ব্যভিচারের বিচার, ডা. আকাশ এবং কয়েকটি আইনি জিজ্ঞাসা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১২:০৮ অপরাহ্ণ

শ. ম. ম. হাসান :

[এক]
বেশ কদিন যাবত ডাক্তার আকাশের আত্মহত্যার সাথে জড়িত পরকীয়া, ব্যভিচার- এ বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নিউজড ফিডে ঘুরপাক খাচ্ছে। আবেগ, ক্ষোভ, রাগ, অভিমান, হা হুতাশ এর তোপে যে বিষয়টি আড়ালে রয়ে গেছে তা হচ্ছে – ব্যভিচার এর একটি আইনি ব্যাখ্যা।

আমাদের পেনাল কোডের ধারা ৪৯৭ এ ব্যভিচার কে শাস্তি যোগ্য করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে -: যে ব্যক্তি কোনো বিবাহিত মহিলার সাথে তার স্বামীর সম্মতি অথবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে যৌন সঙ্গম করবে সে ব্যভিচার করেছে বলে ধরা হবে। যার শাস্তি ৫ বছর পর্যন্ত কারাবাস অথবা শুধু জরিমানা অথবা দুটোই। পেনাল কোডের ফ্রেমারগণ শুরুতে কিন্তু এই ‘ব্যভিচার’ কে পেনাল কোডে অপরাধ হিসেবে রাখেননি। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ল’ কমিশন মত দেয় যে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের সামাজিক দিক বিবেচনা করে ব্যভিচার কে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেয়া ঠিক হবেনা। এভাবেই ব্যভিচার একটি অপরাধ হিসেবে পেনাল কোড, ১৮৬০ এর ধারা ৪৯৭ এ জায়গা করে নেয়। মজার বিষয় হচ্ছে এই ধারায় একমাত্র পুরুষ অপরাধীকেই শাস্তির আওতাভুক্ত করা হয়েছে এবং বিবাহিত মহিলাটিকে শুধুমাত্র ‘পার্টনার ইন ক্রাইম’ হিসেবে শাস্তির বাইরে রাখা হয়নি বরং প্ররোচনাকারী হিসেবেও যেন শাস্তি না পায় তার নিশ্চয়তা বিধান করা হয়েছে। অবিবাহিত মহিলার সাথে, বিধবার সাথে, অথবা স্বামীর সম্মতিপ্রাপ্ত স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম কিন্তু ব্যভিচার এর আওতায় পড়বেনা। পুরুষ অপরাধীকে উক্ত মহিলা কার স্ত্রী তা সুনির্দিষ্ট ভাবে জানতে হবে এমন কোনো কথা নেই, শুধু এটা জানাই যথেষ্ট হবে যে মহিলাটি বিবাহিতা, তাতেই অপরাধটি সংগঠিত হবে।

এই ধারায় সুন্দর একটি শব্দ আছে- ‘connivance’ এর অর্থ পরোক্ষ সম্মতি। এমন বিষয়ে সম্মতি যেই বিষয়ে একজনের জ্ঞান এবং নীরব বশ্যতা দুটোই আছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে স্বেচ্ছায় দেখেও না দেখা অথবা বিঘ্ন সৃষ্টি না করা। অর্থাৎ কোনো স্বামী যদি তার স্ত্রীকে পরপুরুষের সাথে ঘুরতে, থাকতে এবং যৌনসঙ্গম করতে দেখেও চুপ থাকে, এড়িয়ে যায়, মেনে নেয় সেক্ষেত্রে ওই যৌনসঙ্গমে স্বামীর সম্মতি আছে বলে ধরে নেয়া হবে এবং তা কোনো অপরাধ বলে গণ্য হবেনা। এই ধারায় খুব সূক্ষ্ম কয়েকটা শর্তের মধ্যে অন্যতম শর্ত হলো – উক্ত ব্যভিচার ধর্ষণের শামিল হতে পারবেনা। অর্থাৎ উক্ত স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো ধরণের যৌনসঙ্গম করা যাবেনা। তার মানেই এই দাঁড়ালো যে – অন্যের স্ত্রীর সাথে যৌন সঙ্গম তখনি বৈধ হবে যখন স্বামী এবং স্ত্রী দুজনেরই সম্মতি থাকবে। স্বামী বা স্ত্রীর একজন যদি বেঁকে বসে তাহলে কিন্তু রক্ষা নাই। স্বামী সম্মতি না দিলে – ব্যভিচার, স্ত্রী সম্মতি না দিলে – ধর্ষণ। আরো সহজে বলতে গেলে – পরপুরুষের সাথে যৌনসঙ্গমে স্বামী সম্মতি দিলো কিন্তু স্ত্রী দেয়নি – ধর্ষণ। স্বামী সম্মতি দেয়নি কিন্তু স্ত্রী দিয়েছে – ব্যভিচার। ধর্ষণের ক্ষেত্রে উক্ত মহিলা নিজে বাদী হয়ে মামলা করতে পারবে কিন্তু ব্যভিচারের বেলায় মামলা করতে পারবে একমাত্র স্বামী।

[দুই]
কিছুদিন আগে ভারতে এই ধারা বাতিল হবার পেছনে এই বিষয়টি অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এই ধারায় ব্যভিচার কারিনী স্ত্রীকে প্ররোচনাকারী হিসেবে শাস্তির আওতার বাহিরে রাখা হয়েছে – ঠিক তেমনি ভাবে একজন স্বামীর স্ত্রী যদি যদি ব্যভিচার করতেই থাকে এবং সেই ব্যভিচার বিরুদ্ধে স্বামী কোনো আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে রাগে দুঃখে ক্ষোভে আত্মহত্যা করে- তখন উক্ত স্ত্রীকে ‘শুধুমাত্র ব্যভিচার’ এর ভিত্তিতে আত্মহত্যার প্ররোচনাকারী হিসেবে শাস্তি দেয়া কতটুক যৌক্তিক তাও কিন্তু আলোচনার দাবী রাখে।

আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধ প্রমাণ করতে হলে সেখানে রাষ্ট্রপক্ষকে প্ররোচনাকারী উক্ত প্ররোচণায় সরাসরি জড়িত থাকার বিষয় প্রমাণ করতে হবে। দূরবর্তী প্ররোচনায় বা নিজে নিজে মনঃকষ্ট পেয়ে কেউ আত্মহত্যা করলে তাকে কেউ প্ররোচিত করছে এমনটা বলা যাবেনা। স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহে নাখোশ হয়ে নিজের অস্তিত্বের সংকটের কথা চিন্তা করে ১ম স্ত্রী আত্মহত্যা করলে উক্ত স্বামী উক্ত স্ত্রীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছে এমনটা বলা যাবেনা। প্ররোচনার বিষয়টি হতে হবে সরাসরি – যেমন, স্বামী স্ত্রীকে বললো – ‘তুই মরে যা, তোর মুখ দেখতে চাইনা’, ইঁদুরের বিষ খেয়ে মরে যেতে পারিসনা!’ অথবা স্ত্রী স্বামী কে বললো – ‘তোর মতো স্বামীর সাথে থাকার চাইতে পতিতা হওয়া ভালো, তুই মরে গেলে আমি বাঁচি’ এবং এভাবে স্ত্রী বা স্বামী প্ররোচিত হয়ে আত্মহত্যা করলো। এসব কথা সামনাসামনি না বলে ফোন , মেসেঞ্জার , টেক্সট, ভিডিও কলে বললেও সরাসরি বলেছে বলে ধরে নেয়া হবে। এ সব ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্ররোচনা হয়েছে বলে আদালত ধরে নেবে। ডাক্তার আকাশের ক্ষেত্রে তার স্ত্রী মিতু তাকে কতটা প্ররোচিত করেছে তা প্রমান সাপেক্ষ বিষয়। তবে শুধুমাত্র স্ত্রীর পরকীয়া এবং ব্যভিচারের কারণে হতাশায় কেউ আত্মহত্যা করলে উক্ত ব্যভিচার ‘প্ররোচনার আওতায় পড়বে কিনা তা নিয়ে আইনি আলোচনা চলে।

যেই মামলার রায়ে ভারতে ব্যভিচার শাস্তির এই ধারা বাতিল করা হয়েছে তার বীজ কিন্তু বোনা হয়েছিল – সৌমিত্রি বিষ্ণু বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া, ১৯৮৫ মামলায় । যদিও ওই মামলায় ব্যভিচার এর শাস্তি অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা চাওয়া হয়েছিল কিন্তু আদালত তা নাকচ কর দেন এবং রায় দেন যে ধারাটি অসাংবিধানিক নয়। কিন্তু রায়ের শেষে কিছু কথা জুড়ে দেন – আদালত বলেন, ‘সমাজে নারীদের আচরণগত এই বিষয়টি একদিন সঠিকভাবে আইনপ্রণেতাদের দৃষ্টিতে ধরা দেবে এবং তারা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ব্যভিচার এর সংজ্ঞাকে আরো বিস্তৃত করবে। কিন্তু ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১৮ এসে ব্যভিচারের পুরো ধারাই অসাংবিধানিক ঘোষণা করে দিলো। এবার চলুন ওই মামলায় রায়ের কারণ গুলো জেনে আসি। এটা ছিল একটি জনস্বার্থে মামলা (Joseph Shine v Union of India), যা ফাইল করা হয় ২০১৭ তে। মূল যুক্তি ছিল এই ব্যভিচার এর ধারাটি ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদঃ – ১৪ এবং ১৫ এর সাথে সাংঘর্ষিক। স্বাভাবিকভাবেই সংবিধানের সাথে কোনো আইন বা আইনের ধারা সাংঘর্ষিক হলে উক্ত আইন বা আইনের ধারা বাতিল হয় যায়। অনুচ্ছেদঃ ১৪ তে বলা হয়েছে – ‘রাষ্ট্র কোনও ব্যক্তির আইনের দৃষ্টিতে সমতাকে এবং ভারত ভূখণ্ডে আইনের সুরক্ষা লাভের অধিকার কে অস্বীকার করবে না’ যা আমাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৭ এর সাথে মিলে। আর অনুচ্ছেদঃ ১৫ তে বলা হয়েছে – ‘রাষ্ট্র কোনও নাগরিকের সাথে ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থান বা তাদের কোনও ভিত্তিতেই বৈষম্যমূলক আচরণ করবেন না’। এই অনুচ্ছেদঃ ও আমাদরে সংবিধানের অনুচ্ছেদঃ ২৮ এর সাথে মিলে যায়। পিটিশন গ্রহণ করে সুপ্রিম কোর্ট শুরুতেই বলেন – ‘এই বিষয় নিয়ে বহু মামলা হয়েছে, অতএব উক্ত বিষয়ে একটু আশু সুরাহা দরকার। আইন লিঙ্গ- নিরপেক্ষ হবে। উক্ত ধারায় মহিলাকে একটি ‘অস্থাবর সম্পত্তি’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে যা একজন মহিলার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি ক্ষতিকারক’।

অন্যদিকে যারা এই ধারা রাখতে চেয়েছেন তারা যুক্তি দেখালেন – বিয়ের মতো একটি পবিত্র সম্পর্কের স্থায়িত্ব ধরে রাখার জন্য এই ধারার প্রয়োজন আছে। এই ধারা বাতিল হলে সমাজে ব্যভিচার আরো বেড়ে যাবে। তারা ধারাটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য লিঙ্গ নিরপেক্ষতার যুক্তির সাথে একমত হয়ে ‘কমিটি এন্ড রেফর্মস অফ ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম ২০১৩’ এর একটা সুপারিশ আদালতকে বিবেচনা করতে বলেন – যেখানে বলা হয়েছে – ‘যেই ব্যক্তি অন্যের স্বামী বা স্ত্রীর সাথে যৌনসঙ্গম করবে সেই ব্যভিচার করেছে বলে গণ্য হবে’। অর্থাৎ তারা শুধুমাত্র স্বামী নয় স্ত্রীকেও স্বামীর বিরুদ্ধে ব্যভিচার এর মামলা আনয়ন করার সুযোগ দিয়ে উক্ত ধারাটি রাখার পক্ষে অবস্থান নেন।

আদালত এভাবে পক্ষদের যুক্তি শুনতে থাকে এবং সবশেষে পিটিশনারকে একটি বিষয় প্রমাণ করতে বলে, তা হচ্ছে – যদি পিটিশনার প্রমাণ করতে পারে যে উক্ত ধারা ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদঃ ১৪ কে ভঙ্গ করে তাহলে এই ধারা বাতিল হবে। পিটিশনার তা প্রমাণ করে দেখায় এবং ৫ সদস্য বিশিষ্ট সাংবিধানিক বেঞ্চ সবার সম্মতিক্রমে এই ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। আদালত আরো বলেন –‘Any provision of law affecting individual dignity and equality of women invites wrath of constitution. It’s time to say that husband is not the master of wife.’ এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়।

অনেকে ভুল বেখ্যা দেন যে – ব্যভিচারকে আইনের গন্ডির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিষয়টা আসলে তেমনটি নয়। এই মামলার রায় পড়ে শোনানোর সময় ভারতের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র বলেন- ব্যভিচার কোনো ফৌজদারি অপরাধ হতে পারেনা – বড়জোর এটা তালাকের মতো একটি পারিবারিক বিষয় হিসেবে গণ্য হতে পারে’। অর্থাৎ ব্যভিচার কে ভারতে শুধুমাত্র ফৌজদারী অপরাধের গন্ডি থেকে বাদ দেয়া হয়েছে কিন্তু অন্যান্য আইনি পরিসীমায় যদি ব্যভিচার পড়ে তাহলে সেখানে ব্যভিচার এর বিচার হতে কোনো বাধা নেই। যেমন- তালাকের কারণ হিসেবে অথবা আত্মহত্যার প্ররোচনার কারণ হিসেবে ব্যভিচারের বিষয় আইনি গন্ডিতে আসতে পারে। এভাবে চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল এবং আরো অনেক ইউরোপীয় দেশের মতো ভারতেও ব্যভিচার ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে আর গণ্য হবেনা।

[তিন]
বিশ্বের সবকটি ধর্মই ব্যভিচারকে নিরুৎসাহী করেছে, কড়া শাস্তি আরোপ করেছে। ইংল্যান্ড এ রাজার স্ত্রীর বা কোনো আত্মীয় সাথে ব্যভিচার কে রাজদ্রোহ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যারা ট্রয় মুভিটা দেখেছেন তারা নিশ্চয় দেখেছেন ট্রয়ের রাজকুমার প্যারিস স্পার্টার রাজা মেনেলাউস এর স্ত্রী হেলেন এর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। হেলেন এবং প্যারিস এর চোখে এই সম্পর্ক শুধুমাত্র হৃদয়ঘটিত ব্যাপার (affair) হলেও মেনেলাউস এর কাছে তা ছিল ব্যভিচার (adultery)। হৃদয়ঘটিত ব্যাপার আর ব্যভিচার এর মধ্যে পার্থক্য আছে। প্রথমটাতে যৌন সম্পর্ক নাও থাকতে পারে কিন্তু পরের তাতে অবশ্যই তা থাকতে হবে।

আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ ইসলাম ধর্ম অনুসরণ করে। কিন্তু ব্যভিচার যে আমাদের দেশে কম হচ্ছে তা কিন্তু বলা যাচ্ছেনা। কিছু কিছু অপরাধ নিছক ধর্মীয় অনুজ্ঞার উপর ফেলে রাখা হয় আবার কিছু কিছু অপরাধ ধর্মীয় অনুজ্ঞার গন্ডি পেরিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বে শাস্তিযোগ্য হয়ে উঠে। রাষ্ট্র সব পাপকে দেশীয় আইনে শাস্তিযোগ্য করেনা যতক্ষণ না তা মহামারী আকার ধারণ করে মানুষের মৌলিক অধিকারকে হরণ করা শুরু করে। পূর্বে বাবা মাকে ভরণ-পোষন না দিলে কোনো রাষ্ট্রীয় শাস্তি ছিলোনা যদিও ধর্মীয় ভাবে তা পাপ। কিন্তু ২০১৩ সালে সরকার পিতামাতার ভরণ-পোষণ আইন প্রণয়ন করে, যেখানে চাইলে বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে ভরণ পোষণের জন্য মামলা করতে পারেন। পাপ এবং অপরাধ মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। পাপ নিছক নৈতিক এবং ধর্মীয় অনুশাসন না মানার বিষয় অন্য দিকে অপরাধ একটি আইনি বিষয় যা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে করা হয়। তাই আমরা বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় দেখি – রাষ্ট্র বনাম ‘অমুক’, অর্থাৎ রাষ্ট্র সংক্ষুব্ধ হয়ে মামলা করে এবং তা পাবলিক প্রসিকিউটর দিয়ে পরিচালনা করে। একজন স্বামীর স্ত্রীর সাথে অন্য কোনো পরপুরুষ ব্যভিচার করলে তাতে রাষ্ট্র সংক্ষুব্ধ হতে পারে কিনা নাকি তা স্রেফ দুটি মানুষের ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক বিষয় তাও আইনি বিচার বিশ্লেষণের দাবী রাখে।

[চার]
আমাদের সমাজের মানুষ – একজন নারী ব্যভিচার করতে গিয়ে ধরা পড়বে কিন্তু স্বামী তাকে অত্যধিক মোহরানার কারণে তালাক ও দিতে পারবেনা – এই বিষয় মেনে নিতে পারছেনা। অনেকে এর সমাধান খুঁজতে গিয়ে ধর্মীয় দিক ব্যাখ্যা করে এমন আইন করতে বলেন যে – যদি কোনো নারী ব্যভিচার করতে গিয়ে প্রমানসহ ধরা পরে তাহলে তাকে স্বামী চাইলে তাৎক্ষনাক বাইন তালাক দিতে পারবে এবং উক্ত নারী কোনো রূপ মোহরানা (যদি বাকি থাকে) ভরণপোষণ বা উত্তারিধাকারের হকদার হবেন না।

এমন একটি ইঙ্গিত কিন্তু স্বয়ং মুসলিম উত্তারিধাকর আইনে আছে – যেখানে বলা আছে – খুনি নিহতের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবেননা। অর্থাৎ যদি কোনো সন্তান তার বাবাকে হত্যা করে তাহলে সে তার বাবার উত্তরাধিকারী হবেনা।

এখানে অনেকেই আবার পাল্টা যুক্তি দেখান যে – উত্তরাধিকার এর বিষয়টি মৌরস এর মৃত্যুর পরে উদয় হয় আর মোহরানার বিষয়টি স্বামী এবং স্ত্রীর মাঝে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের সাথে সাথেই পরিপূর্ণ ভাবে দাঁড়িয়ে যায়। তার মানে ব্যভিচার করে ধরা পড়ার আগে থেকেই স্ত্রীর মোহরানা টাকা পাবার হকদার। সেক্ষেত্রে পূর্বে অর্জিত একটি অধিকার পরবর্তী কোনো অপরাধের জন্য কেড়ে নেয়া ঠিক হবেনা। এটি একটি শক্তিশালী যুক্তি। অন্য পক্ষ আবার এর সমাধান ও দিয়েছেন – তালাকে মুবারাহ (যেখান দুই পক্ষই তাদের সম্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটাবে, এবং স্ত্রী স্বামীকে এর জন্য মূল্যবান কিছু দিবে), যেখানে শারিয়া এবং পাবলিক পলিসি দুইটাই ব্যালান্স করা যাবে।

সম্প্রতি আলোচিত ডাক্তার আকাশ আত্মহত্যার বিষয়ে অনেকে অত্যধিক বেশি মোহরানার বিষয়টি সামনে এনেছেন যুক্তি হিসেবে এই দাবীর বিপরীতে যে – আকাশ কেন মিতুকে তালাক দিলোনা। ৩৫ লক্ষ টাকা মোহরানা কিন্তু অনেক বেশি একটা পরিমান টাকার অংকে। যদি এই ধরণের একটি ব্যবস্থা থাকতো তাহলে হয়তো ডাক্তার আকাশ সেদিকে যেতে পারতেন।

[পাঁচ]
পশ্চিমা অনেক দেশে ব্যভিচারকারী পুরুষকে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, অধিকার ভঙ্গকারী হিসেবে বিবেচনা করে তার বিরুদ্ধে টর্ট (civil wrong, যেখানে জেল হয়না শুধু জরিমানা হয়) আইনে মামলা করার ধারণা প্রচলিত আছে। যখন কোনো একজন পুরুষ একজন মহিলাকে বিয়ে করে তখন উক্ত মহিলার সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের একমাত্র এবং একচ্ছত্র অধিকার ওই মহিলার স্বামীর থাকে। সেখানে যখন তৃতীয় পক্ষ এসে উক্ত মহিলার সাথে যৌন সম্পর্ক করে তাহলে ধরে নেয়া হয় উক্ত তৃতীয় পক্ষ স্বামীর উক্ত একচ্ছত্র যৌন সস্পর্ক স্থাপনের অধিকারকে নষ্ট বা ভঙ্গ করেছে। এক্ষত্রে স্বামী বিশাল অংকের টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করে দিতে পারে। এমন ধারণা আমাদের দেশে চালু থাকলে ডাক্তার আকাশ ব্যভিচারী পুরুষ এবং তার স্ত্রী মিতুর বিরুদ্ধে ১০ কোটি টাকার একটি টর্ট মামলা করতে পারতো যেখানে হয়তো মিতু মামলার ভয়ে তার মোহরানার ৩৫ লক্ষ টাকার বিষয়ে একটা সুরাহায় আসত অথবা ডাক্তার আকাশ মোহরানার টাকা স্ত্রী মিতুর পক্ষ থেকে না-দাবীর শর্তে টর্ট মামলা তুলে নেবার বিষয়ে স্ত্রী মিতুর সাথে আপোষ করতে পারতো। এতে যারা যারা বলেছেন ডাক্তার আকাশ মোহরানার টাকা পরিশোধ করার ভয়ে মিতুকে তালাক দেননি তাদের জন্য একটা উত্তর পাওয়া যেত। তবে আমার কাছে ডাক্তার আকাশের আত্মহত্যা স্রেফ অন্ধকারাচ্ছন্ন মূর্খতা ছাড়া আর কিছুই নয়। জীবনের মূল্য কোনো কিছু দিয়েই হয়না।

রাষ্ট্রের মালিক জনগণ, জনগণ যেভাবে যেই পরিস্থিতিতে যেই অপকর্মকে প্রতিরোধ করার জন্য যেমন আইন চাইবে তা তারা বানাতে পারবে। বর্তমান এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আত্মহত্যার প্ররোচনা, পরকীয়া, ব্যভিচার, ব্যভিচারকারিনী মহিলার মোহরানা ইত্যাদি বিষয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।

লেখক: মানবাধিকার কর্মী