বাংলাদেশে আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা এবং পরীক্ষার ধাপসমূহ

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২০ ১২:১৪ অপরাহ্ণ
মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান:

আইনজীবী কে?
একজন আইনজীবী হলেন ‘আইন ব্যবসায়ী’। যাকে বিভিন্ন দেশে এ্যাডভোকেট, ব্যারিস্টার, এটর্নি, সলিসিটর বা আইনি উপদেষ্টা হিসেবে ডাকা হয়। আইনজীবী মূলত আইনের তাত্ত্বিক বিষয়গুলির বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে কোন ভূক্তভোগী ব্যক্তির বা কোম্পানীর আইনী সমস্যার সমাধানের কাজ করে থাকেন।

অনেকেইআছেন যারা আইনজীবী হতে চান। কিন্তু জানেন না কিভাবে কি করতে হবে বা কিভাবে পড়াশোনা করতে হবে বা পড়াশোনা শেষ করেই বা কি করতে হবে। এই আর্টিকেলে আমি সম্পূর্ণ ধরনা দেওয়ার চেষ্টা করবো। আলোচনা করবো আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা এবং অযোগ্যতাসমূহ নিয়ে। তার জন্য সম্পূর্ণ লেখাটি আপনাকে পড়তে হবে।

আইনপেশা একটি স্বনামধন্য পেশা। এর জন্য কেউ শখের বসে বা পারিবারিক প্রয়োজনে বা স্বাধীন পেশা হিসেবে বা সেবামূলক পেশার কারণে বেছে নিতে চান আইন পেশাকে। আইন বিষয়ে পাস করার পর একসময় খুব সহজে বার কাউন্সিলের সনদ নিয়ে আইনজীবী হওয়া যেত। কিন্তু বর্তমান সময়ে এ পেশা প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠেছে। বর্তমান সময়ে বিসিএস (Bangladesh Civil Service) পরীক্ষার মতই তিন ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পর আইনজীবীদের সনদ প্রদান করা হয়।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে বার কাউন্সিল কি বা এই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক পরীক্ষা নেওয়ার পদ্ধতিই বা কি? সে বিষয়ে নিম্নে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

বার কাউন্সিল কি?
Bangladesh Legal Practitioner and Bar Council Order, 1972 এর অনুচ্ছেদ ২(খ) অনুযায়ী বার কাউন্সিল হচ্ছে উক্ত Order এর অধীনে গঠিত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে বুঝাবে। যা এ্যাডভোকেটদের তালিকাভুক্তকরণ, তাদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা নির্ধারণ, বার কাউন্সিল নির্বাচন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কাজ করে থাকে।

আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা
আইনজীবী হতে হলে একজন ব্যক্তিকে Bangladesh Legal Practitioner and Bar Council Order 1972 এর অনুচ্ছেদ – ২৭ অনুযায়ী নিম্নোক্ত শর্তাবলী পূরণ করতে হবেঃ
১। প্রথমত তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে;
২। তাকে ২১বছর বয়সী হতে হবে;
৩। আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করতে হবে-

  • বাংলাদেশের যেকোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে;
  • বার কাউন্সিল কর্তৃক স্বীকৃত দেশের বাইরের কোন বিশ্ববিদ্যালয় হতে;
  • ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের পূর্বে হলে পাকিস্তানের যেকোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে ;
  • ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্টের পূর্বে হলে ভারতবর্ষের যেকোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে;
  • ব্যরিস্টার এট ল’ হয়ে থাকলে;

৪। বার কাউন্সিল কর্তৃক কোন পরীক্ষায় কৃতকার্য হলে এবং পরীক্ষার জন্য নির্ধারিত ফি দিলে।

উপরোক্ত শর্তগুলো পূরণ হলে যে কেউ বার কাউন্সিলের একটি ফরম পূরণ করে জমা দিতে পারবেন। যাকে ১ম ইন্টেমিশন ফর্ম বলে। সঙ্গে আরো যা দিতে হবে তা হলো:

(ক) Bar Council Order, এর অনুচ্ছেদ ২৭ এ যে যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে তার সন্তোষজনক সাক্ষ্য প্রমাণ;
(খ) আবেদনকারীর জন্মের সন্তোষজনক সাক্ষ্য প্রমাণ হিসেবে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি;
(গ) আবেদনকারীর চরিত্র ও আচরণ সম্পর্কে দুজন স্বনামধন্যব্যক্তির প্রশংসাপত্র;
(ঘ) ফরমে উল্লিখিত তথ্য সত্য ও নির্ভুল এইমর্মে একটি এফিডেফিট প্রদান করতে হবে;
(ঙ) ৮০০+৪০০=১২০০ টাকা প্রদানের দুটি রসিদ ফরমের সাথে প্রদান করতে হবে।

উপরোক্ত সকল কিছু একজন ১০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সিনিয়র কর্তৃক স্বাক্ষরিত এবং এ্যাটাস্টেট হতে হবে।

১ম ইন্টেমিশন ফর্ম জমা দেওয়ার পর অ্যাডভোকেট হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার আগে তাঁকে একজন ১০ বছরের অভিজ্ঞ সিনিয়র অ্যাডভোকেটের চেম্বারে ধারাবাহিক ছয় মাস শিক্ষানবিশ কাল অতিক্রম করতে হবে। ৬ মাস অতিক্রম করার পর আবেদনকারীকে ২য় ইন্টেমিশন ফর্ম জমা দিতে হবে। এই ফর্মে যা যা জমা দিতে হবে:

ক) ২য় ইন্টিমিশন ফর্ম পূরণ করতে হবে;
খ) সিনিয়রের সাথে ৬ মাস কাজ করার প্রমাণ স্বরূপ একটি হলফনামা বা এফিডেভিট দিতে হবে।
গ) ৫টি ফৌজদারি এবং ৫টি দেওয়ানি মামলার তালিকা দিতে হবে;
ঘ) বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের অনুকূলে পরীক্ষার নির্ধারিত ফি বাবদ নির্ধারিত টাকার ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডার বা ব্যাংকে বার কাউন্সিলের অ্যাকাউন্টে নগদ জমা দেওয়ার রসিদ প্রদান করতে হবে।
ঙ) আরো থাকতে হবে শিক্ষাগত যোগ্যতার সব সনদ, চারিত্রিক সনদ ও ৪কপি ছবি। যা সিনিয়র কর্তৃক স্বাক্ষরিত এবং এ্যাটাস্টেট হতে হবে।

আপনার পাঠানো কাগজপত্র বার কাউন্সিল কর্তৃক গৃহীত হওয়ার পর বার কাউন্সিল আপনার বরাবর একটি রেজিস্ট্রেশন কার্ড ইস্যু করবে। সেখানে আপনাকে একটা রেজিস্ট্রেশন নম্বর দেওয়া হবে। সে নম্বর দিয়ে পরবর্তীতে আপনাকে পরীক্ষার প্রবেশপত্র (Admit Card) দেয়া হবে।

পরীক্ষা পদ্ধতি
আবেদন করা প্রার্থীদের প্রথমেই ১০০ নম্বরের (MCQ) পরীক্ষা নেওয়া হবে। MCQ উত্তীর্ণ প্রার্থীরা এরপর ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিবেন। উভয় পরীক্ষায় পাস নম্বর ৫০। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীরা ১০০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিবেন। যার পাশ নম্বর ২৫। মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মাধ্যমেই একজন প্রার্থী চূড়ান্ত হিসেবে আইনজীবী হিসেবে পদার্পন করতে পারবেন।

পরীক্ষার সিলেবাস
মোট ৭টি বিষয়ের ওপর এ্যাডভোকেটশিপ তালিকাভুক্তির পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এগুলো হলো:

১। দেওয়ানি কার্যবিধি,১৯০৮
২। দণ্ডবিধি, ১৮৬০
৩। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮
৪। সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭
৫। তামাদি আইন, ১৯০৮
৬। সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ ও
৭। বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২

আইনজীবী হওয়ার অযোগ্যতা

এতোক্ষণ এ্যাডভোকেট হওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে জানলাম। এখন কোন কোন ব্যক্তি এ্যাডভোকেট হতে পারবেন না তাও আমাদের মাথায় রাখা উচিত। নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ এ্যাডভোকেট হওয়ার অযোগ্য হইবে:

১। নৈতিকস্খলনজনিত কারনে সরকারি বা সরকারী বিধিবদ্ধসংস্থার চাকুরী থেকে অপসারিত হলে এবং অপসারিত হওয়ার পর ২ বছর অতিক্রম না করলে।

২। নৈতিক অবক্ষয়জনিত কারনে কোন অপরাধে দন্ডিত হলে এবং ৫ বছর অতিক্রম না করলে।

ইতিকথা
মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেই আপনি নিম্ন আদালতের আইনজীবী হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন। অর্থাৎ আপনি হয়ে গেলেন একজন অ্যাডভোকেট। এ ক্ষেত্রে আপনি পেয়ে যাবেন বার কাউন্সিলের সনদপত্র। তবে শুধু সনদ পেলেই হবে না, আপনি যে জেলা আইনজীবী সমিতির অধীনে প্র্যাকটিস করতে চান, সেই আইনজীবী সমিতির সদস্য পদও নিতে হবে।

লেখক: লিগ্যাল প্রাকটিশনার্স; জজ কোর্ট, ঢাকা।