ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ২৫ বছর: কমেনি ধর্ষণ-নির্যাতন

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট, ২০২০ ৪:৪৪ অপরাহ্ণ
ইয়াসমিন ট্র্যাজেডির ২৫ বছর

ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস আজ সোমবার। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট কিছু পুলিশ সদস্য কর্তৃক ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন কিশোরী ইয়াসমিন। এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নামলে পরে জনতার ওপর গুলিবর্ষণে নিহত হন পাঁচজন। সেই থেকে দিনটি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস পালন হয়ে এলেও ঘটনার ২৫ বছরেও থেমে নেই খোদ ইয়াসমিনের জেলা দিনাজপুরে নারী ও শিশু নির্যাতন।

১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট। দীর্ঘদিন পর মাকে দেখার জন্য আকূল হয়ে ঢাকা থেকে দিনাজপুরে বাড়ি ফিরছিল কিশোরী ইয়াসমিন। দিনাজপুরের বাস না পেয়ে সে পঞ্চগড়গামী একটি বাসে ওঠায় গাড়ির লোকজন তাকে দশমাইল নামক স্থানে নামিয়ে দিয়ে সেখানকার এক চায়ের দোকানির জিম্মায় দেয়। ওই চায়ের দোকানের সামেন একটি পুলিশের ভ্যান এসে প্রায় জোর করে তুলে নিয়ে যায় ইয়াসমিনকে। পুলিশ সদস্যরা নিরাপদে ইয়াসমিনকে শহরে মায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু রক্ষক হয়ে পুলিশ ভক্ষক সেজে পথে পুলিশ ভ্যানের ভেতরেই ইয়াসমিনকে উপর্যুপরি ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়। পরে তার লাশ রাস্তার পাশে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায় তারা। এ ঘটনার ১০ দিন পর দশমাইল এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ করে স্থানীয় জনতা। পরে তা ধীরে ধীরে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। শান্ত দিনাজপুরবাসী হয়ে ওঠে অশান্ত। বিক্ষুব্ধ জনতাকে দমাতে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন সামু, সিরাজ, কাদেরসহ পাঁচজন। গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হন অনেকে। পরে আন্দোলনের মুখে জড়িত তিন পুলিশ সদস্যকে বিচারের আওতায় আনা হয়।

১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট বিচারের রায়ে তাদের ফাঁসির আদেশ হয়। ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিন পুলিশের দণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। ইয়াসমিনের ঘটনার পর থেকেই ২৪ আগস্ট দিনটি পালিত হয়ে আসছে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস হিসেবে।

ওই ঘটনার ২৫ বছর পার হলেও দিনাজপুরে থেমে নেই নারী নির্যাতন। তেমনিই এক নির্যাতনের শিকার জেলার শিবপুর এলাকার এক কিশোরী। প্রেমের ফাঁদে ফেলে তাকে ডেকে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে চার যুবক। এই ঘটনায় গত ৪ জুলাই মামলা করলে পুলিশ তিনজনকে আটক করে। কিন্তু ঘটনার মূল অভিযুক্ত রিপনসহ তার আরও পাঁচ সঙ্গী এখনও গ্রেপ্তার হয়নি।

ওই কিশোরীর মা বলেন, ঘটনার সময় আমি ঢাকায় ছিলাম। জানতে পেরে এলাকায় এলে এখানকার লোকজন আমাকে বাধা দেয়। অভিযুক্ত যুবকদের অভিভাবকরা আমাদের গ্রাম থেকে উচ্ছেদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমি বিচার চাচ্ছি।

দিনাজপুর পুলিশ সুপার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত সাত মাসে জেলায় ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতন মামলা হয়েছে ২০৪টি। আসামির সংখ্যা ৩৭৪টি। এর মধ্যে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ২৮৮ জনকে। আর ২০১৯ সালে মামলা হয়েছে ৪৬৯টি, মোট আসামি ৮৬৫ জন এবং গ্রেপ্তার হয়েছে ৭০৩ জন। ২০১৮ সালে এ-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৪৩৪টি। আসামি ৮১৩ জন এবং পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে ৬৬৭ জনকে।

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে দিনাজপুর সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সদস্য সচিব সুলতান কামাল উদ্দিন বাচ্চু বলেন, নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ হয়েছিল ইয়াসমিনের ঘটনা তার মাইলফলক। কিন্তু নির্যাতনের ঘটনা না কমার কারণ মানবিক মূল্যবোধ নিম্নগামী হওয়া ও নৈতিক স্খলন। দিনাজপুর মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কানিজ রহমান বলেন, অপরাধীরা বেঁচে যাচ্ছে প্রশাসনের সহযোগিতায়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে। যার ফলে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য দরকার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।

বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদের নির্বাহী সদস্য রেজাউর রহমান রেজু বলেন, যারা উচ্চ আসনে বসে আছেন, তাদের প্রশ্রয় ও সাহস পেয়ে এসব অন্যায় ধীরে ধীরে বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে সমাজ ভেঙে পড়বে।

ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গড়ে ওঠা আন্দোলনে মূল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বর্তমান দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন শীল গোপাল। তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন লাঘবের জন্য যে আন্দোলন হয়েছিল তার ২৫ বছর পরেও এসব ঘটনা কমেনি। এর বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে সামাজিক আন্দোলন ও সচেতনতা প্রয়োজন। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন রোধে এ-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়াও উচিত। এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় পদক্ষেপ নেবে এটাই আমাদের দাবি।

দিনাজপুরের পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন বলেন, সীমান্তবর্তী এই জেলায় নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ ভৌগোলিক। আমাদের অভিভাবকদের মধ্যেও সন্তানদের প্রতি একটু অবহেলা বা খেয়াল রাখার অভাব রয়েছে। পরিবার ও স্কুল-কলেজ থেকে যদি এসব ব্যাপারে সচেতন করা যায়, তাহলে নারী নির্যাতনের ঘটনা অনেকাংশে কমবে।