সাফাই সাক্ষী সম্পর্কিত আলোচনা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই, ২০১৯ ৫:০৬ অপরাহ্ণ
ছগির আহমেদ টুটুল

ফৌজদারী কার্যবিধি অনুযায়ী কোন মামলা অনুসন্ধান বা আদালতে মামলা বিচারকালীন সময়ে অভিযুক্ত আসামীকে বা মামলার আসামীকে তার নিজ সম্পর্কে সাক্ষ্য অর্থাৎ আত্মপক্ষ সমর্থন করে যে সাক্ষ্য অথবা আসামী বা অভিযুক্তের পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করাকে সাফাই সাক্ষী বলা হয়। বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন ছগির আহমেদ টুটুল।

ফৌজদারী কার্যবিধির ধারা-৩৪০ এবং ধারা-৩৪২ নিয়ে কিছু বলতে চাই। এই ধারাগুলোকে আমরা সবসময় গুলিয়ে ফেলি। আজকে আমি ছোট ছোট আলোচানার মাধ্যমে দুটি ধারার মূল পার্থক্যগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করব।

৩৪০ ধারা অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীর সাক্ষ্য নেয়ার পর আসামী আত্নপক্ষ সমর্থনে নিজে সাক্ষ্য দেয়ার জন্য আদালতে আবেদন করবে। আসামীর আবেদনের ভিত্তিতে আদালত আসামীর সাফাই সাক্ষ্য নিবেন।

৩৪২ ধারা অনুযায়ী আদালত স্বপ্রণোদিত (suo motu) হয়ে আসামীর সাক্ষ্য নিবেন। এটা আদালতে দায়িত্ব। ৩৪২ ধারা অনুযায়ী সাফাই সাক্ষী দেয়ার জন্য আসামী আদালতে আবেদন করবে না। আদালত নিজে ৩৪২ ধারা অনুযায়ী আসামীর সাক্ষ্য নিবেন। ৩৪০ ধারার সাথে ৩৪২ ধারার কোন সম্পর্ক নেই। দুটি ধারাতে আলাদা কথা বলা হয়েছে। ৩৪০ ধারা অনুযায়ী সাফাই সাক্ষী নেয়া হলেও আদালত ৩৪২ ধারা অনুযায়ী স্বপ্রণোদিত (suo motu) হয়ে আসামীর সাক্ষ্য নিবেন।

মামলার সাক্ষ্য প্রমাণ শেষ হওয়ার পর আসামীকে ফৌজদারী কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। তারপর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানীর পর রায় প্রদান করতে হবে। উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, অভিযোগকারী পক্ষের সকল সাক্ষ্য প্রমাণ শেষ হওয়ার পর আসামীর বিরুদ্ধে যেসব সাক্ষ্য প্রমাণ এসেছে সে সম্পর্কে তার ব্যাখ্যা বা বক্তব্য আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে গ্রহণ করা বাধ্যকর। [32 BLD(HCD)113]

নোট: তবে ৩৪২ ধারায় জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে আসামীর বক্তব্য Evidence Act এর ৩ ধারা অনুযায়ী সাক্ষ্য (evidence) হিসেবে গণ্য হবে না। তবে তার বক্তব্য অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণের সঙ্গে বিবেচনা করা যাবে। ৩৪২ ধারা অনুযায়ী আসামীর বক্তব্য অন্যান্য সাক্ষ্য প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত কিনা তাও আদালত বিবেচনা করতে পারবে। [10 BCR(AD)203]

৩৪২ ধারা অনুযায়ী আদালত আসামীর বক্তব্য নেয়ার সময় সাক্ষীরা আসামীকে জড়িত করে যেসব বক্তব্য রেখেছে সেগুলো আসামীর নজরে আনতে হবে। সাক্ষীদের বক্তব্য আসামীর নজরে আনার প্রধান কারণ হল আসামী যেন তার অবস্থান সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যদি কোন সাক্ষী আসামীর নিকট হতে কোন আলামত উদ্ধারের বিষয়ে বক্তব্য রাখে তাহলে ঐ বক্তব্যটি আসামীর নিকট সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

নোট: আসামীকে জড়িত করে সাক্ষীদের বক্তব্য আদালত আসামীর নজরে আনবেন। তবে এক্ষেত্রে আদালতকে একটা বিষয় বিবেচনায় আনতে হবে।সেটা হল আদালতকে দেখতে হবে, আসামীকে জড়িত করে সাক্ষীর বক্তব্য আসামীর নজরে আনা না হলে আসামীর ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা আছে কিনা? যদি আসামীর ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা না থাকে তাহলে আদালত আসামীকে জড়িত করে সাক্ষীর বক্তব্য আসামীর নজরে না আনলেও সেটা আদালতের কোন fault হিসেবে বিবেচিত হবে না।

রায় ঘোষণার পূর্বে আদালত যদি দেখতে পায় ৩৪২ ধারায় আসামীকে জিজ্ঞাসাবাদে ত্রুটি (fault) রয়েছে তাহলে সঠিকভাবে আসামীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। এমনকি যদি আপীল আদালতেও এমন ভুল (fault) ধরা পড়ে সেক্ষেত্রে আসামীকে খালাস দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে মামলাটি বিচারিক আদালতে ফেরৎ দিয়ে সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের নির্দেশ দিতে হবে। [11 BLT(AD)92]

পরিশেষে বলা যায়, ৩৪০ ধারা অনুযায়ী আসামী আদালতে আবেদন করে সাফাই সাক্ষী দিবেন। আর ৩৪২ ধারা অনুযায়ী আদালত স্বপ্রণোদিত (suo motu) হয়ে আসামীর সাক্ষ্য নিবেন।

লেখক: সহকারী জজ, শরীয়তপুর।