স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অস্বীকার রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১০ এপ্রিল, ২০১৯ ১১:২৭ পূর্বাহ্ণ

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ :

আজ ১০ এপ্রিল- বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস! ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ মধ্য রাত শেষে অর্থাৎ ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, “ইহাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ হইতে বাংলাদেশ স্বাধীন। আমি বাংলাদেশের জনগণকে আহ্বান জানাইতেছি যে, যে যেখানে আছ, যাহার যাহা কিছু আছে, তাই নিয়ে রুখে দাঁড়াও, সর্বশক্তি দিয়ে হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করো। পাকিস্তান দখলদার বাহিনীর শেষ সৈন্যটিকে বাংলার মাটি হইতে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাও।”

এই স্বাধীনতার ঘোষণাটি বাংলাদেশের সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিল হিসেবে সাংবিধানিকভাবে আমাদের সংবিধানের অন্তর্গত হয়েছে। নিঃসন্দেহে এই স্বাধীনতার ঘোষণা আমাদের জন্য একটি ঐতিহাসিক দলিল। এরপর, ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে মুজিবনগর সরকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক দলিল। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫০(১) অনুচ্ছেদ এবং চতুর্থ তফসিলে উল্লেখ করা হয়েছে যে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র বাংলাদেশের একটি ক্রান্তিকালীন অস্থায়ী বিধান হিসেবে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি এখন সম্পূর্ণ আকারে বাংলাদেশের সংবিধানে সংযুক্ত করা হয়েছে (পঞ্চম তফসিল)।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদ একটি মৌলিক কাঠামোরূপে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দান করেছে। এর ফলে ঘোষণাপত্রটি বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অসংশোধনযোগ্য বিধানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৯৭১ সালেই অনেক বিষয়ের নিষ্পত্তি করেছে। অনেক ঐতিহাসিক বিষয়ের অবতারণা করা হয়েছে এই ঘোষণাপত্রটিতে। তারপরও রাজনৈতিক কারণে অত্যন্ত ন্যক্কারজনকভাবে আমাদের ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়া হয়েছে। যেমন, গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি বিষয়ে মিথ্যা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এই সকল বিষয়ে ১৯৭১ সাল থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে আছে। আর তাই নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্কের অবতারণা করা দুরভিসন্ধিমূলক।

(ক) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৯৭১-এর গণহত্যার স্বীকৃতির প্রথম দালিলিক প্রমাণ
বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধকালে এক ভয়াবহ গণহত্যা সংঘটিত হয়। ২০১৭ সাল থেকে ২৫শে মার্চ তারিখে আমরা ১৯৭১-এ সংঘটিত গণহত্যা স্মরণে জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ পালন করে আসছি। আমরা এখন লড়াই করছি আমাদের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য। কিন্তু আমাদের সংবিধানের ঘোষণাপত্রে আমরা ১৯৭১-এর গণহত্যার স্বীকৃতির প্রথম দালিলিক প্রমাণ পাই। এই পবিত্র দলিলে প্রথমবারের মতো উল্লিখিত হয় যে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা অপরাধ তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সংঘটন করার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বাধ্য হই স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করতে এবং মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে।

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “… যেহেতু একটি বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনায় পাকিস্তানি কর্র্তৃপক্ষ, অন্যান্যের মধ্য, বাংলাদেশের বেসামরিক ও নিরস্ত্র জনগণের ওপর নজিরবিহীন নির্যাতন ও গণহত্যার অসংখ্য অপরাধ সংঘটন করিয়াছে এবং এখনো অনবরত করিয়া চলিতেছে,…”

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৯ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে “… যেহেতু পাকিস্তান সরকার একটি অন্যায় যুদ্ধ চাপাইয়া দিয়া, গণহত্যা করিয়া এবং অন্যান্য দমনমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিগণের পক্ষে একত্রিত হইয়া একটি সংবিধান প্রণয়ন এবং নিজেদের মধ্য একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব করিয়া তুলিয়াছে।…” তাহলে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি ১৯৭১-এ বাংলাদেশে পাকিস্তান কর্র্তৃক সংঘটিত গণহত্যার এক অকাট্য দালিলিক প্রমাণ।

(খ) স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার ঘোষক
বিএনপি দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর স্বাধীনতার ঘোষকের দাবিদার করা হয়েছে তাকে। কিন্তু এই দাবি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের দুটি জায়গাতে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা আছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই হলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “… যেহেতু এইরূপ বিশ্বাসঘাতকতামূলক আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সনের ২৬শে মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন এবং বাংলাদেশের মর্যাদা ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান,…”

স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ১৩ অনুচ্ছেদে আরও বলা হয়েছে“সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করিলাম এবং তদ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্র্তৃক ইতিপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করিলাম …” অতএব, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হলো এক ধরনের নোংরা রাজনীতির প্রয়াস। যেই স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ঘোষণাপত্র নিয়ে একটি মুক্তিযুদ্ধ আমরা করলাম, একটি রাষ্ট্রের জন্ম হলো, বিশ্বের বুকে একটি মানচিত্র আমরা পেলাম, সেই ঘোষণাপত্রের ইতিহাসকে যদি আমরা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করি তবে জাতি হিসেবে আমরা দেউলিয়াপনার চূড়ান্ত উদাহরণ স্থাপন করব।

(গ) বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি
রাজনৈতিক কারণে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি নিয়েও বিতর্ক তোলা হয়েছে। অথচ এই ঐতিহাসিক সত্যটিও কিন্তু স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে ১৯৭১ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠিত। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের ১৪ অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “এতদদ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতেছি যে, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন…” তাহলে এই যে বিএনপি দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর তাকে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দাবি করা হচ্ছে তা এক নির্জলা মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছুই নয়। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র যে সত্য ধারণ করে আছে তাকে অস্বীকার করার অর্থ কী?

উপসংহার : আজকের এই পবিত্র দিনে, যেই দিনটিকে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিবস হিসেবে পালন করে আসছি, আসুন আমরা ইতিহাস বিকৃতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করি। আমাদের রাষ্ট্র এক, মানচিত্র এক, পতাকা এক, তাহলে আমাদের ইতিহাস ভিন্ন হবে কেন? বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতার ওপর দাঁড়িয়ে আমরা যে মহান মুক্তিযুদ্ধ লড়েছি, যেই সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখছি, সেখানে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে অস্বীকার করা মানেই হলো সংবিধানকে লঙ্ঘন করা। আর বাংলাদেশ সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।

লেখক : বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক