‘ড. শাহ আলম: আইনের অভিভাবক’

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৬ জুলাই, ২০২০ ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ
অধ্যাপক ড. শাহ আলম

ইমরান হোসেন:

আমাদের হুজুগে জাতি বলা হয় কারণ, যা নিয়ে আমাদের হৈ-হুল্লোড় করা উচিত, তা নিয়ে না করে আমরা সময়ের দারুণ অপচয় করি। অধ্যাপক শাহ আলম স্যার বাংলাদেশের আইন জগতের এক জাজ্জ্বল্যমান তারকা। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আইনগুলোর পিছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। কিন্ত, স্যারকে নিয়ে তৈরি হয়নি উইকিপিডিয়ার প্রোফাইল, লেখা হয় না জাতীয় দৈনিকে, স্মরণ করা হয় না বাংলাদেশে আইনের বেশিরভাগ সেমিনারে। স্যারকে নিয়ে সবার সাথে অতি অল্পকিছু তথ্য ভাগাভাগি করে নিতেই স্যারকে নিয়ে এ লেখার আয়োজন।

স্যার ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন যোগদান করেছেন ১৯৯৩ সালে তখন স্যারের পদ ছিলো সহযোগী অধ্যাপক। তিনিই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুষদের প্রতিষ্ঠাকালীন ডিন এবং বিভাগের চেয়ারম্যান। কিন্ত, তাঁর ছাত্রদের দূর্ভাগ্য এবং জাতির সৌভাগ্য যে, ১৯৯৯ সালে সরকার স্যারকে ডেপুটেশনে আইন কমিশনে নিয়ে গেছেন। এতে জাতি অনেক পেয়েছে, কিন্ত তাঁর ছাত্ররা তাদের পিতৃবৎ শিক্ষককের সান্নিধ্য হারালেন।

আইন কমিশনে যোগদানের আগেই অবশ্য স্যার অধ্যাপক হয়ে গিয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করে স্যার শুধু গতানুগতিক ক্লাস নিয়েছেন, পরীক্ষা নিয়েছেন, প্রশাসনিক কাজ করেছেন এমন নয়। স্যার বই লিখেছেন, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। স্যার চারটি বই লিখেছেন। বইগুলো হলো- সমকালীন আন্তর্জাতিক আইন, বাংলাদেশে আইনের সংস্কার ও আইন কমিশন, সাংবিধানিক আইন, মানবাধিকার আইন। উনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ল’ জার্নাল (Chittagong University Journal of Law) এর এডিটর ছিলেন বহু বছর। আজকের যে মানসম্পন্ন জার্নাল স্যারেরই অবদান।

অধ্যাপক শাহ আলম স্যার বাংলাদেশে ল’ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠাতাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে স্যার ল’ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেন। ল’ ক্লিনিক হলো- আইনের ছাত্রদের আইনের প্রায়োগিক শিক্ষা দেয়া। এটি বিনামূল্যে আইনি সেবা প্রদান অর্থে ও ব্যবহৃত হয়। এটি মূলত ল’ স্কুল ভিত্তিক একটি প্রোগ্রাম, যেখানে ছাত্রদের আইন প্রয়োগের বাস্তব ধারণা দেয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন মানুষকে আইনি পরামর্শ প্রভৃতি দিয়ে থাকে। বর্তমানে, এটি লিগ্যাল এইডকে ও অন্তর্ভুক্ত করে। স্যার ছাত্রদের আইন হাতে-কলমে শেখানোর জন্য ল’ ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ফলে, তাঁর সরাসরি ছাত্র যারা ছিলেন, তারা এখন সারা বাংলাদেশে সুনাম কুড়াচ্ছেন।

যাহোক, স্যার ১৯৯৯ সালে আইন কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগদান করে ২০০০ সাল পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তারপর আবার তাঁর প্রিয় ক্লাসরুমে ফিরে আসেন। স্যারের কাজে মুগ্ধ হয়ে সরকার আবার ২০০৯ সালে স্যারকে আইন কমিশন নে নিয়ে যান সদস্য হিসেবে। স্যার ২০১০ সাল পর্যন্ত সেখানে সদস্য ছিলেন। ইতোমধ্যে, কমিশনের চেয়ারম্যান মাননীয় বিচারপতি আবদুর রশিদ পদত্যাগ করলে স্যার ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। স্যার যতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন কমিশনে ততদিন অত্যন্ত সুন্দরভাবে কাজ করেছেন। অসংখ্য আইনের ত্রুটি স্যারের চোখে পড়েছিল। স্যার সংশোধনের সুপারিশ করেছেন সরকারের কাছে। সরকার কিছু সংশোধন করেছে, কিছু সম্ভব হয়নি। মুসলিম আইন অনুযায়ী মৃতব্যক্তির ছেলের অবর্তমানে মেয়েদের সম্পদ বাড়ানো, বিচারকাজে বাংলা ভাষা প্রয়োগ, উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে কী করণীয় ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সহ আরো অনেক বিষয়ে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রেরণ স্যারের আমলেই হয়েছিল।

১৯৯৬ সালে আইন কমিশন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী ১২৮টি সুপারিশ পাঠায় কমিশন। তন্মধ্যে ৪৮টি সুপারিশই স্যারের সদস্য এবং চেয়ারম্যান থাকাকালীন। এই ৪৮ টি সুপারিশের মধ্যে ১৬টি স্যার চেয়ারম্যান থাকাকালীন। এমন লাগাতার কঠোর পরিশ্রম অন্য অনেক সময়ই দেখা যায়নি। এই ছিল বাংলাদেশের আইনকে যুগোপযোগী করতে স্যারের আকুল প্রচেষ্টা। আইন কমিশনকে আধুনিক করার এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটির গুরুত্ব বাড়াতে স্যারের উৎসাহী পদক্ষেপ ছিল।

আইন অঙ্গনের এ উজ্জ্বল নক্ষত্র রাশিয়ার Moscow People’s Friendship University থেকে আইনে স্নাতক, স্নাতকোত্তর শেষ করে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ের ওপর ডক্টরেট করেন। তারপর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আগমুহূর্ত পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন ১০ বছর। স্যার ব্যক্তি হিসেবে কেমন ছিলেন সেটা ও উল্লেখযোগ্য। স্যারের এক ছাত্র জনাব জেহাদ সাইফুলের ভাষ্যে- “একবার স্যার শিক্ষকদের কক্ষ থেকে বের হয়ে ক্লাসরুমে যাচ্ছিলেন। আমরা স্যারের পিছুপিছু গেলাম। একটু পর স্যার ছাত্রদের ওয়াশরুমে ঢুকলেন। আমরা ও ঢুকলাম। দেখলাম একটি ট্যাপ দিয়ে পানি পড়ছে। স্যার তা বন্ধ করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।” এ ঘটনা থেকে শিক্ষণীয় যে, স্যার এতবড় মাপের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও বিভাগের কর্মচারীদের একটা কাজ নিজ হাতে করতে দ্বিধা করেন নি। স্যারের কাছে কাজের কোনো শ্রেণীবিভাগ ছিল না। বিভাগের সব কাজই তিনি নিজের মনে করতেন। এতো আন্তরিক এবং ইর্ষনীয় চরিত্রের মানুষ স্যার ছিলেন বলেই এত অল্প সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ আজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পেরেছে। স্যার যাদের ক্লাসরুমে পড়িয়েছেন আর যাদের পড়ান নি তাদের মধ্যে অনেক পার্থক্য। ওনার চলাফেরা ছিল একেবারেই সহজ-সরল গ্রামীণ মানুষের মতো। চাকচিক্য ছিল না পোশাকে। কথায় ছিল না অহংকার। নতুন ছাত্ররা করিডোর দিয়ে হেটে গেলে কল্পনাই করতে পারবে না যে, তাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন বাংলাদেশের আইন জগতের অন্যতম এক অভিভাবক, দেশে-বিদেশে সম্মানীয় এক অধ্যাপক। এতোই সরলতা ছিল স্যারের চলাফেরায়।

ইমরান হোসেন: শিক্ষানবিশ আইনজীবী; ফেনী জজ কোর্ট।