মন্ত্রী হিসেবে বাড়তি কোনো সুবিধা নিইনি: সাক্ষাৎকারে সাবেক আইনমন্ত্রী

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ৭:৫৪ অপরাহ্ণ
ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ

ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। খ্যাতিমান আইনজীবী ও বাংলাদেশ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী। তাঁর জীবনের গল্প শুনেছেন এম বদি-উজ-জামান।

কেমন আছেন?

ভালো আছি। যদিও ৮৩ বছর বয়স হয়ে গেছে। বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। হার্টের অপারেশন সফলভাবেই হয়েছে। নিয়মিত চেক আপ করাতে হয়। ভেবেছিলাম, অপারেশনের পর হয়তো আর আদালতে যেতে পারব না। কিন্তু তা হয়নি। নিয়মিতই সুপ্রিম কোর্টে যাচ্ছি।

শিশুকাল কেমন ছিল?

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে ১৯৩৭ সালের ১৬ জুলাই এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আমার জন্ম। বাবা মৌলভী তালেব আলী ও মা বেগম ইয়াকুবুন্নেসা। বাবার অনেক জমি ছিল। প্রায় আড়াই বিঘা জমির ওপর গ্রামে একটি আর দুই বিঘার ওপর কুমিল্লা শহরের বাগিচাগাঁওয়ে একটি বাড়ি করেছিলেন বাবা। আমরা চার ভাই। আমি সবার ছোট। বড় ভাই মমতাজ আহমেদ ব্যাংকার ছিলেন। মেজো ভাই আশরাফউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ডাক্তার। সেজোভাই নওয়াব আহমেদ ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের সব ভাইয়ের পড়াশোনা শুরু গ্রামে। শিবপুর প্রাইমারি স্কুলে পড়েছি। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকার সময় একটা বৃত্তি পরীক্ষা হতো। সময়টা ১৯৪৭ সাল। তখন থানা সদর ছিল বুড়িচং। রেলস্টেশনে এসে শুনি, দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। অর্থাৎ ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা দেশ হয়েছে। বৃত্তি পরীক্ষা হবে না। কী আর করা। মন খারাপ করে বাড়ি ফিরে গেলাম। পরে গ্রামের আরেকটি স্কুলে (শশীদল হাই স্কুল) পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়েছি। এরপর সব ভাই চলে আসি শহরে। আমি সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই কুমিল্লা জিলা স্কুলে। ১৯৫৩ সালে সেখান থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি পাস করি। এরপর চলে আসি ঢাকার পুরানা পল্টনে, বড় ভাইয়ের বাসায়। ভর্তি হই ঢাকা কলেজে।

ছোটবেলার বিশেষ স্মৃতি?

ছোটবেলায় খুব খেলাধুলা করেছি। ঘুড়ি ওড়ানো, গাছে ওঠা, পাখির বাচ্চা ধরা—এসবও করেছি। তবে রোদে ঘোরাঘুরি করা বারণ ছিল। কুমিল্লা জিলা স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালে প্রতিদিন ভাষা আন্দোলনের শোভাযাত্রায় যোগ দিতাম। রোল নম্বর এক হওয়ায় ছিলাম ক্লাস ক্যাপ্টেন। মনে রাখতে হবে, আমরা তখন যা কিছু করি না কেন, লেখাপড়াই ছিল আসল কাজ। তা ছাড়া আমার নিজেরও পড়ালেখার প্রতি একটু বেশি ঝোঁক ছিল। অভিভাবক ছিলেন বড় ভাই। তাঁর কথা ছিল, ‘দিনে যা করো না কেন, সন্ধ্যার আগেই বাসায় ঢুকতে হবে।’ ঢাকায় এসে পল্টন, সেগুনবাগিচায় থাকার সুবাদে স্থানীয় একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন (পল্টন সমাজ সাংস্কৃতিক সংঘ) গড়ে তুলি।

এ সময় বঙ্গবন্ধুর পথ আটকিয়েছিলেন…

দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। সেগুনবাগিচা হাই স্কুল ও কলেজ এবং পুরানা পল্টন গার্লস কলেজ। গার্লস কলেজটির বাড়ির মালিক ছিলেন মিসেস সুপ্রভা সেন। তিনি দেশ ছাড়ার আগে বাড়িটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলোসফির অধ্যাপক ড. জি. সি. (গোবিন্দ চন্দ্র) দেবকে দিয়ে যান কোনো একটা কাজে ব্যবহার করার জন্য। গোবিন্দ বাবু একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘শফিক, তুমি তো সেগুনবাগিচা হাই স্কুল করেছ। এবার এই বাড়িতে একটা কলেজ করো।’ কলেজের কাজ শুরু করে দিলাম। ১৯৭১ সালে কিছুটা অসুবিধা হলো। যা হোক, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জানতে পারলাম, বাড়িটি নাকি সিলেটের এক ভদ্রলোক কিনে নিয়েছেন। তিনি দখল নেবেন। একদিন কলেজের মেয়েদের নিয়ে ঠিক করলাম, বঙ্গবন্ধু যখন সচিবালয়ে (ইডেন ভবন) আসবেন, তখন তাঁকে বিষয়টি জানাতে হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগে থেকেই মেয়েদের নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। বঙ্গবন্ধু কাছে আসতেই মেয়েরা তাঁর গাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তিনি জানতে চাইলেন, ‘কী হয়েছে? তোরা কী চাস?’ আমি এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘বাড়িটি নাকি কে কিনে নিয়েছে। এখানে আর কলেজ থাকবে না।’ সব শুনে বঙ্গবন্ধু বলে দিলেন, ‘এখানে কলেজ থাকবে। বাড়ির ক্রেতাকে অন্য বাড়ি দেওয়া হবে।’ বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণার পর আর কেউ কলেজ উচ্ছেদ করার সাহস পেল না। আমি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করার উৎসাহ পেয়েছিলাম ইস্টার্ন হাউজিংয়ের মালিক জহুরুল ইসলামের কাছ থেকে। তিনি খুবই ধনী ছিলেন। তাঁরই আর্থিক সহযোগিতায় সেগুনবাগিচা হাই স্কুল এবং পুরানা পল্টন গার্লস কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি।

ছাত্রজীবনে মেধার স্বীকৃতি?

ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় বৃত্তি পেতাম। কলেজে বেতন লাগত না। থাকতাম ভাইয়ের বাসায়। বিএ-তে প্রথম হওয়ায় বৃত্তি পাই। মাস্টার্সেও প্রথম হলাম। তখন আইয়ুব খান ঘোষণা দিয়েছিলেন, যারা প্রথম হয়েছে তারা এক হাজার টাকা পুরস্কার পাবে।

শুরুতে কেমন ছিল ঢাকার জীবন?

তখন ঢাকার জনসংখ্যা ছিল তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ। ঢাকা কলেজ ছিল ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশে। ফুলবাড়িয়া থেকে সোনারগাঁও হোটেলের পাশ হয়ে এফএইচ হলের পেছন দিয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত ট্রেন চলত।

বাবার ইচ্ছায়ই আইনজীবী হওয়া?

যেহেতু বড় ভাইদের মধ্যে একজন ব্যাংকার, একজন ডাক্তার, আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার, তাই বাবার ইচ্ছা, আমাকে আইনজীবী হতে হবে। এ কারণেই মানবিক বিভাগে পড়েছি। ১৯৫৫ সালে ইন্টারমিডিয়েটে স্ট্যান্ড করলাম। আইনজীবী হব বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম পলিটিক্যাল সায়েন্সে। কিন্তু পুরানা পল্টনে যেসব বন্ধুর সঙ্গে মিশতাম, তারা সবাই ভূগোলে পড়ে। কী করব বুঝতে পারছি না। বড় দুই ভাইও কিছু বলেন না। তাই কিছুদিন ক্লাস করার পর কাছের বন্ধুদের পরামর্শে ট্রান্সফার হয়ে ভূগোল বিষয়ে ভর্তি হলাম। অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম হলাম। এরপর ভর্তি হলাম ল-তে।

সরকারি চাকরি করেননি…

ল-তে পড়া অবস্থায় পাকিস্তান পাবলিক সার্ভিস কমিশনে ভূগোলের লেকচারার হিসেবে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম হলাম। আমার পোস্টিং হলো রাজশাহী কলেজে। এ বিষয়ে গেজেটও হয়ে গেল। আমি বললাম, ঢাকায় পোস্টিং হলে চাকরি করব; নয়তো করব না। আমার শর্তে তারা রাজি হলো না। আমার আর সরকারি চাকরি করা হলো না। এরপর ঠিক করলাম, লন্ডন যাব ব্যারিস্টারি পড়তে। ১৯৬৪ সালে লন্ডন চলে গিয়ে ভর্তি হলাম লিংকনস্-ইন-এ। কিছুদিন পর সেখানে আমি আর মো. তাফাজ্জাল ইসলাম (পরবর্তীকালে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি) কলেজের কাছেই একটি বড় রুম ভাড়া নিলাম। সেখানেই রান্নাবান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। আমাদের প্রতি সপ্তাহে খরচ হতো তিন থেকে সাড়ে তিন পাউন্ড।

পড়তে পড়তে শিক্ষকতাও করেছেন?

কিছুদিন পর স্থানীয় ব্যাকেট কলেজে (লন্ডন) ভূগোলের শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞাপন চোখে পড়ল। ইন্টারভিউ দিয়ে পাস করলাম। কিন্তু আমাকে নেওয়ার আগে তারা বলল, ‘ভুগোলে এত ভালো রেজাল্ট করা ব্যক্তিরা তো উচ্চ বেতনে চাকরি করে! যা হোক, তুমি পরীক্ষায় ভালো করেছ। কিন্তু তোমাকে একটি প্রদর্শনী ক্লাস করাতে হবে। শিক্ষার্থীদের বোঝাতে পারো কি না—সে জন্য।’ সেই কথা অনুযায়ী ক্লাস নিতে হলো। আমার ক্লাস করানো দেখে কলেজের প্রিন্সিপাল খুব খুশি। আমাকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। এভাবে পড়ালেখার (বার অ্যাট ল) পাশাপাশি শিক্ষকতাও করেছি। বার অ্যাট লর প্রথম কোর্সটি ছিল তিন বছরের। আমি দুই বছরেই পাস করলাম। তখনো আমার হাতে এক বছর বাকি। এই এক বছর পার না হলে ‘কল টু দ্য বার’ হবে না। তিন বছর সম্পন্ন করার পর এলএলএম (মাস্টার্স) কোর্সে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাব। কী করব, ভাবছি। এরই মধ্যে তখন বাম রাজনীতিতে যুক্ত থাকা ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার (বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য) আমাকে একদিন বললেন, ‘দুই বছরের এলএলএম কোর্সে যে প্রশ্নে পরীক্ষা হবে, সেই প্রশ্নে এক বছরেই পরীক্ষা দিতে চান—এই বলে আপনি কিংস কলেজের ডিনের কাছে একটি আবেদন করুন।’ তাঁর পরামর্শ অনুযায়ী আবেদন করলাম। কর্তৃপক্ষ আমার আবেদন গ্রহণ করে পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দিল। আমি এই এক বছরের মধ্যে এলএলএম কোর্সের পরীক্ষা দিয়ে পাস করলাম। এভাবে অল্প সময়েই বার অ্যাট ল এবং এলএলএম পাস করে, ১৯৬৭ সালে দেশে ফিরে আসি।

দেশে ফিরে শুরুতে কী করেছেন?

ব্যারিস্টারি পড়ে দেশে ফিরে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টে আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করি। তখন হাইকোর্ট বিল্ডিংটি ছিল বর্তমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভবনে। এরই মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ডিন অধ্যাপক কে এ এ কামরুদ্দিন আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করার প্রস্তাব দিলেন। সেখানে তখন এলএলবি কোর্স ছিল সান্ধ্যকালীন। তাঁর কথামতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিলাম। এরই মধ্যে সিটি ল কলেজে শিক্ষকতার প্রস্তাব এলো। যোগ দিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, তখনকার প্রিন্সিপাল বছরে একটি ক্লাস নিয়ে বাকি সময় আর আসতেন না। আমাকেই কলেজটি পরিচালনা করতে হতো। এভাবেই ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত চালিয়ে গেলাম। ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল অনার্স কোর্স (ডে কোর্স) চালু হলো। এ কারণে সিটি ল কলেজের পুরো দায়িত্ব নিতে হলো। ২০০৫ সাল পর্যন্ত ঢাকা সিটি ল কলেজের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও অধ্যক্ষ ছিলাম। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য এবং পরীক্ষকও ছিলাম।

আইন পেশায় আপনার সিনিয়র কে ছিলেন?

দেশের প্রথম অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন এম এইচ খন্দকার। অত্যন্ত মেধাবী ও নৈতিক দিক থেকে দৃঢ় মনের মানুষ। সত্য প্রকাশে কাউকে পরোয়া করতেন না। বিচারকদেরকে যেটা বলার দরকার মনে করতেন, সরাসরি বলে দিতেন। তিনিই আমার সিনিয়র ছিলেন। ১৯৬৯ সাল থেকে আমি নিজেই আলাদা চেম্বার শুরু করলাম। সঙ্গে ছিলেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ আব্দুর রহিম। দুজন মিলেই পল্টনে চেম্বারটা করলাম। সেখানে ছিলাম ১৯৮২ সাল পর্যন্ত। পরে এখানে (ইন্দিরা রোড) বাড়ি করে চেম্বার নিয়ে আসি।

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আইনজীবী ছিলেন…

আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আমি একজন সেনা কর্মকর্তার (মেজর আলম) পক্ষে আইনজীবী ছিলাম। তখন আবদুস সোবহান সাহেবের জুনিয়র ছিলাম আমি। এই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় প্রধান আসামি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আপনার জীবনে কোনো আক্ষেপ আছে?

ওই যে দেশ স্বাধীন হয়ে গেল বলে বৃত্তি পরীক্ষা দিতে পারিনি, এর বাইরে তেমন কোনো আক্ষেপ নেই। সুপ্রিম কোর্ট বারে (আইনজীবী সমিতি) ইলেকশন করে প্রথমবারই ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়েছি। তারপর প্রেসিডেন্ট হলাম। বার কাউন্সিলের মেম্বার হলাম অনেকবার। ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে গণ-আদালত বসেছিল, সেখানে আমি গোলাম আযমের বিরুদ্ধে আইনজীবী ছিলাম। এ কারণে আমিসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা হলো। পরবর্তীকালে ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমদ যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আইন উপদেষ্টা, তিনিই একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘শফিক, তোমার মামলাটির খবর কী?’ বললাম, ‘চলছে।’ উনি বিস্ময় প্রকাশ করলেন। পিপিকে (পাবলিক প্রসিকিউটর) মামলা প্রত্যাহারের আবেদন দিতে বললেন। পরে মামলাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। তবে ওই মামলায় আগেই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ায় এক রাত বাসার বাইরে থাকতে হয়েছিল আমাকে। এরপর হাইকোর্টে হাজির হয়ে জামিন নিয়েছি।

শেখ হাসিনার আইনজীবী হওয়ার প্রেক্ষাপট…

সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর আমি মেয়ের কাছে (লন্ডন) বেড়াতে চলে যাই। সেখানে গিয়ে টিভিতে দেখলাম, দেশে শেখ হাসিনাকে (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরপর দেশে ফিরে এলাম। ওই সময় সুপ্রিম কোর্টে শেখ হাসিনার মামলা দেখতেন দুইজন আইনজীবী—ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম এবং ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসার পর তাঁরা গোয়েন্দাদের কারণে ব্রিফ (মামলা) ফিরিয়ে দিলেন। শেখ হাসিনার পক্ষে আর মামলা পরিচালনা করতে রাজি হলেন না। ওই সময় শুনলাম ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম কুষ্টিয়া থেকে এবং রোকনউদ্দিন মাহমুদ ধানমণ্ডি থেকে (এখন যে আসনে ব্যারিস্টার তাপস এমপি) সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করবেন। যা হোক, এ অবস্থায় আমি শেখ হাসিনার পক্ষে মামলা পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিই। তখন আমার সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস। এ ছাড়া রাজশাহী থেকে ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপুকে নিয়ে আসা হলো। নামকরা আইনজীবী তিনি। আমরা প্রতিদিন সংসদ ভবনের আদালতে যেতাম। শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ২০০৭ সালের জুলাই মাসে। এমন অবস্থায় সুপ্রিম কোর্ট বারের নির্বাচন এলো। ২০০৮ সালে ঘোষণা হলো ইলেকশন শিডিউল। একদিন আমাকে জিল্লুর রহমান সাহেব (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) আবারও বারের প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে বললেন। তিনি তখন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। কিন্তু সেই সময় আমার জুনিয়র ও ছাত্র মেজবাহ উদ্দিন প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে চেয়েছিল। অন্যদিকে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেনও চেয়েছিলেন এই পদে দাঁড়াতে। কিন্তু জিল্লুর রহমান পদটি আমাকে দিতে বললেন। মার্চ মাসে ইলেকশন এলো। ইলেকশনের দিন বাসা থেকে বের হব—এমন সময় ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম সাহেব ফোন করে বললেন, গুলশানে একটি বাসায় যেতে হবে। গিয়ে দেখি সেখানে এ এফ হাসান আরিফ, ফিদা এম কামাল, ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম এবং যাঁরা প্রার্থী, তাঁরা বসা। তারপর সেখানে এলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন। আমাকে বললেন, ‘আপনি শেখ হাসিনার মামলা পরিচালনা করছেন। তাই আপনাকে প্রার্থী হিসেবে ইলেকশন করতে হবে না।’ উত্তরে বললাম, ‘দেখুন, কারো মামলা লড়লে কেউ ইলেকশন করতে পারবে না—এমন কোনো আইন আমার জানা নেই।’ নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কথা উঠল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরই বারের নির্বাচন হওয়ার কথা জানালেন তিনি। আমি রাজি হলাম না। শেষ পর্যন্ত এক মাস পর ইলেকশন দিল। এর পরও তখনকার আইন উপদেষ্টা ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে ডেকে নিয়ে বারের নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করেছেন তাঁরা। কিন্তু ওই দুই আইনজীবী রাজি না হওয়ায় নির্বাচন হয়ে গেল। আমি পুরো প্যানেল নিয়ে পাস করলাম।

শেখ হাসিনার মুক্তির জন্য দুটি শর্ত দিয়েছিলেন…

জুন মাসে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন বাসায় ফোন করে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে আলাপ আছে। যদি একটু গুলশান অফিসে আসেন…।’ এইটুকু বলেই ফোনটি কেটে দিলেন। মিনিট পাঁচেক পর আবার ফোন করলেন। বললেন, ‘চাচা, আমাকে আপনার তুমি করে বলতে হবে।’ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন ছিলেন ব্যারিস্টার এ টি এম মোস্তফার ভাতিজা। তিনি আমার চেম্বারে আসতে চাইলেন। অনুমতি দেওয়ার পরদিন এলেন। সকাল ৯টায় তাঁকে চেম্বারে বসালাম। আমাকে বলা হলো, ‘সিদ্ধান্ত হয়েছে, শেখ হাসিনাকে মুক্তি দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি তো রাজি হচ্ছেন না। তিনি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা না বলে কোনো সিদ্ধান্ত জানাতে পারবেন না। তাই আপনাকে উদ্যোগ নিতে হবে।’ আমি শর্ত দিলাম। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সব মামলার বিচার বন্ধ করতে হবে এবং অসুস্থতার কারণে চিকিৎসার জন্য তিনি নিজের ইচ্ছামতো যেকোনো জায়গায় যেতে পারবেন। বিদেশ গেলে দেশে ফিরতে দিতে হবে। তাঁরা রাজি হলেন। এরপর আমি আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে সংসদ ভবন সংলগ্ন কারাগারে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করলাম। সন্ধ্যায়ই কোর্ট বসিয়ে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করা হলো। পরের দিন সকাল ১১টায় শেখ হাসিনাকে মুক্তি দেওয়া হলো।

মন্ত্রী হওয়ার গল্প…

কিছুদিন পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলো। আমি ভিয়েতনাম চলে গেলাম মেয়ে-জামাইয়ের কাছে। কিছুদিন সেখানে থাকার পর দেশে ফেরার দিন ঠিক হলো। যেদিন ফিরব, ঠিক তার আগের দিন খন্দকার মান্নান সাহেব (পরবর্তীকালে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী) ফোন করে বললেন, ‘নেত্রী আপনাকে তাড়াতাড়ি দেশে আসতে বলেছেন।’ দেশে ফিরলাম। রহমত আলী এমপি সাহেবকে নেত্রী পাঠালেন আমাকে ডেকে নেওয়ার জন্য। ধানমণ্ডির বাসার দোতলায় গেলাম। শেখ রেহানা এসে বললেন, আইন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে হবে। পেছন দিক থেকে শেখ হাসিনা এসে বললেন, ‘শুনছেন কী বলেছে?’ বললাম, ‘সিদ্ধান্ত নিতে দুই-তিন দিন সময় দিতে হবে!’ তিন দিন পর আমাকে আবার ডেকে পাঠানো হলো। তাঁদের বললাম, ‘আমি এই দায়িত্বটি নেব; কিন্তু আমার কিছু শর্ত আছে। যুদ্ধাপরাধের বিচার করার সুযোগ দিতে হবে। আর বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন করতে দিতে হবে।’ আমার কথা শুনে তাঁরা রাজি হলেন। এরপর মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলাম। কিন্তু জানেন নিশ্চয়ই, আমাদের সরকার গঠনের পরপরই ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিডিআর বিদ্রোহ হলো। এটি আমাদের সরকারের জন্য একটি বিশাল সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। আমাদের জন্য এটি ছিল একটি সংকটময় সময়। শেষ পর্যন্ত এর একটা সমাধান হলো।

মন্ত্রী হিসেবে বাড়তি কোনো সুবিধা নেননি…

মন্ত্রী হয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর একদিন আইনসচিব হাবিবুল আওয়াল পাঁচ লাখ টাকার একটি চেক নিয়ে এলেন। বললেন, ‘স্যার, আপনার বাসার আসবাবপত্রের জন্য এটা বরাদ্দ।’ যাঁরা নিজেদের বাসায় থাকেন, তাঁদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে এমন বরাদ্দ দেওয়া হয়। আমি তাঁকে চেক ফিরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘আমার বাসায় যা আছে, সেটাই যথেষ্ট। তার চেয়ে বেশি কিছু লাগবে না।’ এক মাস পর আইন মন্ত্রণালয় একটি পাজেরো জিপ কেনার জন্য টেন্ডার আহ্বান করেছিল। ৮০ লাখ টাকা লাগবে। আমার নজরে পড়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে সচিবের কাছে জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, ‘এটা আপনার পরিবারের ব্যবহারের জন্য।’ সেই প্রস্তাবও আমি ফিরিয়ে দিয়েছি। এমনকি আমার জন্য যে প্রাইভেট কারটি বরাদ্দ ছিল, সেটি পরিবহন পুলে রাখতে বলেছি। প্রতিদিন সকাল ৯টায় আমাকে বাসা থেকে নিয়ে আসবে আর বিকেল ৫টায় বাসায় পৌঁছে দেবে—এটুকুই যথেষ্ট। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় কাজে বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানের ইকোনমি ক্লাসেই গিয়েছি। এভাবে রাষ্ট্রীয় টাকার অপচয় রোধ করেছি। মন্ত্রী হিসেবে বাড়তি কোনো সুবিধা নিইনি।

সংবিধানে চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনা…

জিয়াউর রহমানের সময় আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনা ও রাষ্ট্র পরিচালনার চারটি মূলনীতি পরিবর্তন করা হয়। সেখানে গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল। কিন্তু ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ দিয়ে সেখানে তখন ‘আল্লাহর ওপর অগাধ বিশ্বাস’ স্থাপন করা হয়। আমি আইনমন্ত্রী থাকা অবস্থায় পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে এনেছি। এ ছাড়া আমার সময়ে অফিস-আদালতে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় আমাদের দেশের বিচার বিভাগকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

এ ক্ষেত্রে আমি দুটি বিষয় বিবেচনা করি। অন্যান্য দেশে দেখেছি, একসঙ্গে এত (প্রায় ৩৮ লাখ) মামলা কিন্তু পরিচালনা করা যায় না। উন্নত দেশে দুই পক্ষের সম্মতিতেই মামলা পরিচালনা করা হয়। এমনকি তাদের দেশে মিডিয়েটর (মধ্যস্থতাকারী) নিযুক্ত করা হয়। আমাদের দেশে ৪০-৫০ বছর ধরে মামলা চলে। এডিআর (বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) ব্যবস্থা ছাড়া এত মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে না। কিন্তু এ ক্ষেত্রে অসুবিধা হলো, আইনজীবীরা ভাবতে পারেন, তাঁরা কম ফি পাবেন। আমার মতে, বরং এডিআর পদ্ধতিটা আইনজীবীদের জন্য লাভজনক। তাঁরা পাঁচ বছরে যা পেতেন, তা একবারেই পেয়ে যাবেন। এমনকি তাঁদের এতগুলো কোর্টে আসা-যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। আরেকটি উপায় আছে, আদালতে মামলা যাওয়ার আগেই তা নিষ্পত্তি করে দেওয়া। একটি উদাহরণ দিই, ইংল্যান্ডে একটি থানায় এক বৃদ্ধা অভিযোগ করলেন—পাশের বাসার উঠতি বয়সী একটি মেয়ে ঢিল দিয়ে তাঁর বাসার কাচ ভেঙে দিয়েছে। পুলিশ এলো। কিন্তু মামলা নিল না। ভাবল, মামলা নিলে মেয়েটির ক্যারিয়ারে সমস্যা হতে পারে। বরং পরদিন দুজনকে থানায় ডাকা হলো। থানায় দেখা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরল। এরপর মেয়েটিকে বলা হলো, ‘তুমি দুই মাস ওই বৃদ্ধার বাসা পরিষ্কার করে দেবে এবং প্রতিদিন সকালে তাঁর সঙ্গে নাশতা করবে।’ এটা কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই অন্য রকম একটা বিষয়। অথচ আমাদের দেশে দেখা যায়, কারো গরু অন্যের জমির ধান বা পাতা খেয়েছে, তাতেই মামলা হয়। এটা ঠিক না। থানায় মামলা করার আগেই যদি বিরোধ মেটানো যায়, তাহলে সমাজে শান্তি আসবে।

আপনার ব্যক্তিগত জীবন?

লন্ডন থেকে ফেরার পরই বিয়ে করেছি। যদিও আগে থেকেই দুজনের পরিচয় ছিল। তাই নিজেরাই বিয়ের সব ঠিক করলাম। তবে ঘটকের ভূমিকা পালন করেছেন সাংবাদিক শফিক রেহমানের বাবা জগন্নাথ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক সাইদ-উর রহমান। এভাবে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। বলতে পারেন কিছুটা ভালোবাসার, আবার কিছুটা পারিবারিকভাবে বিয়ে। নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিবারকে যুক্ত করেছি। আমার স্ত্রী অধ্যাপিকা মাহফুজা খানম ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ডাকসুর ভিপি ছিলেন ১৯৬৬-৬৭ সালে। তিনি খুবই সচেতন ও কর্মব্যস্ত মানুষ। অধ্যাপনার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত। এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি হয়েছেন। ‘খেলাঘর আসর’-এ সক্রিয় ছিলেন। ‘শিশু বিকাশ কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেছেন অনাথ শিশুদের জন্য। তিনি এই সংগঠনের চেয়ারপারসন। নানা রকম সমাজসেবার সঙ্গে তিনি যুক্ত। মানিকগঞ্জে মেধাবীদের শিক্ষাবৃত্তি দিচ্ছেন। আর আমি নিজের পেশা নিয়ে ব্যস্ত। আমাদের দুই ছেলে, এক মেয়ে। বড় ছেলে ডাক্তার হলেও এখন ব্যবসা করছে। মেয়েও ডাক্তার। ছোট ছেলে মাহবুব শফিক একজন সফল ব্যারিস্টার। সে নিজেই চেম্বার দেখছে।

তরুণ আইনজীবীদের প্রতি কোনো পরামর্শ?

আইন পেশা একটি সম্মানজনক পেশা। মানুষকে সত্যিকার অর্থে সুবিচার দেওয়াই এই পেশার আসল উদ্দেশ্য। এ কারণে আমি সব সময় চেষ্টা করেছি আদালতের সামনে সত্য ঘটনা তুলে ধরার। আদালতের দায়িত্ব হলো, দুই পক্ষের বক্তব্য শুনে রায় দেওয়া। তাই এই পেশায় সততা বজায় রাখতে হবে। ধোঁকা দিয়ে জিতিয়ে দেওয়ার চিন্তা বাদ দিতে হবে। মীমাংসাযোগ্য অপরাধের মামলা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে সমাধান করার দিকে নজর দিতে হবে। আরেকটা জিনিস মনে রাখতে হবে, বিচারাঙ্গনে রাজনীতি করা বাঞ্ছনীয় নয়। বিচারকদের স্বাধীনভাবে বিচার করার সুযোগ দিতে হবে। মামলার রায় বিপক্ষে গেলে যদি বলা হয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে রায় দেওয়া হয়েছে—তাহলে তো সেটা বলা ঠিক হলো না। এটা নতুন আইনজীবীদের মনে রাখতে হবে।

সূত্র- কালের কণ্ঠ