জামিনের আদ্যোপান্ত

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২০ ৬:০৭ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

সিরাজ প্রামাণিক:

আইনের মূলনীতি হচ্ছে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে নির্দোষ বলে গণ্য করতে হবে। এ নিবন্ধটি লিখতে গিয়ে ফৌজদারী কার্যবিধির কোথাও জামিনের কোন সংজ্ঞা আমি খুঁজে পাইনি। তবে জামিন বিষয়ে উপমহাদেশের উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত থেকে বলা যায় যে, ‘নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে বা চাহিবামাত্র কোন ব্যক্তিকে কোন নির্দিষ্ট স্থানে ও সময়ে হাজির করার বা টাকা পয়সা বা জিনিসপত্র চাহিবা মাত্র ফেরৎ প্রদানের নিশ্চয়তা বিধান। কোন ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তির জন্য এই মর্মে মুচলেকা দিতে রাজি হন যে, তাকে নির্দিষ্ট সময়ে ও স্থানে হাজির করবেন। আবার কেউ কোন জিনিস বা টাকা পয়সা গ্রহণ করলে অন্য একজন তার পক্ষে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন এই কারণে যে গ্রহণকারী ফেরৎ না দিলে তিনি নিজে তা ফেরত দিতে বাধ্য থাকবেন। এই ধরনের বিধানকে আইনের ভাষায় জামিন বলা হয়। আর যিনি নিশ্চয়তা প্রদানকারী বা জিম্মাদার হন তাকে বলা হয় জামিনদার।

যেকোনো আসামি গ্রেপ্তারের পরপরই আদালতের কাছে জামিন চেয়ে থাকেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। কখনো কখনো গ্রেপ্তারের পূর্বেও জামিন চাওয়া যায়। যাকে আগাম জামিন বলা হয়। কাজেই জামিনটা হচ্ছে পুলিশ কিংবা আদালতের হেফাজত থেকে আসামীকে এমন কারো জিম্মায় দেয়া, যিনি আদালতের চাহিদামতে আদালতের সামনে উপস্থাপন করার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। সেকারণ জামিন গ্রহণকালে আদালত একটি নির্দিষ্ট পরিমান বন্ডের টাকার কথা উল্লেখ করেন। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের আলোকে জামিনের অর্থ হলো কোন লোককে পুলিশের হেফাজত হতে মুক্ত করে জামিনদারের হাতে অর্পণ করা। (৫ ডিএলআর, ১৫৪)

জামিন মঞ্জুর বা নাকচ প্রধানত “বিশ্বাস করার যুক্তিসংগত কারণসমূহের” উপর নির্ভর করে। আদালত যদি সন্তুষ্ট হন যে, জামিন মঞ্জুর করলে আসামী বিচারে অংশগ্রহণ করবে, পলায়ন করবে না এবং সাক্ষীর প্রতি অবৈধ হস্তক্ষেপ করবে না তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে জামিন মঞ্জুর করতে হয়। কারণ জামিনকে শাস্তি হিসেবে গণ্য করে আসামীকে আটক রাখা ঠিক নয় মর্মে উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত রয়েছে। এখানে জেনে রাখা দরকার যে, আসামী নিজেই জামিন মঞ্জুরের আবেদন করতে পারেন এবং আদলতের সামনে তার যুক্তি প্রদর্শন করতে পারেন। কিন্তু সকল আসামী আইন ও পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞাত না থাকায় নিজের বক্তব্য নিজে পেশ করতে না পারায় আইনজীবীর মাধ্যমে তাদের বক্তব্য পেশ করে থাকেন।

আমাদের ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৪(১)(খ) নং ধারায় ফৌজদারি কোন অপরাধগুলি জামিনযোগ্য এবং কোনগুলো জামিনের অযোগ্য এই দুইটি অংশে ভাগ করা হয়েছে। জামিনযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি জামিন পাওয়ার অধিকারী। সন্তোষজনক বন্ড বা সিকিউরিটি প্রদানের মধ্য দিয়েই একজন ব্যক্তি এসব অপরাধের মামলায় জামিন পেতে পারেন। জামিন অযোগ্য অপরাধের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ ধারায় মামলার নথিপত্র দেখে যদি মনে হয় যে, সংশ্লিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির জড়িত থাকার সম্ভাবনা অস্পষ্ট, তাহলে বিজ্ঞ আদালত জামিনের অযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দিতে পারেন।

যেসব অপরাধে মৃত্যুদন্ড কিংবা যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজা হয়ে থাকে, সেসব অপরাধের মামলায় জামিন মঞ্জুর করার ব্যাপারে আদালত সাধারণত খুব একটা আগ্রহী হন না। তবে মামলার নথিপত্র থেকে যদি এই কথা মনে হওয়ার সুযোগ থাকে যে, এই মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মিথ্যা ও হয়রানিমূলকভাবে জড়ানো হয়েছে, সে ক্ষেত্রে এ ধরনের গুরুতর মামলায়ও অভিযুক্ত ব্যক্তি আদালতের মর্জি মোতাবেক জামিন পেতে পারেন।

এছাড়া শিশু, নারী, অসুস্থ ও অক্ষম ব্যক্তির জামিনের ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯৭ নং ধারার শেষ দিকে এসে বলা হয়েছে যে, অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সী শিশু, নারী, অসুস্থ ও অক্ষম ব্যক্তিকে আদালত জামিন প্রদান করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি যাবজ্জীবন কারাদন্ড কিংবা মৃত্যুদন্ডের অপরাধ করে, তবুও এদেরকে জামিন দিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।

এবার আসি আগাম জামিন বিষয়ে। অভিযুক্ত ব্যক্তি অনেক সময় গ্রেপ্তারের আগেই আদালত থেকে জামিন গ্রহণ করতে পারেন। এ ধরনের জামিনকেই ‘আগাম জামিন’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিভিন্ন মামলার সিদ্ধান্তে বিচারকরা মত প্রকাশ করে বলেন, কিছু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার-পূর্ব জামিন দেয়া যেতে পারে। তবে মনে রাখবেন আগাম জামিন প্রদানের এই ক্ষমতা কেবল মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ এবং দায়রা জজ আদালতই প্রয়োগ করতে পারেন।

‘আগাম জামিন’ পেতে আবেদনকারীকে আদালতের সামনে প্রমাণ করতে হবে যে, তিনি সরকারের বিরাগভাজন হয়ে আশু গ্রেপ্তারের আশঙ্কা করছেন। তাকে দেখাতে হবে যে, রাষ্ট্রপক্ষ অসৎ উদ্দেশ্যে তাকে গ্রেপ্তার করতে চায় এবং এতে করে তার সুনাম এবং স্বাধীনতায় অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে।

এবার আসি অন্তবর্তীকালীন জামিন বিষয়ে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে এ সংক্রান্ত কোনো প্রকাশ্য বিধান না থাকলেও আদালত তার অন্তর্নিহিত ক্ষমতা (ইনহ্যারেন্ট পাওয়ার) প্রয়োগ করে মামলার যেকোনো পর্যায়ে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট একটি মেয়াদ পর্যন্ত অন্তবর্তীকালীন জামিন দিতে পারেন। মামলা যদি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকে তাহলে দায়রা আদালতে আর দায়রা আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকলে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে এই জামিন আবেদন পেশ করতে হয়।

এবার আসুন জেনে নিই তদন্ত চলাকালে জামিন বিষয়ে। পুলিশ তদন্ত যদি ১২০ দিনের মধ্যে সম্পন্ন না হয়, সে ক্ষেত্রে অপরাধটির সাজা মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা ১০ বছরের অধিক কারাদন্ড না হলে ম্যাজিস্ট্রেট কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জামিন দিতে পারেন। জামিন মঞ্জুর করার পর কারাগার থেকে মুক্তি পেতে বেইল বন্ড বা জামিননামা দাখিল করতে হয়। বিচারকের স্বাক্ষরযুক্ত জামিননামা কারাগারে পৌঁছানোর পরেই অভিযুক্ত ব্যক্তি মুক্ত হতে পারেন।

সিরাজ প্রামাণিক: বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। Email: seraj.pramanik@gmail.com