বড় হয়ে আইনজীবী হবেন- স্কুল জীবন থেকেই স্বপ্ন ছিল ডিএজি সাজুর

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৯ মার্চ, ২০১৯ ৮:০৫ অপরাহ্ণ

স্বাধীনতার পূর্বে যখন আমি সিলেটে পড়াশুনা করি। সে সময়ের সিরাজ মাস্টারের বেত্রাঘাতের কথা আজও মনে পড়ে। তারপর দেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পর মা-বাবার সাথে আমি মানিকগঞ্জ আসি। এইভাবেই গল্পের ছলে বাংলাদেশের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোঃ মোতাহার হোসেন সাজু ফিরে যান তার ফেলে আসা শৈশবে। আর বলতে শুরু করেন আপন শৈশব, কৈশোর পার করে আজকের এখানে কিন্তু কীভাবে? সেটা জানাতেই ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকমের বিশেষ প্রতিনিধি প্রিন্স মাহামুদ আজিমের মুখোমুখি নেওয়া বিশেষ এই সাক্ষাৎকারের ‘প্রথম পর্ব’ তুলে ধরা হল ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকমের পাঠকদের জন্য।

ল’ইয়ার্স ক্লাব : ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকমের আজকের এই বিশেষ পর্বে আপনাকে স্বাগতম।

মোতাহার হোসেন : ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকম ও এর অগনিত পাঠকদের প্রতি রইলো শুভ কামনা।

ল’ইয়ার্স ক্লাব : প্রথমেই আপনার শৈশব, কৈশোর পার করে ধাপে ধাপে এগিয়ে এসেছেন আজকের এই আইন পেশায়। এর পেছনে নিশ্চয় কারো অনুপ্রেরণা রয়েছে, রয়েছে প্রতিটি ধাপে ধাপে জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসার গল্প। আইন পেশাকে ক্যারিয়ার হিসেবে বেছে নেয়ার গল্প। আজকের এই বিশেষ সাক্ষাৎকারে আমরা সেই সকল বিষয় সমূহ প্রথমেই আপনার কাছ থেকে জানতে চাই।

মোতাহার হোসেন : মাত্র দুইদিন আগে রবিবার (১৭ মার্চ) বঙ্গবন্ধুর নিরানব্বইতম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়। যার সারাটি জীবন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। নিপীড়িত মানুষের অধিকার আদায়ে সর্বদা তিনি ছিলেন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, শিশুদের বাসযোগ্য পৃথিবী সাজাতে। তাই সর্বপ্রথম বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান কে স্মরন করি বিনম্র শ্রদ্ধায়।

স্বাধীনতার পর মানিকগঞ্জে এসে স্কুলে ভর্তি হই। সে সময়ের কথা, তখন আমি অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি। একদিন শিক্ষক সবার উদ্দেশ্যে জানতে চাইলেন, বড় হয়ে আমরা কে কি হতে চাই? উক্ত শ্রেণীকক্ষে ১৫০ (দেড়শ) জন শিক্ষার্থী ছিলেন তাদের মাঝে এক মাত্র আমি বলেছি, আমি বড় হয়ে আইনজীবী হতে চাই। কেননা আইনজীবী হলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে যে বিচারপ্রার্থী অর্থের অভাবে সুবিচার পাচ্ছে না, তাঁকে বিনা পয়সায় সু-বিচার পাইয়ে দেওয়ারও সুযোগ রয়েছে। এই সকল চিন্তা ভাবনা থেকে আমার আইন পেশায় পদার্পণ। মায়ের অনুপ্রেরণায় আমি আইন পেশায় আছি। শুধুমাত্র আইন পেশাই নয় সর্বক্ষেত্রে আমার অনুপ্রেরণা হচ্ছেন আমার মা।

আইন পেশায় সকল ধরণের মানুষের সাথে মেশার সুযোগ রয়েছে। শৈশব থেকে শুরু করে আমি সবসময় থাকতাম স্বাধীনচেতা মনোভাব নিয়ে। আমি এখনও মনে করি মহান আল্লাহ্‌ তায়লা আমাকে দুনিয়াতে পাঠিয়েছে দুইটা জিনিস অর্জনের জন্য। প্রথমত, আমি চিন্তা করতাম কীভাবে কারো আজ্ঞাবহ না থেকে সৎ জীবন-যাপনের মাধ্যমে পরোপকার করা যায়? দ্বিতীয়ত, মানুষ মাত্রই মরণশীল। আমাকেও একদিন মরতে হবে। সেইদিন আমার সহকর্মী, বিচারক, আইনজীবী তথা সাধারণ মানুষরা যদি মনে করে, এই লোকটি সৎ ও নিষ্ঠাবান ছিল এবং সবসময় সাধারণ মানুষের বিপদে এগিয়ে এসেছেন। সেটাই হবে আমার সর্বোচ্চ সফলতা।

ল’ইয়ার্স ক্লাব : আপনি আপনার পেশায় দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে অনেক মামলা পরিচালনা করেছেন। তাঁর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য কিছু মামলা সম্পর্কে যদি বলতেন?

মোতাহার হোসেন : পেশাগত জীবনে সাধারণ মানুষের কল্যাণে বিনা পয়সায় অনেক মামলা পরিচালনা করেছি। জনস্বার্থেও অনেক মামলা পরিচালনা করেছি। এরমধ্যে বেশির ভাগ মামলাই সরকার পক্ষ থেকে পরিচালনা করি। বর্তমানে বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষার্থীদের যে সাঁজা দেওয়া হয়। সেটা নিষিদ্ধকরণের মামলায় আমি সরকার পক্ষে থেকেও মনে করেছি সেটা জনস্বার্থের মামলা। যদিও আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে একজন আবেদনকারী মামলাটি নিয়ে এসেছে। সাধারণ মানুষের ভোটে যেমন সরকার আসে। ঠিক তেমনি সাধারণ মানুষের চাহিদার সে জায়গাটা সেটা দৃষ্টিগোচর করার জন্য এটাকে আমি জনস্বার্থের মামলা হিসাবে নিয়েছি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ভুল বুঝাবুঝি কিংবা ছোটখাটো অপরাধের সাজা হিসাবে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি দেওয়া হয়। যা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মনে বিশালভাবে রেখাপাত করে এবং তাদের বহন ক্ষমতার থেকে বেশী বইপত্র বহন করতে বাধ্য করা হয়। এতে করে তারা শিক্ষামুখী না হয়ে উল্টো শিক্ষার ক্ষেত্রে হয়ে পড়ে অনাগ্রহী। এই ক্ষেত্রে উক্ত মামলায় আমি সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে বেশী আলোকপাত করি । এছাড়াও কোমলমতি শিশুরা বিড়ি কারখানা সহ নানাবিধ কারখানায় চাকুরি করে পেটের তাগিদে কিংবা মা-বাবার জন্য। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে তাদের উপর যে অমানবিক নির্যাতন করা হয় এটা নিয়েও মামলা হয়েছে। সেই মামলাও সাধারণ শ্রমিকদের পক্ষে যা যা করা উচিত আমি সেটাই করেছি। আমার পেশা জীবনে যেখানে বিরোধিতা করা প্রয়োজন সেখানে বিরোধিতা করেছি। আবার যেহেতু আমি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হিসাবে কাজ করছি। সেক্ষেত্রে সরকারের স্বার্থ যেখানে খুন্ন হচ্ছে সেখানে আমি আমি প্রচণ্ড বিরোধিতা করেছি। তবে সাধারণ মানুষের স্বার্থ সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়েছি। যেভাবে সরকারি সম্পত্তি বেহাত হচ্ছে সেরকম একটি মামলার ঘটনা, চট্টগ্রামে সরকারের তিন হাজার কোটি টাকার একটা সম্পত্তি বেহাত হওয়ার হাত থেকে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে উদ্ধার করতে পেরে আমি ব্যক্তিগতভাবে পরম শান্তি পেয়েছিলাম। কেননা রাষ্ট্রীয় প্রতিটা সম্পদের উপর আমাদের অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। সে দায়িত্ববোধের দৃষ্টিকোণে প্রতিটা রাষ্ট্রীয় সম্পদকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমার, আপনার, আমাদের সকলের। এছাড়াও গৃহকর্মীদের উপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমি মামলা পরিচালনা করেছি। বর্তমানে দেখবেন বিগত সাত-আট বছর আগের মতো গৃহকর্মীদের উপর নির্যাতনের ঘটনা অহরহ দেখা যায় না।

ল’ইয়ার্স ক্লাব : আমরা জানি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, জেল হত্যা মামলা সহ অনেক মামলাই আপনি পরিচালনা করেছেন সেসকল মামলার সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

মোতাহার হোসেন : ধন্যবাদ। তৎকালীন সময়ে ক্ষমতায় ছিলেন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। তাই  জাতীয় চার নেতার পরিবারের পক্ষ থেকে তৎকালীন সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছিলো জাতীয় চার নেতার জেল হত্যা মামলা পরিচালনায় ছয় জন আইনজীবীকে নিযুক্ত করার জন্য। তার মধ্যে ছিলেন অ্যাড.সাহারা খাতুন, অ্যাড. নুরুল ইসলাম সুজন, অ্যাড. শ ম রেজাউল করিম, অ্যাড. মোমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস সহ আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এটা আমার জীবনের সবচাইতে বড় প্রাপ্তি, আমি জাতীয় চার নেতার মামলা পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছি। তবে সে সময়টা দুঃখ ব্যথা প্রকাশের অনুভূতি ভাষা কিংবা লিখে প্রকাশ করা যাবে না।  যেমন একটা ঝড় আসলে অনেক আলামত খুঁজে পাওয়া যায় না কিন্তু তার পারিপার্শ্বিকতা থেকেই যায়। মামলাটির ক্ষেত্রেও সে সকল পারিপার্শ্বিকতা রয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু তৎকালীন সময়ে আদালত উক্ত পারিপার্শ্বিকতার  দিকে না তাকিয়ে, শুধুমাত্র হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর যারা জেলে ডুকেছিল তাদের বিরুদ্ধে কোন আলামত না পাওয়ায় খুনিরা আদালত থেকে খালাস পেয়ে যায়। পরবর্তীতে তাদেরকে যদিও মৃত্যুদন্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। মাঝখানে যে সময়টা সেটা তীব্র যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে হয়েছে আমাদের। অর্থাৎ যারা মুজিবভক্ত এবং জাতীয় চার নেতার প্রতি যাদের সম্মানবোধ আছে তারা অনেক কষ্ট পেয়েছে।

চলবে…