রাষ্ট্রীয় আইন বনাম পারিবারিক নৈতিকতা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২০ ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
সাঈদ আহসান খালিদ

সাঈদ আহসান খালিদ: বাংলাদেশ ভূআয়তনে ছোট হলেও আইন প্রণয়নে বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটি দেশের একটি। ব্রিটিশদের স্বার্থে বানানো সব আইন বিনা বাক্যে এই দেশে আত্মীকরণ করা ছাড়াও পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ আমলে কঠোর কঠোর সব আইন প্রণয়নে আমরা পৃথিবীর উর্বর জাতিতে পরিণত হয়েছি। দীর্ঘ বছরের আইন পড়া, পড়ানো ও আইনচর্চার সাথে নিবিড় সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও বলা কঠিন- বাংলাদেশে কী কী বিষয়ে মোট কতটি আইন আছে। আটলান্টিকের মতো এ এক অতল সমুদ্র! কিন্তু তাতে অপরাধ কি কমেছে?

ফৌজদারি মামলা সংখ্যায় বাংলাদেশের আদালত ভারাক্রান্ত, বিচারবিভাগ উদয়াস্ত পরিশ্রম করছে কিন্তু মামলা জট লেগেই আছে, অপরাধের সংখ্যা বাড়ছে, অপরাধের প্রকৃতি বাড়ছে, অপরাধের ধরণ বাড়ছে, ঘাপটি মারা ‘পটেনশিয়াল অফেন্ডার’ আইনের ফাঁকফোকর আর সুযোগ পেয়েই নতুন অপরাধে প্রবৃত্ত হচ্ছে, সেই নতুন ধরণের অপরাধের মোকাবেলায় শাস্তির খড়গ হাতে আবার নতুন আইন প্রণীত হচ্ছে, নতুন আইনে নতুন মামলা, নতুন বিশেষায়িত আদালত- এ এক অনি:শেষ দুষ্টচক্র! আইন দিয়ে সবকিছু এবং সবাইকে ‘সাইজ’ করার এই প্রবণতা আইন এবং সমাজ উভয়ের জন্যই আত্মঘাতী।

সভ্যতা, ভদ্রতা, সৌজন্য, বিনয় এসব আইন দিয়ে শেখানো যায় না। কঠোর আইন দিয়ে অসভ্য, অভদ্র, দুর্বিনীত একজন মানুষকে হয়তো শাস্তি দেওয়া যায় কিন্তু সেটি তাঁকে আরো ক্ষুদ্ধ, আরো প্রতিহিংসাপরায়ণ, আইনের প্রতি আরো অশ্রদ্ধাশীল করে তোলে। শাস্তির ভয়ে তাদের কেউ কেউ হয়তো একই কাজের পুনরাবৃত্তি হতে বিরত থাকে- কিন্তু তার মানে এই নয় তার মনোবিকার সুস্থ হয়েছে কিংবা সুকুমারবৃত্তির মননশীল মানুষে পরিণত হয়েছে বরং সে ঘাপটি মেরে আছে- সমস্ত জিঘাংসাসমেত- যেখানেই আইন কিংবা আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুপস্থিতি পাবে- সেখানেই বেরিয়ে আসবে তার অবদমিত সত্তা, অসৌজন্য ব্যবহার, বেআইনি কর্ম কিংবা দুর্বিনীত আচরণ। আইনের হাতে ধরা পড়ার আগ পর্যন্ত তার অবস্থা হবে- ‘সুযোগের অভাবে সৎ’।

কোন রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রের আইনের পক্ষে ২৪ ঘন্টা রাষ্ট্রের চৌহদ্দি জুড়ে তার নাগরিকদের মনিটরিং বা পাহারা দেওয়া কার্যত অলীক ও অসম্ভব একটি ব্যাপার। কঠোর কঠোর আইন প্রণয়নের চেয়ে তাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে- ‘আইন কেন মানবো’, বা ‘আইনকে কেন শ্রদ্ধা করবো’– এই উপলব্ধি ও বোধ জনগণকে আত্মস্থ করানো, বুঝতে শেখানো। ঠিক এখানেই দায়িত্বটি রাষ্ট্রের ঘাড় থেকে কমিউনিটি ও ফ্যামিলির কাছে ন্যস্ত হয়। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ পরিবার থেকে শিক্ষা দিতে হয়, এটি মানুষের শৈশব ও কৈশোরিক বিকাশ পর্বে পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্গত করতে হয়।

বাংলাদেশে এখানেই বিশাল ফাঁক রয়ে যাচ্ছে। তাই বাসে শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও নারীদেরকে সম্মান করতেও এদেশে কঠোর আইন করতে হয়, পিতামাতাকে ভরণপোষণ দিতে আইন করতে হয়, বউ না পেটানোর জন্য পারিবারিক সহিংসতাবিরোধী আইন করতে হয়। আইনের কুইনাইন গেলানো হচ্ছে ঠিক কিন্তু সেই পুরনো জিজ্ঞাসা- ‘কুইনাইন জ্বর সারায়, কিন্তু কুইনাইন সারাবে কে?’

এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পাঠ্যক্রমে অপরাধ বিজ্ঞান বা ক্রিমিনোলজি নামে একটি কোর্স পড়ানো হয় যেটিতে অপরাধের পেছনে একজন অপরাধীর জৈবিক, বংশগত, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কার্যকারণ বিশ্লেষণ করা হয়। যে সমাজে ক্রিমিনোলজির জ্ঞান নেই সেখানে সব অপরাধীকে ফাঁসিতে ঝোলানোর দাবি উচ্চকিত হবে আবার আবার সেই গণদাবি দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়িত হবে সেটাই স্বাভাবিক। এটি একটি জাতীয় দেউলিয়াত্ব।

আইনের চেয়ে জাতীয় নৈতিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেখানেই আমাদের যত ঘাটতি। এজন্যই এখানে বাসে উঠতেই বাস কর্তৃপক্ষ ভদ্র থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিতে বংশ ধরে টান মেরে লিখে দেয়- ‘ব্যবহারে বংশের পরিচয়’, এজন্যই আল্লাহর ঘর মসজিদে ঢুকতেই প্রথম চোখে পড়ে- ‘জুতা চোর হতে সাবধান’, রাস্তার পাশের দেয়ালে লিখে রাখতে হয়- ‘এখানে প্রস্রাব করিবেন না’, রেস্টুরেন্টে সাইনবোর্ড ঝুলে-‘রাজনৈতিক আলাপ নিষেধ’, মুদি দোকানে ১০ টাকার লাইটার কিংবা পাঁচ টাকার বলপয়েন্ট কলমটিকেও সুতো দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়! দার্শনিক প্লেটো সেই কবে বলে গেছেন-

‘Good people do not need laws to act responsibly, while bad people will always find a way around the laws..’

পরিবার রাষ্ট্রের ক্ষুদ্রতম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একক। অপরাধ দমন ও প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় আইনি দায় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক দায়িত্ব নেওয়ার শিক্ষাও নাগরিকদের দিতে হবে। বেশিরভাগ দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধ সংঘটিত হয় দাম্পত্য সঙ্গী, সন্তান এবং পরিবারের সদস্যদের বিলাস ও আরাম-আয়েশের নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য। দেখা যায়, বেশিরভাগ প্রমাণিত ও দণ্ডিত দুর্নীতিবাজের দুর্নীতিলব্ধ সম্পদ সঞ্চিত করা থাকে স্ত্রীর নামেই। স্ত্রীর সম্মতি ও সহায়তা ব্যতীত কোন স্বামীর পক্ষে দুর্নীতি করে সম্পদের পাহাড় গড়া প্রায় অসম্ভব, সন্তানরা না চাইলে একজন পিতার পক্ষে দুর্নীতি করা খুব কঠিন। দাম্পত্য জীবনে আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্গতিহীন সঙ্গীর সাহচর্য বর্জনের সিদ্ধান্ত নিলে দুর্নীতি বহুলাংশে লোপ পাবে।

একজন সৎ দাম্পত্য সঙ্গীর চেয়ে বড় কোন দুর্নীতি দমন কমিশন পৃথিবীতে নেই।

সাঈদ আহসান খালিদ: সহকারী অধ্যাপক; আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।