আমলী ক্ষমতা বনাম রিভিশনাল ক্ষমতা: হস্তক্ষেপ যোগ্যতা এবং কিছু প্রশ্ন

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৯ মার্চ, ২০১৯ ১২:০৪ অপরাহ্ণ

রাজীব কুমার দেব : 

আমাদের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় কনভেনশনালী একটি কথা প্রচলিত আছে – “Once cognizance taken – taken forever”. অধঃস্তন আদালতের অপরাধ আমলে গ্রহণের ক্ষমতা এবং এই ক্ষমতা হস্তান্তর যোগ্যতা বিষয়ে আইনি অস্তিত্ব প্রত্যেক্ষ করা যায় কার্যবিধির যথাক্রমে ১৯০ ও ৪৩৫ ধারায়। আর এই আমলী ক্ষমতা ও রিভিশনাল ক্ষমতা অনুশীলন করার একমাত্র ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিচারক হলেন যথাক্রমে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এবং দায়রা বা অতিরিক্ত দায়রা। অদ্যকার আলোচনাটি রিভিশনাল ক্ষমতা প্রয়োগ করে ম্যাজিস্ট্রেট এর আমল গ্রহণের ক্ষমতা হস্তক্ষেপযোগ্য কিনা এতদুদ্দযেই কিছু অমিমাংসিত বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার ক্ষুদ্র প্রয়াস।

অনেক সময় দেখা যায় মাননীয় রিভিশনাল আদালত ম্যাজিস্ট্রেট এর আমল গ্রহণের আদেশ বাতিল করে ম্যাজিস্ট্রেট কে Further investigation বা Further Inquiry এর নির্দেশ দিয়ে থাকেন এবং উক্ত আদেশ পেয়ে আমলী ম্যাজিস্ট্রেট Further Investigation বা Further Inquiry এর আদেশ দিয়ে থাকেন। একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি আরো স্পষ্ট করা যাক। একটি জি আর মামলায় আমলী ম্যাজিস্ট্রেট কয়েকজনের বিরুদ্ধে Cognizance এবং বাকিদের বিরুদ্ধে Discharge আদেশ দিলে অথবা আমলী ম্যাজিস্ট্রেট এজাহারকারির নারাজি দরখাস্ত নামঞ্জুর করে আমল গ্রহণ করলে এজাহারকারী ম্যাজিস্ট্রেট এর আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন করলে মাননীয় রিভিশনাল আদালত ম্যাজিস্ট্রেট এর আমল সংক্রান্ত আদেশ বাতিল করে further inquiry বা Further Investigation এর আদেশ দেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে মাননীয় রিভিশনাল আদালত ম্যাজিস্ট্রেট এর আমল সংক্রান্ত) আদেশ বাতিল করে further inquiry বা further investigation এর আদেশ দিতে পারেন কিনা। এই প্রশ্নে বিচার বিভাগের একজন সিনিয়র স্যার কোন একটি সামাজিক মাধ্যমে মত প্রকাশ করে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন – “Revisional Court cognizance নেয়ার নির্দেশও দিতে পারে না এবং এই আদেশ বাতিলও করতে পারে না..। ” আলোচনার সুবিধের জন্য সিনিয়ির স্যার এর মতামত টি তুলে ধরা হল –

“তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশীটের বিরুদ্ধে নারাজি দিলে অনেক সময়ই দেখা যায় তা Magistrate নামঞ্জুর করে তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশীটের ভিত্তিতে মামলাটি আমলে নিলে তার বিরুদ্ধে Revision করা হয়। Revisional Court Magistrate এর আদেশ বাতিল করে অনেক সময়ই Magistrate কে Further investigation বা Further inquiry এর নির্দেশ দেন। এখন প্রশ্ন হলো Revisional Court কি আমলে গ্রহনের আদেশও বাতিল করলেন? অনেকেই মনে করেন হ্যা, এবং আগের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে মামলাটি আর আমলে নেয়ার সুযোগ নাই। কেউ কেউ মনে করেন নতুন করে আমলে নিতে হবে এবং তার সুযোগ আছে। আসলে Revisional Court এর আদেশের অস্পষ্টতা বা তা অনুধাবনে ব্যার্থতাই এ ধরনের বিভ্রান্তির কারণ। একটি বিষয়তো মীমাংসিত যে, Cognizance এর আদেশের বিরুদ্ধে Revision চলে না। তাহলে Cognizance এর আদেশ বাতিল হয় কি করে? আসলে পক্ষগণ নারাজির আবেদন মঞ্জুর না হওয়ার জন্য Revision করে, Cognizance এর বিরুদ্ধে নয় এবং Revisional Court এর আদেশও নারাজি নামঞ্জুরের আদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা Cognizance পর্যন্ত যায় না। এমনকি further investigation এর প্রতিবেদনও পূর্বের চার্জশিট বা তার ভিত্তিতে প্রদত্ত Cognizance এর আদেশের হেরফের করতে পারে না। Cognizance এর বিরুদ্ধে শুধুমাত্র ৫৬১এ ধারায় হাইকোর্টের আশ্রয় নেয়া যায়। তাও সুপ্রিম কোর্ট অনেক ক্ষেত্রেই নিরুৎসাহিত করেন। ৪৩৯ বা ৪৩৯এ ধারায় Revisional Court এর Cognizance এর আদেশের বিরুদ্ধে কোন আদেশ প্রদানের এখতিয়ার নাই। তাই আমার বক্তব্য Revisional Court cognizance নেয়ার নির্দেশও দিতে পারে না এবং এই আদেশ বাতিলও করতে পারে না। Revisional Court এর নির্দেশ মোতাবেক Magistrate শুধু নারাজির ভিত্তিতেই তার কার্য সম্পন্ন করবে। Cognizance সম্পর্কিত তার পূর্বের আদেশের কোন হেরফের হবে না।”

এই মতামতের সমর্থণে সংশ্লিষ্ট আইন এবং মহামান্য উচ্চাদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে দেখলাম। সবার জানা আছে যে, কার্যবিধির ৪৩৫ ও ৪৩৯ (ক) ধারায় মাননীয় রিভিশনাল আদালত এর এখতিয়ার বিষয়ে দু’টি ক্ষমতার কথা বলা আছে আর ৪৩৬ ধারায় এই আদালতের further inquiry দেয়ার ক্ষমতা বলা আছে যাতে দু’টি ক্ষেত্রের কথা বলা হয়েছে। আর কার্যবিধির ৪(ট) ধারায় ইনকোয়ারী সম্পর্কে বলা আছে এবং 23 DLR 121 এ রেকর্ডকৃত একটি মামলায় উচ্চাদালত further inquiry কে “reconsideration of the evidence” নামে অভিহিত করেছেন। আর cognisance সম্পর্কে ১৯০ ধারা তো আছেই। উল্লেখ্য ৪৩৬ ধারা complaint case and FIR case উভয় মামলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। (8BLC 2003 HCD 459)।

তাহলে ৪৩৫ ও ৪৩৬ ধারা মতে যে ক্ষমতা মাননীয় রিভিশনাল আদালত কে দেওয়া হয়েছে সে ক্ষমতা অনুসারে মাননীয় আদালত further inquiry এর আদেশ দিতে পারেন। তবে further inquiry আদেশ প্রদানের সাথে অন্য কোন আদেশ দিতে পারে কিনা ৪৩৬ ধারা এই বিষয়ে নীরব থাকায় স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিতে হবে মাননীয় রিভিশনাল আদালত further inquiry এর সাথে অন্য কোন আদেশ দিতে পারেন না।

তাহলে একটি মামলায় যদি কগনিজেন্স ম্যাজিস্ট্রেট কতৃক cognizance নেয়া হয় এবং একই সাথে discharge দেয়া হয় এবং সংবাদদাতা ৪৩৫ ধারার আশ্রয় নিলে রিভিশনাল আদালত যদি ৪৩৬ ধারার ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে ম্যাজিস্ট্রেটের cognisance ও discharge আদেশ কি হবে – বাতিল হবে নাকি বহাল থাকবে? এ বিষয়ে বর্ণিত পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করার মত। এই পর্যবেক্ষণ অনুসারে মাননীয় রিভিশনাল আদালত cognizance নেয়ার নির্দেশও দিতে পারে না এবং এই আদেশ বাতিলও করতে পারে না। এই পর্যবেক্ষণের ১ম অংশের সমর্থন পাওয়া যায় উচ্চাদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে। যেমন – 53 CrLJ 1176, 18 DLR WP 39, 35 DLR 140, 48 DLR AD 53, 9 MLR 224, 1088 BLD 276, Law Guardian 2004 HCD 329, 9 BLD 1989 HCD 227.

কিন্তু বহু খোজাখুজিতে পর্যবেক্ষণের ২য় অংশের অর্থাৎ “… এই আদেশ বাতিলও করতে পারে না ” সরাসরি সমর্থনমূলক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায় নাই। তবে আইনের গভীরে না গেলে স্বাভাবিকভাবেই মনে হতে পারে যে, further inquiry আদেশ দেওয়ার সাথে সাথেই cognizance order vacate হয়ে যাবে। কিন্তু কার্যবিধির ৪৩৬ ধারা texual বা plain reading থেকে বুঝা যায় এই ধারার ক্ষমতা প্রয়োগের সাথে অন্য কোন ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেয়া হয়নি অর্থাৎ revisional court কে ইতমধ্যে প্রচারিত cognizance order বিষয়ে further আদেশ করার সুযোগ দেয়নি। যদি ৪৩৬ ধারা further inquiry এর সাথে অন্য কোন আদেশ প্রচারের সুযোগ না দেয় তাহলে ধরে নিতে হবে revisional court further enquiry আদেশের সাথে অন্য কোন আদেশ দিতে পারেন না। স্বাভাবিক কারণেই ধরে নিতে হবে পূর্বের cognizance order বলবত আছে। আর তাই কার্যবিধির ১৯০ ধারা, ৪৩৬ ধারা বিশ্লেষণে কিছু মৌলিক নীতি দাড় করানো যায়। যেমন – ক) Cognizance once taken – taken forever, খ) যেহেতু court of original একমাত্র আদালত যেটি cognizance power exercise করার ক্ষমতা রাখেন সেহেতু এই ক্ষমতা appellate court বা revisional court কারো দ্বারা interrupt করা যাবে না। এই প্রসংগে একটি মামলার reference উল্লেখ করা যায় 48 DLR 143 যেখানে মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগ বলেছেন ‘Sessions judge cannot take cognizance of s case against the accused sent up in the supplementary charge sheet without cognizance being taken by the magistrate.’ 58 DLR 193 যেখানে মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগ বলেছেন ‘A court of sessions has no power to take cognizance of any offence as a court of original jurisdiction…..”

বর্ণিত পর্যবেক্ষণের ২য় অংশের সমর্থণে কোন reference পাওয়া না গেলেও উচ্চাদালতের কিছু সিদ্ধান্ত পাওয়া যা ২য় অংশকে আকর্ষণ করে। যেমন – ১। 16 DLR 255 এ রেকর্ডকৃত একটি সিদ্ধান্তে মহামান্য হাই কোর্ট বলেছেন ” the previous order of the magistrate holding the enquiry under chapter XVIII of the code passed by the sessions judge in revision cannot in law, constitute a bar against the cognisance taken by the sub- divisional magistrate in the present instance.” ২। 37 DLR 167 এ রেকর্ডকৃত একটি সিদ্ধান্তে মহামান্য হাই কোর্ট বলেছেন “On fresh incriminating materials, the Metropolitan magistrate can take cognizance of an offence against a person earlier discharged. After discharge of the accused of the accused the same cannot be revived against the accused; but this is not a case of revival.” ৩। 37 DLR HCD 300 এ রেকর্ডকৃত একটি সিদ্ধান্তে মহামান্য হাই কোর্ট বলেছেন “Trying magistrate on the result of enquiry can alter the section of offence as given in the charge sheet by the police.” তবে further inquiry আদেশ হওয়ার সাথে সাথে discharge order কার্যকর থাকবে কিনা এ বিষয়ে ৪৩৬ ধারা তথা revisional court নীরব থাকেন। কিন্তু 43 DLR HCD 1991 এ রেকর্ডকৃত একটি সিদ্ধান্তে মহামান্য হাই কোর্ট বলেছেন “The sessions judge commits no illegality in setting aside the order of discharge of the accused passed by the magistrate” কার্যবিধির ৪৩৬ ধারার strict বিশ্লেষণ, cognizance এর উল্লিখিত মৌলিক নীতি এবং বর্ণিত সিদ্ধান্ত সমূহ বর্ণিত পর্যবেক্ষণের ২য় অংশকে সমর্থণ করে।

তবে যদি পর্যবেক্ষণের ২য় অংশ settled principle হিসেবে ধরে নিই অর্থাৎ যেহেতু রিভিশনাল আদালত cognizance order বাতিল করতে পারছেন না সেহেতু কিছু প্রশ্নের উদ্রেক করে। যেমন – ১। Revisional court যদি further inquiry এর আদেশ দেন তাহলে discharge order কি automatically vacate হয়ে যাবে? ২। যদি vacate হয় তাহলে তদন্তকালে পূর্বে discharge কৃত কোন অভিযুক্ত যদি পলাতক হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয় তাহলে তিনি কি কগনিজ্যান্স ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে তার বিরুদ্ধে কি WA ইস্যু করতে পারেন? ৩। সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কে কি formally ইনকোয়ারী প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে? ৪। সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কি সত্যতা পেলে কোন formal প্রতিবেদন দাখিল ছাড়াই পূর্বে discharge কৃতদের বিরুদ্ধে সরাসরি cognizance নিতে পারবেন? এক্ষেত্রে পূর্বের cognizance order এবং বর্তমানের cognizance order দুটি cognizance order মিলে কি মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ায় মেরিটে কোন আঘাত করবে? ৫। যদি formal প্রতিবেদন দাখিল ছাড়াই সরাসরি cognizance নিতে পারেন তাহলে যে সকল সাক্ষীদের পরীক্ষা করা হয়েছে সে সকল সাক্ষীদের বিচারিক পর্যায়ে কিভাবে ডাকা হবে কারণ তারা তো চার্জশীটেড / রিপোর্টেড সাক্ষী নন? ৬। ইনকোয়ারী অফিসার হিসেবে( যেহেতু তিনি কগ ম্যাজিস্ট্রেট) তিনি কি রাষ্ট্রপক্ষের মানীত সাক্ষী হতে পারবেন? ৭। সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট কি সত্যতা না পেলে কোন প্রতিবেদন ছাড়াই মামলা বিচারের জন্য প্রস্তুত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাননীয় সিজেএম স্যারের বরাবরে প্রেরণ করতে পারবেন? প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি এক কথায় দেয়া হয় ” অন্যান্য মামলার enquiry এর ক্ষেত্রে যেভাবে ম্যাজিস্ট্রেট যেভাবে অগ্রসর হন এই ধরণের মামলায়ও সেভাবে অগ্রসর হবেন” এই উত্তর যথার্থ হবে না বলে আমার কাছে মনে হয় কেননা এখানে ইনকোয়ারী ম্যাজিস্ট্রেট কে শুধুমাত্র discharge কৃত অভিযুক্ত দের বিষয়ে তদন্ত করতে হবে পুরো ঘটনা বিষয়ে নয়।

লেখক : জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, কক্সবাজার।