‘নদী- এখন জীবন্ত সত্তা’

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০১৯ ১১:২৫ অপরাহ্ণ

ড. মাহবুবা নাসরীন

সুপ্রিয় পাঠক, মনে আছে নিশ্চয়ই এ বছর ৩০ জানুয়ারি বাংলাদেশের হাইকোর্ট একটি যুগান্তকারী রায় দিয়েছিলেন বাংলাদেশের নদ-নদী রক্ষায়। দেশবাসীর না থাকলেও ঢাকাবাসীর স্মরণে থাকার কথা। কারণ, ওই রায় তুরাগ নদকে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে ‘লিগ্যাল পারসন’ বা আইনি সত্তা ঘোষণা করা হয়। রায়টির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলো ১ জুলাই। কী আছে সেখানে? নদী-তীরবর্তী সভ্যতার অধিবাসীদের জন্য এটি অত্যন্ত সুখবর, গুরুত্বপূর্ণ- শুধু তুরাগ নয়, বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সব নদীকে ‘আইনি সত্তা’ ঘোষণা করা হয়েছে। এই রায় এসেছে একটি বেসরকারি সংস্থার তুরাগ নদ রক্ষার্থে মামলা করার পরিপ্রেক্ষিতে।

নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশ মর্যাদা দিয়েছিল। তার মধ্যে বেশি আলোড়ন তুলেছিল নিউজিল্যান্ডের মাউরি আদিবাসীদের ১৪০ বছরের আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালে নদীর জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। মাউরি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাসমতে, তাদের পূর্ব পুরুষ বা নারী হচ্ছে দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম নদী হোয়াঙ্গানুই। মাউরি আদিবাসী ও নিউজিল্যান্ডের সরকারের মধ্যে এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি দেশটির আইন সভায় বিল হিসেবে পাস হয়। নিউজিল্যান্ডের এই উদ্যোগ অন্যান্য দেশকেও উদ্বুদ্ধ করে। তারই ধারাবাহিকতার এক সপ্তাহ পর ভারতের উত্তরখণ্ড হাইকোর্ট গঙ্গা ও যমুনা নদীকে আইনি সত্তা ঘোষণা করে। এমনকি নদী দুটি ও তার শাখা-উপশাখাকে রক্ষা করার জন্য প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে ঠিক করেছে জবাবদিহিমূলক মাতা-পিতা। অবশ্য কলম্বিয়া দাবি করেছে যে, সে দেশটি আরও আগেই অর্থাৎ ২০১৫ সালে একটি নাগরিক সংগঠনের দায়ের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের নভেম্বরে নদীকে মানব মর্যাদা দেওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছিল। অবশ্য আদালতে এ বিষয়ে জুরিদের ঐকমত্য না থাকায় বিষয়টি সেভাবে প্রচার পায়নি।

বাংলাদেশে পরিবেশবাদী আন্দোলন নদীকে রক্ষা করার বিষয়ে সোচ্চার হলেও জীবন্ত সত্তা হিসেবে বাংলাদেশের সব নদীকে আদালত কর্তৃক আইনি ব্যক্তি ঘোষণা একটি মাইলফলক। তুরাগ নদকে ঘিরেই যেহেতু মামলাটি হয়েছে, তাই এ সম্পর্কে কিছু বলার প্রয়াস।

ঢাকার চারপাশ ঘিরে রয়েছে তিনটি নদী : দক্ষিণ-পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা, উত্তর-পশ্চিমে তুরাগ আর উত্তর-পূর্বে বালু। এই তিন নদীই ঢাকা জেলার গৃহস্থালি, শিল্প, কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্রে। নদীগুলোর কারণেই গড়ে উঠেছে নানা শিল্প-কারখানা। দেশের শতকরা ৮০ ভাগ তৈরি পোশাক কারখানা এই নদীগুলো থেকেই পেয়েছে তাদের প্রাণ। আবার এই নদীর পানি ক্রমাগত দূষিত হয়েছে নানা ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক শিল্পবর্জ্য দ্বারা। তৈরি পোশাক শিল্প অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলেছে স্বল্প আয়ের মানুষকে। তবে তাদের আবাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠছে শহরাঞ্চলের নিম্ন আয়ের আরও অনেক মানুষের সঙ্গে। সুপেয় পানিতে প্রবেশাধিকার নেই বলে তারা নদীর পানিকেই ব্যবহার করে দৈনন্দিন নানা কাজে। রাসায়নিক ও অন্যান্য বর্জ্য দ্বারা দূষিত হলেও তুরাগ নদ স্বল্প আয়ের মানুষ দ্বারা বেশি ব্যবহূত হয়েছে। ঢাকায় পর্যাপ্ত পানির অভাবে স্বল্প আয়ের মানুষ দূষিত নদীর পানি ব্যবহার করছে রান্না, গোসল ও অন্যান্য প্রয়োজনে। ঢাকা শহরের মাত্র অর্ধেক জনগোষ্ঠী নিরাপদ পানি ব্যবহার করতে পারে আর বাকি অর্ধেকের নির্ভর করতে হয় নদী বা অন্যান্য সনাতনী পানি যেমন- নদী বা পুকুরের ওপর।

২০০৯ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর তুরাগ নদকে ‘পরিবেশগত সংকটময় এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। কারণ বিভিন্ন গবেষণায় তুরাগ নদের পানিকে পানীয়, গৃহস্থালি, প্রজাপতির ব্যবহার অযোগ্য বিবেচনা করা হয়েছে। সেই তুরাগ নদের দূষিত পানির সঙ্গে নারী-পুরুষের দৈনন্দিন মিথস্ট্ক্রিয়াকে নিয়ে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার এক শিক্ষার্থী এমফিল করার সুবাদে তুরাগ নদের দূষিত কালো জলরাশির এখনও নানাবিধ ব্যবহার হচ্ছে দেখে কষ্ট পেয়েছে। বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোকে রক্ষা করার আন্দোলনে অবশ্য আরও আগেই যুক্ত হয়েছি। আর আমরা তার ফলাফলে কিছু পদক্ষেপ দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছি।

বাংলাদেশ হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছে- ‘তুরাগ নদের পরিস্কার টলটল পানি, নৌ-চলাচল, পানির নাব্য, নদীর উপরিস্থিত বাতাস, তুরাগ নদের অপরূপ সৌন্দর্য, নান্দনিক সৌন্দর্য (ঝপবহরপ নবধঁঃু), মাছের স্বাভাবিক চলাচল, তুরাগ নদের দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ সবকিছুই মূল্যবান- যা সংবিধান, বিধিবদ্ধ আইন এবং পাবলিক ট্রাস্ট মতবাদ দ্বারা সংরক্ষিত। তুরাগ নদসহ বাংলাদেশের ৪০৫ নদীই মূল্যবান এবং একইভাবে সংবিধান, বিধিবদ্ধ আইন এবং পাবলিক ট্রাস্ট মতবাদ দ্বারা সংরক্ষিত।’ ‘নদীগুলোকে জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণার আইনগত অভিভাবক করা হয় ‘নদী রক্ষা কমিশন’কে, যা সব নদীর উন্নয়নে যাবতীয় দায়িত্ব পালনে বাধ্য থাকবে। পাশাপাশি নদ-নদী সংশ্নিষ্ট সব সংস্থা, অধিদপ্তর এবং মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় সব নদীকে দূষণ ও দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক চলাচলের উপযোগী করার ব্যাপারে দায়িত্ব পালনে বাধ্য থাকবে।

আশা করতে ইচ্ছা করে যে, রায়ব্যাপী ১৭টি আদেশ ও নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন করা হবে এবং আমাদের মনোরম, জীবনরক্ষাকারী, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী নদীগুলো অবৈধ দখলদার ও দূষণের হাত থেকে মুক্তি পাবে। রায়ের অনুলিপি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণের জন্য সরাসরি পাঠানো হয়েছে। আশা তাই হয়তো একটু বেশি বেশিই। আমরা, জনগণরা স্বপ্ন দেখি যুগান্তকারী এই রায় বাস্তবায়ন হবে, নদী ফিরে পাবে তার প্রকৃত স্বরূপ, নৌপথ হয়ে উঠবে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। নদ-নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা, নদী খনন ও টেকসই উন্নয়ন বা সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে মিল রেখে নিতে হবে অন্যান্য কার্যকর ব্যবস্থা। আর এসব কার্যাবলি সম্পাদন করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে। আমরা চেয়েছিলাম নদী রক্ষায় কঠোর আইন পেয়েছি। এখন?

প্রত্যাশা-শিল্প-কারখানা ও পয়ঃবর্জ্য আর নদীতে পড়বে না; ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমে যাবে আর ক্রমবর্ধমান জনগণ ভূ-উপরিস্থ স্বচ্ছ পানি ব্যবহারে অভ্যস্ত হবে। নদী ভরাট বন্ধে সর্বদা তৎপর থাকা ও তুরাগসহ অন্যান্য যেসব নদী ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে গেছে, অচিরেই সেগুলো পরিশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নদীর পানি অপসারণ রোধ করে নদীর পানি যেন সাগরে স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। নদী তো সাগরে মিশে যেতে চাইবেই; বাধা পেলেই প্লাবিত হবে দুকূল বা ভেঙে যাবে তার তীর। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দখলকারী ও দূষণকারীদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ ও জরিমানা আদায় ও আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, যা দৃষ্টান্তমূলকও হতে হবে। এরই মধ্যে বুড়িগঙ্গা নদীর আগের রূপ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারি পদক্ষেপ ও ঢাকার চারপাশে সার্কুলার নৌপথ চালু করে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন সহজতর করার সরকারি উদ্যোগ প্রশংসনীয়। দেশের জনগণেরও নদী সংরক্ষণ, রক্ষায় নিতে হবে উদ্যমী ভূমিকা।

জনগণই হচ্ছে সরকারের শক্তিশালী সঙ্গী। সবাই চাইবে নির্মল বাতাসে নদীতীরে ভ্রমণ করার আনন্দ উপভোগের। স্বপ্ন দেখি নদীকে ঘিরে আবারও রচিত হবে বাংলার যত অমর সৃষ্টি।

লেখক- অধ্যাপক ও পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।