ঢাকা , ১৭ই আগস্ট ২০১৮ ইং , ২রা ভাদ্র ১৪২৫ বঙ্গাব্দ
প্রচ্ছদ » পড়াশোনা » অ্যাডভোকেটশিপ ভাইভা পরীক্ষার ভয়কে সহজে জয় করুন

অ্যাডভোকেটশিপ ভাইভা পরীক্ষার ভয়কে সহজে জয় করুন

আইনজীবী মাহমুদ ওয়াজেদ

মাহামুদ ওয়াজেদ:

অ্যাডভোকেটশিপ লিখিত বা প্রিলি পরীক্ষার থেকে ভাইভা পরীক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে পরীক্ষার্থীদেরকে একটু বেশি নার্ভাস দেখায়। এর কারণ হচ্ছে মনের ভিতর একটা ভয় কাজ করে। আমাকে যে প্রশ্ন করা হবে, তার উত্তর আমি দিতে পারবো কিনা। আসলে ভয় বলে কিছু নেই, ভয় হচ্ছে আপনার প্রশ্নের উত্তর না জানা। তবে মনে রাখতে হবে ভাইভা পরীক্ষার কিন্তু কোন সিলেবাস হয়না, ভাইভা বোর্ড আপনাকে যে কোন ধরণের বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। ধরুন আপনি ভাবছেন অ্যাডভোকেটশিপ পরীক্ষার ভাইভা, তার মানে আপনাকে আইন থেকে প্রশ্ন করা হবে। বাস্তবে এমনটি নাও হতে পারে। ভাইভা বোর্ড চাইলে আপনাকে সরকার এবং রাজনীতি নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন। কারণ হচ্ছে একজন পরীক্ষক ভাইভা বোর্ডে আপনার জানার পরিধি পরীক্ষা করার চেয়ে যেসব বিষয়ের দিকে নজর দেন সেগুলো হচ্ছে-

আপনি কতটা বিনয়ী?

কতটা আত্মবিশ্বাসী?

কতটা প্রাণবন্ত?

কতটা র্নাভাস?

যেকোন পরিস্থিতি আপনি কতটা সামলে নিতে পারবেন?

আপনাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, দুই একটি প্রশ্ন করে আপনার সম্পূর্ণ মেধা যাচাই করা যে সম্ভব না, সেটা ভাইভা বোর্ড জানে। এমনকি আপনি দুই একটা প্রশ্নের উত্তর প্রদান করতে পারেননি, তাতেও ভয় পাবার কারণ নেই। যদি আপনি সব কিছু মিলিয়ে একটা পারফরম্যান্স দেখাতে পারেন তবেই কৃতকার্য হতে পারেন। নিম্নে বিষয় গুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো-

১। নিজ সম্পর্কে জানা

নামের অর্থ, নামের সঙ্গে মিল আছে এমন বিখ্যাত ব্যক্তি। আপনার পছন্দের কবি, সাহিত্যিক, সাহিত্য, গান, খেলাধুলা সম্পর্কে উত্তর প্রস্তুত রাখুন।

২। বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ

আপনার বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগ সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত শিক্ষক, আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ভিসি এবং বিভাগের ডিন সম্পর্কে ধারণা রাখুন।

৩। নিজ জেলা ও উপজেলা

আপনার নিজ জেলা ও উপজেলার বিখ্যাত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধার নাম, মুক্তিযুদ্ধের সময় আপনার জেলা কত নম্বর সেক্টরে ছিল, জেলার বিখ্যাত ব্যক্তি, নদী, বন্দর, বিখ্যাত স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে রাখুন।

৪। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ

১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত আলোচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে, মুক্তিযুদ্ধে যারা অসামান্য আবদান রেখেছেন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ বই, উপন্যাস, কবিতা এবং যেসব বুদ্ধিজীবী, কবি ও সাহিত্যিক মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন, মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নাটক, উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ এবং বিখ্যাত গান ও ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে ধারণা রাখুন।

৫। সংবিধান

সংবিধান সম্পর্কে জানা একান্ত জরুরি। এক্ষেত্রে আপনাকে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ, সংশোধনী মামলা সম্পর্কে জেনে রাখুন।

৬। উত্তর ইংরেজি না বাংলা

প্রশ্ন ইংরেজিতে করলে উত্তর ইংরেজিতে দিবেন, বাংলায় করলে বাংলায় উত্তর দিবেন।

৭। মনোযোগ দিয়ে শুনুন

পরীক্ষকের প্রশ্ন মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। শুনার পর একটু সময় নিয়ে গুছিয়ে উত্তর দিতে হবে। উত্তর দেওয়ার সময় আপনার জানা বিষয় দিয়ে উত্তর দিবেন।

৮। প্রশ্ন উত্তর জানা না থাকলে

যদি কোন প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকলে, বিনয়ের সাথে বলবেন, প্রশ্নের উত্তর আপনার জানা নেই। কখনো চালাকি করে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করবেন না।

৯। ওভার স্মার্টনেস দেখাতে যাবেন না

পরীক্ষক যে প্রশ্ন করবেন ঠিক সেই উত্তরই দিতে হবে, আগ বাড়িয়ে কোনো বিষয়ে বলা যাবেনা। অতিরিক্ত স্মার্টনেস দেখাতে যাবেন না।

১০। উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে কৌশলী হোন

উত্তর পরীক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় আপনার জানা বিষয় দিয়ে উত্তর দিবেন। কারণ আপনার উত্তরের উপর নিভর্র করে পরবর্তী প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হতে পারে।

১১। বডি ল্যাংগুয়েজ

যখন কারও প্রশ্নের জবাব দেবেন, হাত-পা নেড়ে কথা বলবেন না। আবার শরীর শক্ত করে বসেও থাকবেন না। স্বাভাবিক ভাবে জবাব দিন।

১২। অপ্রাসঙ্গিক কিছু নয়

ঠিক যে প্রশ্নটা করা হয়েছে আপনাকে সেটার উত্তরই দিন। বেশি জানা থাকলেও লম্বা উত্তর দিতে যাবেন না।

১৩। ভাইভা শেষে

ভাইভার প্রশ্ন করা শেষ হলে, সামনে থাকা আপনার কাগজপত্র ভাঁজ করে ফাইলে নিন ও উঠে দাঁড়ান। তারপর সালাম দিন এবং দু’পা পেছনে এসে ঘুরে বের হন ভাইভার কক্ষ থেকে।

ভাইভা পরীক্ষার সাজেশন্স

অ্যাডভোকেটশিপ ভাইভার জন্য শুধুমাত্র যে বিষয়গুলার উপর ফোকাস করবেন তা নিম্নে উল্লেখ করা হলঃ

দেওয়ানি কার্যবিধি

দেওয়ানি প্রকৃতির মামলা, দেওয়ানি আদালতসমূহের এখতিয়ার, রেস-জুডিকাটা ও রেস-সাবজুডিস, প্লিডিংস (আরজি ও জবাব) এবং প্লিডিংস (আরজি ও জবাব) সংশোধন, আরজি, পাল্টা দাবী, সমন, উদ্ঘাটন এবং পরিদর্শন, পক্ষগণের উপস্থিতি এবং অনুপস্থিতির ফলাফল, বিচার্য বিষয় নির্ধারণ এবং মামলা নিস্পত্তি, মূলতবী, বিকল্প বিরোধ নিস্পত্তি: মধ্যস্থতা, সালিস এবং আপিলে মধ্যস্থতা, মামলার স্থানান্তর,  বিভিন্ন প্রকার মামলা: প্রতিনিধিত্বমূলক মামলা, ইন্টারপ্লিডার (একাধিক দাবিদার) মামলা, নিঃস্বর মামলা, অর্থআদায়ের (মানি) মামলা, সত্ত্বের মামলা ইত্যাদি, মামলা উত্তোলন ও আপোষ নিস্পত্তি, মধ্যস্থতা এবং সালিস, পক্ষগণের মৃত্যু, বিবাহ ও দেউলিয়া হওয়ার ফলাফল, রায় ও ডিক্রী, ডিক্রী জারি, আপিল, রিভিউ, রিভশন রেফারেন্স, প্রত্যার্পন, আদালতের সহজাত ক্ষমতা।

সুর্নিদিষ্ট প্রতিকার আইন

সুর্নিদিষ্ট প্রতিকার আইনের স্থাবর সম্পত্তির বেদখল পুনরুদ্ধার, দলিল সংশোধন, দলিল বাতিল, ঘোষণা মূলক ডিক্রি, নিষেধাজ্ঞা, অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, চিরস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা, বাধ্যতামূলক নিষেধাজ্ঞা।

সাক্ষ্য আইন

মৌখিক সাক্ষ্য, দালিলিক সাক্ষ্য, প্রাসঙ্গিক ঘটনা, বিচার্য বিষয়, দলিল,  প্রমাণিত, মিথ্যা প্রমানিত, অপ্রমাণিত, প্রমাণিত বলে ধরে নিতে পারে, অবশ্যই প্রমাণিত বলে ধরে নিবে, চূড়ান্ত প্রমাণে কোন কোন বিষয়ে আদালতে সাক্ষ্য দেয়া যায়, স্বীকৃতি, স্বীকারোক্তি ধারা ৩২ এবং ৩৩, দলিল, দালিলিক সাক্ষ্য, মৌখিক সাক্ষ্য এবং প্রমাণের দায়িত্ব , এস্টপেল, জবানবন্দী, জেরা, পুনঃজবানবন্দী, সাক্ষ্য গ্রহণের ক্রম, ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন।

ফৌজদারি কার্যবিধি

ফৌজদারি আদালতসমূহের গঠনপ্রণালী ও ক্ষমতা, গ্রেফতার, পলায়ন এবং পুনরায় গ্রেফতার, জরুরী ক্ষেত্রে অস্থায়ী আদেশ প্রদান, তদন্ত ডায়েরি এবং পুলিশ প্রতিবেদন, মোকদ্দমার স্থানান্তর, আসামির অনুপস্থিতিতে বিচার, হেবিয়াসকর্পাস প্রকৃতির নির্দেশ, হাইকোর্ট বিভাগের রিভিশনের এখতিয়ার, প্রকারভেদ, চার্জ, বিচার পদ্ধতি, জামিন, আপীল এবং রিভিশন, কোয়াশমেন্ট, ১৪৪/১৪৫ ধারা, সংক্ষিপ্ত বিচার।

দন্ডবিধি

অভিন্ন অভিপ্রায়, সাধারণ উদ্দেশ্য, ষড়যন্ত্র, আনলফুল এসেম্বলি, জেনারেল এক্সসেপশনস বা সাধারণ ব্যতিক্রমসমূহ, শাস্তিসমূহ, মানুষের শরীর বা মানবদেহ সম্পর্কিত অপরাধসমূহ খুন, অপরাধজনক নরহত্যা, আঘাত, অপহরন, অপবাহন, অবৈধ আটক ও অবৈধ অবরোধ, ধর্ষণ, সম্পওি সম্পর্কিত অপরাধ চুরি, ছিনতাই, দস্যুতা, ডাকাতি, প্রতারনা, জালিয়াতি।

তামাদি আইন

ধারা-৩, ৫, ৬, ৮, ৯, ১২, ১৪, ১৮, ১৯, ২৬, ২৮, আপীল ও দরখাস্তের ক্ষেএে তামাদির মেয়াদ, তামাদির সময় হিসাব, ইজমেন্টরাইট।

নিম্নের আইনগুলোর শুধুমাত্র প্রাক্টিস সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পড়ে রাখুন-

বাংলাদেশের সংবিধান, স্পেশাল পাওয়ারস অ্যাক্ট-১৯৭৪, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের শিশু আইন -২০১৩, যৌতুক নিরোধ আইনের নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্ট অ্যাক্ট।

এছাড়াও জেনে রাখুনঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, প্রধান বিচারপতি, কোর্ট কাচারি সংক্রান্ত খুঁটিনাটি বিষয়ে।

সবার জন্য শুভ কামনা রইল। আল্লাহ্ আপনাদের সকলের মঙ্গল করুক।

লেখক: আইনজীবী, জজকোর্ট, ঢাকা এবং আইনের সহজপাঠ বইয়ের রচয়িতা