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দেখা দিতে পারে বিচার কাজের সঙ্গে জড়িত নানা মহলের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থ- তাদের আয়-রোজগারের প্রশ্ন।

দুর্নীতি আর রাজনীতির মধ্যে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। এর মূলে আছে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন প্রক্রিয়া। ২০০১-এর শেষ দিকের কথা। আমি সে সময়ে সরকারের সচিব পদে দায়িত্ব পালন করছি। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত মন্ত্রীর সঙ্গে আমার দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক। তিনি তার এলাকার জনপ্রিয় নেতা এবং বেশ কয়েকবার পরপর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। কথা প্রসঙ্গে একদিন তিনি বলেন, দিন দিন নির্বাচনী ব্যয় বাড়ছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তার ব্যয় হয়েছে ৭৫ লাখ টাকা। পরবর্তী নির্বাচনে সম্ভবত ব্যয় করতে হবে কয়েক কোটি টাকা। রাজনীতিতে যদি টিকে থাকতে হয়, মন্ত্রী পদে থাকা অবস্থাতেই তাকে এ টাকার সংস্থান করতে হবে। তাছাড়া দল পরিচালনা এবং দলে কর্তৃত্বের অধিকারীদের সন্তুষ্টির জন্য নিয়মিত অর্থের জোগান দিতে হয়। মন্ত্রীর ক্ষমতা ব্যবহার করেই তাকে সব দিক সামলাতে হবে। নির্বাচনী ব্যয় ছাড়াও একজন সংসদ সদস্য তার এলাকায় যখন যান, তখন তাকে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। বিশাল কর্মী বাহিনীকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করতে হয়। তাদের আয়-রোজগারের পথ সুগম করে দিতে হয়। তাদের ন্যায়-অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে হয়। এলাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ঠিকাদারির কাজ তারা যাতে পান, তা দেখতে হয়। সভা-সমিতির আয়োজনে অর্থের জোগান দিতে হয়। গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করতে হয়। মসজিদ-মন্দির আর ধর্মীয় কাজে সহায়তা দিতে হয়। বিয়ে-শাদিতে উপঢৌকন দিতে হয়। আরও কত কী। মন্ত্রীর কথায় হতাশা ছিল, ক্ষোভ ছিল; কিন্তু তাতে ফুটে উঠেছে কঠিন বাস্তবতা। এ চিত্র অধিকাংশ সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অধিকন্তু দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো নেতার দুর্নীতির কারণে জনসমর্থন হ্রাস পেয়েছে, তার কোনো নজির বাংলাদেশে নেই। দুর্নীতিপরায়ণ অনেক রাজনীতিবিদই বারবার জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ একাধিক নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কয়টিতেই জয়ী হয়েছেন।

দুর্নীতি কি কেবল রাজনীতিতে? তা নয়। দুর্নীতি নেই এমন কোনো সরকারি অফিস বা সংস্থা খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। বেসরকারি খাত? সেখানেও দুর্নীতি রয়েছে। সম্প্রতি রাজনীতিকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করছে মনোনয়ন বাণিজ্য। রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ব্যাপক হারে অনুপ্রবেশ। রাজনীতি সমাজের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে। জাতীয় সংসদের সদস্যরা আইন প্রণয়ন করেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, ‘সংসদ’ সব ক্ষমতার উৎস। চীন দেশের প্রবাদ, ‘মাছের পচন ধরে মাথায়।’ তাই দেশ ও সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে রাজনীতিকে ঘিরে দুর্নীতির যে দুষ্ট চক্র তৈরি হয়েছে, তা থেকে রাজনীতিকে মুক্ত করতে হবে। রাজনীতিতে জনদরদি রাজনীতিবিদদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য প্রধান প্রতিবন্ধকতা আমাদের চিরাচরিত রাজনৈতিক ধ্যান-ধারণা। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে যুক্তরাজ্যের আদলে। যুক্তরাজ্য প্রায় দুইশ’ বছর এ দেশ শাসন করেছে। ব্রিটিশদের ধ্যান-ধারণা আমাদের মজ্জাগত হয়ে গেছে। ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ আর ‘একক নির্বাচনী এলাকা’র ধারণা আমরা তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছি। তবে বিদ্রোহ ঠেকাতে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য যদি দলত্যাগ করেন অথবা সংসদে দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তার সদস্য পদ হারানোর বিধানটি আমাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে সংসদীয় গণতন্ত্রের স্থলে ‘সংসদীয় একনায়কত্ব’ প্রতিষ্ঠার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে শাসন পদ্ধতি হিসেবে ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ বাংলাদেশের জন্য আদৌ উপযোগী কিনা তার মূল্যায়ন প্রয়োজন। আমার ধারণা, ফ্রান্স, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলংকার গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি, রাজনৈতিক দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অধিক কার্যকর।

বাংলাদেশে একক ‘নির্বাচনী এলাকা’ থেকে একজন করে সংসদ সদস্য নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে নির্বাচনী প্রক্রিয়া বহুলাংশে অর্থ ও পেশিশক্তিনির্ভর হয়ে পড়েছে। আর সংসদ সদস্যরা, বিশেষ করে সরকারদলীয় সদস্যরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় এখন নির্বাচিত ‘মহারাজা’। রাজনীতি সম্মান বয়ে আনে, সঙ্গে সঙ্গে তা লাভজনক পেশায় পরিণত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রমান্বয়ে ব্যবসায়ীরা অধিক সংখ্যায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হচ্ছেন। ‘জনসেবা’ নয়, ‘প্রোফিট মোটিভ’ তাদের রাজনীতির চালিকাশক্তি। একক নির্বাচনী এলাকার স্থলে দেশব্যাপী অথবা বিভাগ বা জেলাভিত্তিক ভোটের আনুপাতিক হারে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচনের প্রথা প্রবর্তন করা গেলে সম্ভবত নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির দৌরাত্ম্য হ্রাস পাবে, রাজনৈতিক হানাহানি কমবে, ব্যবসায়ীদের ক্রমবর্ধমান হারে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের হারও বহুলাংশে কমে যাবে। দলে দলে বৈরী ভাব কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে এবং সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্বে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

কেবল রাজনৈতিক বা বিচারিক সংস্কার করলেই দুর্নীতির লাগাম টানা সম্ভব হবে, তা কিন্তু নয়। দুর্নীতি দমনে রাজনৈতিক ও বিচার প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রয়োজনীয় কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। সরকারের দৃঢ় অঙ্গীকার বা জিরো টলারেন্স এবং জনসচেতনতা দুর্নীতি দমনে সহায়ক। দুর্নীতিপরায়ণ ব্যক্তিরা ক্ষমতাধর। সাধারণ মানুষ তাদের মোকাবেলায় অসহায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কমিশন সব দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে তাদের সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম-বর্ণ বিবেচনায় না নিয়ে, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হয়ে, নিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে দুর্নীতি কমে আসবে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় পৌঁছবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর করার স্বপ্ন তখনই কেবল বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।

লেখক: দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান