সিনিয়র আইনজীবীদের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও আইনঅঙ্গনে অস্থিরতা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১২ জুলাই, ২০২০ ৮:৩৬ অপরাহ্ণ

মো. ওবাইদুল্যাহ আল মামুন:

সাম্প্রতিক দুটো ঘটনা আমার নজরে আসার পর তথাকথিত শিক্ষানবীশ আইনজীবীদের চলমান আন্দোলন সম্পর্কে কিছু কথা বলা অত্যন্ত জরুরী। ঘটনা দুটোতে দেখা যায়, তথাকথিত শিক্ষানবীশ আইনজীবীরা মহ্যমান্য হাইকোর্টের সামনেই একজন আইনজীবীকে শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত করছে এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির বর্তমান সম্পাদক ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল স্যারের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করছে। প্রথমেই এই দুটো ঘটনার তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করছি এবং পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি তারা যেন অতি সত্ত্বর আদালত প্রাঙ্গণে এই ধরণের অভদ্র ও উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিবর্গের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেন এবং প্রয়োজনবোধে প্রশাসনের সহায়তা নিতে পারেন। আদালতপ্রাঙ্গণ কোন বহিরাগতদের আন্দোলনের জায়গা হতে পারে না।

এবার আসি তাদের দাবীগুলো সম্পর্কে। যতদূর জানতে পেরেছি, তাদের দাবী দুটো। এক, প্রতি বছর বাংলাদেশ বার কাউন্সিলকে এনরোলমেন্ট পরীক্ষা নিতে হবে। দুই, এমসিকিউ উত্তীর্ণদের গেজেট প্রকাশ করে আইনজীবী তালিকাভুক্ত করতে হবে। তাদের প্রথম দাবীটির প্রতি আমার পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। কিন্তু, দ্বিতীয় দাবীটি একেবারেই অযৌক্তিক ও অবৈধ বিধায় আমি প্রত্যাখ্যান করছি। একটি যৌক্তিক ও বৈধ দাবীর আড়ালে তারা একটি সম্পূর্ণ অন্যায় আবদার করছে। এটি অনেকটা শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো।

এই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করছে তাদের মাঝে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। এদের প্রায় সকলেই মধ্যবয়স্ক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন ল’ কলেজ থেকে আইন পাশ করেছে। আইনে স্নাতক ডিগ্রিধারী কেউ এদের সাথে সশরীরে যোগদান করেছে মর্মে আমি অবগত নই। কারনও সুস্পষ্ট। যারা চার বছর বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছে এবং বার এট ল সম্পন্ন করেছে তারা লিখিত এবং ভাইবা পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হবার ব্যাপারে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। প্রকারান্তরে, যারা শেষ বয়সে অন্যান্য পেশায় প্রতিষ্ঠা লাভে ব্যার্থ হয়ে নামেমাত্র বিভিন্ন ল’ কলেজ থেকে আইন পাশ করে এই পেশায় আগ্রহী হয়েছে তারা পরীক্ষা এড়াতে পারলেই বাঁচে তাই তারা আন্দোলনে অগ্রগামী। সম্ভবত, মাননীয় প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি একারনেই দুই বছরের পাসকোর্স বন্ধ করে দিতে চেয়েছেন। আমি এটি মোটেও বিশ্বাস করি না যে, মেধাবী শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা ছাড়াই সনদ নিয়ে আজীবন তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হতে আগ্রহী।

লক্ষনীয় যে, তাদের আন্দোলনের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যাক্ত না করলেই তারা আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। আমি আমার প্রাণপ্রিয় বারে এরকম সহকর্মী চাই না।

আন্দোলনকারীদের অনেকেই দাবী করেন, এমসিকিউ উত্তীর্ণদের অনেকে সনদপ্রাপ্ত আইনজীবীদের পড়াতে পারেন। তর্কের খাতিরে মেনে নেই যে, আপনারা এনরোলমেন্ট পরীক্ষার সিলেবাসভুক্ত সাতটি আইনে অত্যন্ত দক্ষ (যদিও, দেওয়ানি বা ফৌজদারী কার্যবিধিতে যুগের পর যুগ প্র্যাকটিস করে চলা কোন সিনিয়র আইনজীবীকেও অন্তত এই দুটি আইনের দখলের ব্যাপারে আমি এরূপ দাবী করতে দেখি নাই এবং সম্ভবত দেখবোও না); তাহলে বলেন দেখি মহামান্য আপীলেট ডিভিশন যে বার কাউন্সিলকে প্রতিবছর পরীক্ষা নিতে বলেছে সেটি কোন আইনের অধীনে দায়েরকৃত মামলায়? বার কাউন্সিল মহামান্য আপীলেট ডিভিশনের নির্দেশনা থাকার পরও যেহেতু আপনাদের পরীক্ষা নিচ্ছে না, সেহেতু বর্তমানে আপনারা আইনগত কি পদক্ষেপ নিতে পারেন এবং সেটিও কিসের ভিত্তিতে?

জেনে রাখুন, সেই পদক্ষেপ যদি আপনাদের নিতে হয়, তাহলেও কিন্তু একজন আইনজীবীকেই আপনাদের প্রয়োজন হবে। কিন্তু, সেই আইনজীবীদের সাথেই আপনারা যে আচরন করছেন, তাতে আমার সন্দেহ হয় আপনারা কোন আইনজীবী পাবেন কিনা? যদি ধরে নেই, আপনাদের দাবীর মুখে বার কাউন্সিল গেজেট প্রকাশ করে আপনাদের সনদ প্রদান করবেন, সেক্ষেত্রেও জেনে রাখুন যে, ঐ আদেশের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই রিট ফাইল করবো। সেই রিট মোকাবেলাতেও আপনাদের একজন আইনজীবী লাগবে। পাবেন তো?

মহামান্য আপীলেট ডিভিশনের নির্দেশনার আলোকে বার কাউন্সিল প্রতিবছর আপনাদের পরীক্ষা নিতে বাধ্য। সেটি তারা করছে না। এটি বার কাউন্সিলের ব্যার্থতা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বার কাউন্সিলের কোন ব্যার্থতা কি আপনাদের লাভবান হওয়ার সুযোগ দিতে পারে? নাকি এর জন্য বার কাউন্সিলকে আপনারা আইনানুগ ফলভোগের মুখোমুখি করতে পারেন?

আপনাদেরকে পরীক্ষা ছাড়াই সনদ দিয়ে লাভবান করতে হবে কেন? আমি যদি আজকে কাউকে একটা থাপ্পড় দেই তাহলে আইন আমাকে শাস্তি দিবে তাকে কিছু দিবে না। আবার ধরেন আমি যদি আপনার সম্পত্তি থেকে আপনাকে বেদখল করি তাহলে আইন আপনাকে আপনার সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করে দিবে। কিন্তু পুনরুদ্ধারে যে সময় আদালতে ব্যায় হবে তার জন্য আপনাকে কি কিছু দিবে আইন?

বার কাউন্সিল কর্তৃক কালক্ষেপণের অজুহাত দিবেন তো? সেই কাল তো আপনারা নিজেরাই ক্ষেপণ করেছেন দেরিতে এই পেশায় আসতে চেয়ে? যখন অন্যান্য পেশায় সময় নষ্ট করছিলেন, তখন আপনাদের সময় কি মূল্যহীন ছিলো? রাতারাতি খুব দামি হয়ে গেলো আপনাদের সময়! আমি নিজেও এই কালক্ষেপণের শিকার হয়েছিলাম তিন বছরের মত। তাই বারংবার বলি আপনাদের প্রথম দাবীর সাথে আমি সম্পূর্ণরুপে একমত।

অনেকেই, করোনার কারনে তাদের মুল্যবান সময় অপচয় হবার অজুহাতে সনদ চাইছে। এটিই যদি কারন হয়, তাহলে অবগত থাকুন যে, এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা বাংলাদেশের ইতিহাসে কখনো এরূপ অনিশ্চয়তার শিকার হন নাই। কখন তারা কলেজের গণ্ডি পেরুবে, কখন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করবে, আদৌ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে কিনা – এসবই অনিশ্চিত। তারপরও তাদের দেখলাম না, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে পরীক্ষা মওকুফের আবেদন করতে। আপনারা কি তাহলে তাদের থেকেও ছোট?

কেউ কেউ দেখলাম একটি ছক প্রকাশ করেছেন যেটির মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে যে, যখন সনদপ্রাপ্তির পরীক্ষা ছিল না (যদিও এরকম আদৌ ছিলো কিনা আমি সন্দিহান), তখন ভালো আইনজীবী পাওয়া যেতো; আর দিন দিন পরীক্ষা বাড়ার সাথে সাথে, ভালো আইনজীবীর সংখ্যা কমছে। যদিও আমি জানিনা তাদের ঐ ছকের তথ্যসুত্র কি, তারপরও বলি- দিন দিন যদি ভালো আইনজীবীর সংখ্যা কমে তাহলে সনদপ্রাপ্তির পরীক্ষার চেয়েও আইনশিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যথেষ্ট সমীচীন। যদি আইনশিক্ষার মান ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তাহলে সনদপ্রাপ্তির পরীক্ষার মান যাই হোক না কেন, সনদ প্রাপ্তির পর তো আপনাদের উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে যাওয়ার কথা! আপনাদের ভাষ্যমতেই তা হচ্ছে না। তাহলে? আপনাদের আইনশিক্ষাতে ত্রুটি আছে ধরে নিতে হবে। এখন এরকম ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যাবস্থার ফসল এই আপনাদেরকে গেজেট করে আইনজীবী তালিকাভুক্ত করতে হবে? হাস্যকর বটে।

কয়েকজন আবার দেখলাম, বার কাউন্সিল অর্ডার এর অনুচ্ছেদ ৪০(১) এবং ৪০(২)(এম) এর ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। অনুচ্ছেদ ৪০(২)(এম) এ বার কাউন্সিল পরীক্ষা মওকুফ করতে পারবে বলে নাই, বলা হয়েছে- যে পরীক্ষা পাশের মাধ্যমে আইনজীবী তালিকাভুক্ত হবেন সেটি নির্ধারন করতে পারবে। প্রকাশ থাকে যে, এই ক্ষমতাবলেই বার কাউন্সিল এমসিকিউ পরীক্ষার প্রবর্তন করেছেন যেটি আগে ছিলো না। আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য যে পরীক্ষা পাশ করতে হবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা মানে পরীক্ষা মওকুফের ক্ষমতা নয়। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, উক্ত অনুচ্ছেদে পরীক্ষা ‘পাশ’ এর কথা বলা হয়েছে।

এবার আসি আরেকটি বিষয়ে, আমি জানি যে সকল শিক্ষানবিশ এই আন্দোলনের অংশ নন, এবং তাদের ঔদ্ধত্যপুর্ণ আচরণেরও ভাগীদার নন। তথাপিও শিক্ষানবিশরা যখন আদালতে সনদপ্রাপ্তির পর সিনিয়রদের কাছে কিছু শিখতে যাবেন বা পরামর্শ করতে যাবেন, তখন সিনিয়ররা ২০২০ ব্যাচ শুনলে আপনাদের সহযোগিতা করবে কিনা আমার সন্দেহ হয়। লক্ষণীয় যে, আন্দোলনের অগ্রগামীরা এই বিষয়টা ভাববেনই না। কারন মধ্যবয়স্ক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন ল’ কলেজ থেকে কোনরকম আইন পাশ অন্যান্য পেশায় প্রতিষ্ঠা লাভে ব্যার্থ এরা এই পেশার উৎকর্ষ সাধনে জন্য আসতে চান না, তারা আসতে চাচ্ছেন এই পেশা থেকে যে কোন উপায়ে অর্থ উপার্জনের জন্য। অতএব, আপনাদের প্রতি অনুরোধ সচেতন হোন।

মো. ওবাইদুল্যাহ আল মামুন: অ্যাডভোকেট; জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা।