নদী সুরক্ষা : তুরাগের আইনি সত্তা এবং তিন আবহমান শঙ্কা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৪:৫০ অপরাহ্ণ
রিভারাইন পিপল এর মহাসচিব শেখ রোকন

শেখ রোকন:

দখল ও দূষণ ঠেলে রাজধানীর পাশ দিয়ে কায়ক্লেশে বয়ে যাওয়া তুরাগ নদকে বুধবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে ‘লিগ্যাল পার্সন’ বা আইনি সত্তা ঘোষণা করার বিষয়টি নানা অর্থেই ঐতিহাসিক। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নদী, পানি ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীদের নাতিদীর্ঘ দিনের দাবিটি পূরণ হলো। আশা করা অমূলক হবে না যে, নদী সুরক্ষায় বুধবারের এই রায় তৈরি করবে আরেকটি মাইলফলক। কিন্তু রায় পাওয়া যত সহজ, বাস্তবায়ন যে ততটাই কঠিন- এই সত্য বাংলাদেশের নদী ও পরিবেশ কর্মীদের চেয়ে কে বেশি জানে! এই রায়ের বাস্তবায়ন কীভাবে ও কোন গতিতে হয়, সে জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তার আগে এখনই বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে। তবে সবকিছুর আগে নজর দেওয়া যেতে পারে প্রেক্ষাপটের দিকে।

অনেকেই নিশ্চয় জানেন, নদ-নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ হিসেবে আইনি বৈধতা দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ। এই ধারা শুরু হয়েছিল নিউজিল্যান্ডে। সেখানকার মাউরি আদিবাসীদের লোকায়ত বিশ্বাসমতে, তাদের জন্ম হোয়াঙ্গানুই নদী থেকে। সেই হিসেবে দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম এই নদী তাদের পূর্বপুরুষ বা নারী। ফলে নদীটির ব্যক্তিসত্তার দাবি তুলে আসছিল কয়েক শতাব্দী ধরে। অন্তত ১৪০ বছরের আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালের মার্চে তাদের দাবি পূরণ হয়। আদিবাসী ওই গোষ্ঠী এবং নিউজিল্যান্ড সরকারের মধ্যে সম্পাদিত এ সংক্রান্ত একটি চুক্তি দেশটির আইনসভায় বিল হিসেবে পাস হয়।

নদ-নদীকে আইনি সত্তা দেওয়ার এই উদ্যোগ শুধু বিশ্বজুড়ে সাড়াই ফেলেনি; একই পদক্ষেপ অন্যান্য দেশে নানা নদী নিয়ে গ্রহণের দাবিও উঠতে থাকে। মাত্র সপ্তাহখানেকের মাথায় ভারতের উত্তরাখণ্ড হাইকোর্ট গঙ্গা ও যমুনা নদীকে ‘আইনি সত্তা’ ঘোষণা করেন। ওই রায়ে ভারতের ‘নমামি গঙ্গা’ প্রকল্পের পরিচালক, উত্তরাখণ্ড রাজ্য প্রশাসনের মুখ্য সচিব এবং রাজ্যের প্রধান আইন কমকর্তাকে নদী দুটির ‘মানব মুখ’ নির্ধারণ করে দিয়ে বলা হয়- দুই নদী রক্ষায় এই তিনজন হবেন ‘মাতা-পিতা’। দুই নদী ও সেগুলোর উপনদীগুলোর অসুখ-বিসুখে তাদেরই জবাবদিহি করতে হবে।

নিউজিল্যান্ড ও ভারতে নদীকে মানব-মর্যাদা দেওয়া নিয়ে হৈচৈয়ের মধ্যেই জানা যায়, কলাম্বিয়ার সাংবিধানিক আদালত আরও আগেই সেখানকার আত্রাতো নদীকে ‘সুরক্ষা, সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরুদ্ধার’-এর অধিকার দিয়েছেন। ২০১৫ সালের গোড়ায় একটি নাগরিক সংগঠনের দায়ের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের নভেম্বর এই রায় এসেছিল। একটি নদীকে এ ধরনের অধিকার দেওয়া নিয়ে সাংবিধানিক আদালতের জুরিদের মধ্যেই মতবিরোধ ছিল বলে, বিষয়টি সেভাবে প্রচার করা হয়নি। কিন্তু নিউজিল্যান্ড ও ভারতের নজির স্থাপনের পর গত বছর মে মাসে বিষয়টি সামনে চলে আসে।

নিউজিল্যান্ড ও ভারতে নজির স্থাপিত হওয়ার পর বাংলাদেশেও একই ধরনের দাবি তুলতে থাকে নদী ও পরিবেশ বিষয়ক সংগঠনগুলো। আমার মনে আছে, গত বছরের প্রথম দিন রিভারাইন পিপলের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ‘নোঙর’ এ বিষয়ে একটি ‘ভাসমান সেমিনার’-এর আয়োজন করেছিল। বিআইডব্লিউটিএর একটি জরিপ জাহাজে করে বুড়িগঙ্গা থেকে শীতলক্ষ্যা, ধলেশ্বরীর মোহনা পর্যন্ত ভেসে ভেসে এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন অংশগ্রহণকারীরা। আমারও সুযোগ হয়েছিল ওই আলোচনায় অংশ নেওয়ার। যতদূর মনে পড়ে, নোঙরের পক্ষে তার আগে এই দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। নদীকে জীবন্ত সত্তা হিসেবে ঘোষণার দাবিতে তারা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে স্মারকলিপিও প্রদান করেছিলেন খুব সম্ভবত।

তুরাগ নদ নিয়ে যে রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বুধবার তুরাগ নদকে আইনি সত্তা দিয়েছেন, সেই রিটের পক্ষের আইনজীবী মনজিল মোরসেদও নোঙর আয়োজিত ভাসমান সেমিনারে আলোচক ছিলেন; আমার মনে আছে। মনে আছে, চ্যানেল আইয়ের পরিশ্রমী প্রতিবেদক ও নদীকর্মী জাহিদুজ্জামান নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার পক্ষে বেশ কয়েকটি প্রতিবেদন তৈরি ও সম্প্রচার করেছিলেন। অনেকের সঙ্গে আমারও বক্তব্য ধারণ করেছিলেন তিনি। রায়টি ঘোষণার পর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে তিনি জানিয়েছেন, ভারতের আদালতের রায়ের পর কীভাবে প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু তাকে এ বিষয়ে কাজ করতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন।

সর্বশেষ তুরাগ নদকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার রায় এমন সময় এলো, যখন পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় ঠিক এ দাবিতেই চলছে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন। তারা শ্নাঘা বোধ করতে পারেন যে, সম্মেলন শেষ হতে না হতেই ‘নগদ’ ফল মিলল! বস্তুত আদালতের এই রায় বাংলাদেশের সব নদী ও পরিবেশকর্মীদের জন্যই একটি বিজয়। নিশ্চয় যারা গোড়া থেকে এই দাবি তুলেছেন, এর সপক্ষে জনমত গঠন করতে চেয়েছেন, আদালতে রিট আবেদন করেছেন; তারা বোধ করতে পারেন বাড়তি গৌরব।

রিভারাইন পিপল থেকে আমরা বরাবরই নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার দাবির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে এসেছি। আমরা বলেছি, এর মধ্য দিয়ে নদীর সপক্ষে একটি জোরালো আইনি হাতিয়ার পাওয়া যাবে। নদী যদি জীবন্ত সত্তা হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তাহলে নদী হতাহতের দায়ে ফৌজদারি মামলা করার পথও খুলে যেতে পারে।

নদ-নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার দাবির নেপথ্যের সাংগঠনিক তৎপরতা এবং সম্মুখের সম্ভাবনাকে সাধুবাদ জানিয়েও যে প্রশ্ন তোলা অসঙ্গত হতে পারে না, তা হচ্ছে- এর পর কী? প্রথম কথা হচ্ছে, এই রায় আংশিক। রায়ের বাকি অংশ রোববার পাওয়ার কথা। তারও পরে পাওয়া যাবে পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি। বিষয়টি তখন আরও স্পষ্ট হবে। রিটকারী আইনজীবীর কাছ থেকে সংবাদমাধ্যম সূত্রে আমরা জেনেছি, শুধু তুরাগ নয়; দেশে প্রবাহিত আরও ৪৫০টি নদ-নদীর ক্ষেত্রে একই ঘোষণা প্রযোজ্য হবে। একটি নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করা এবং তা রক্ষায় আইনি সুরক্ষা দেওয়া এক রকম; আর যদি দেশের সব নদীই এর আওতায় আসে, তাহলে বিষয়টির ব্যাপ্তি ও তাৎপর্য আরেক রকম। এছাড়া আদালত যদিও তুরাগকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছেন, তা নির্দেশনা বা পর্যবেক্ষণ, পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে না আসা পর্যন্ত পুরোপুরি বোঝা যাবে না। পুরো চিত্র পাওয়ার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতেই হবে।

দ্বিতীয়ত, এর আগে যে তিনটি নজির আমাদের সামনে রয়েছে, তার মধ্যে একটি শুধু আদালতের রায়-সংশ্নিষ্ট। নিউজিল্যান্ড ও কলাম্বিয়ায় এ পদক্ষেপ নিয়েছে সেখানকার আইনসভা-সংশ্নিষ্ট পক্ষগুলো। শুধু ভারতে রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। মার্চের ওই রায় জুলাই মাসেই স্থগিত করেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। হাইকোর্টের রায়ের বিপক্ষে যে যুক্তি সুপ্রিম কোর্টের সামনে তুলে ধরা হয়েছিল, তাতে বলা হয়- গঙ্গা ও যমুনা শুধু এক রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অনেক সরকারি-বেসরকারি পক্ষও। এমনকি শতকোটি নাগরিকের একটি দেশের প্রধান নদীতে গৃহস্থালি দূষণও কম নয়।

বাংলাদেশের হাইকোর্টে পাওয়া বুধবারের রায় যদি দেশের সাড়ে চারশ’ নদীর জন্যই প্রযোজ্য হয়, তাহলে আন্তঃসীমান্ত বা ভারত-বাংলাদেশ অভিন্ন নদীগুলোর ক্ষেত্রে কী হবে? শুধু তুরাগ হলেও কথা আছে। তুরাগ যদিও দৈর্ঘ্যে ছোট নদী, এটি পানি পায় চূড়ান্ত অর্থে যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র থেকে। সেগুলো তো আন্তঃরাষ্ট্রীয় নদী। ফলে এই রিট আবেদনের নিষ্পত্তি সুপ্রিম কোর্টে গেলে কী দাঁড়াবে; এখনই বলা যাচ্ছে না। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণার প্রশ্নে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের উদাহরণ সামনে রাখলেও রাখতে পারেন।

তৃতীয় যে বিষয়টি বিবেচ্য তা হচ্ছে, এর আগের উদাহরণ ও নজিরগুলো। আমি প্রায়শ আলাপ-আলোচনায় বলে থাকি- বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বিশ্বের মধ্যে ‘সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব’। নদী ও পরিবেশের পক্ষে এত রায় ও নির্দেশনা আর কোনো দেশের উচ্চ আদালত থেকে পাওয়া যায়নি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যেখানে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মতো পরিবেশ-প্রতিবেশবিরোধী তৎপরতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন; আমাদের সুপ্রিম কোর্ট যেখানে নদী, পানি, পরিবেশ নিয়ে একের পর এক মাইলফলক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। কিন্তু নদী ও পরিবেশের পক্ষে উচ্চ আদালতের এই ইতিবাচক অবস্থান বরাবরই আমলাতন্ত্রের সুকঠিন দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছে।

অন্য কোনো নদী নয়, খোদ তুরাগের কথাই ধরা যাক। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ছিল- তুরাগসহ ঢাকার চারপাশের নদ-নদীগুলোর সীমানা চিহ্নিত করতে হবে। সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে নদীর খাত, প্লাবন ভূমি, সীমান নির্দেশ করা ছিল। কিন্তু জেলা প্রশাসকরা যখন সেই সীমানা খুঁটি বসাতে গেছেন, তখন নদীর সীমানার ভেতরে বসিয়েছেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দখল উচ্ছেদ হওয়ার বদলে উৎসাহিত হয়েছে। জীবন্ত সত্তা ঘোষণা এবং সে অনুযায়ী তুরাগের ‘অধিকার’ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কী দাঁড়াবে, তা ভাবতে গিয়ে এসব ‘আবহমান’ শঙ্কাই মনে জাগছে আগে।

লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক; মহাসচিব, রিভারাইন পিপল; ই-মেইল: skrokon@gmail.com