নামজারি আইন ও নামজারি মামলা নিয়ে হাইকোর্ট বিভাগের কিছু নির্দেশনা

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ১৫ অক্টোবর, ২০২০ ১২:৩৫ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সাব্বির এ মুকীম

সাব্বির এ মুকীম: আইন করার কাজ মহামান্য সংসদের। কিন্তু যখনই মহামান্য উচ্চ আদালত সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা বলেই মহামান্য সংসদের করা আইনে হাত দেন, তাকে জনপ্রিয় ভাষায় বলে জুডিশিয়াল রিভিউ অব লেজিসলেশন। সংবিধান নিয়ে, ফৌজদারী আইন নিয়ে, মানবাধিকার নিয়ে, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা ও বিস্তৃতি নিয়ে জুডিশিয়াল রিভিউগুলো আইনপাঠে বেশ লোকপ্রিয় বিষয়। কিন্তু কোনো ভূমি সংশ্লিষ্ট আইনকে নিয়েও যে জুডিশিয়াল রিভিউ হতে পারে তা আমাদের দেশের আইন পাঠে অনেকটাই কম পরিচিত।

প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর বিধান মতে জমা বন্দি অথবা জমা ভাগ করে জমি সংক্রান্ত নামজারি করা হয়, প্রচলিত ভাষায় যাকে মিউটেশন বা খারিজ খতিয়ান লিপি বলে জানা হয়ে থাকে। আইনের গুরুগম্ভীর আলোচনায় নামজারি খুব একটা জনপ্রিয় বিষয় নয় বরং আইন আলোচনার চত্বরে নামজারি অনেকটাই ব্রাত্য। তবে সংখ্যা হিসেব করলে আইনগত বিরোধে নামজারি সংক্রান্ত কার্যক্রম সবচে জনকেন্দ্রীক- ভূমি সংক্রান্ত ক্ষেত্রে খুব প্রাথমিক আইনগত প্রতিকার বিধায় বলেই হয়তো।

বিষয়টি আইন সংশ্লিষ্ট কিন্তু তারচেও বেশী জন সংশ্লিষ্ট বিবেচনায় হয়তো বিচার পরিমন্ডলের অনেক আনুষ্ঠানিক আচারের আওতা হতে নামজারি কার্যক্রমকে মুক্ত রাখা হয়েছে। উদাহরণ স্বরুপ নামজারি কার্যক্রমে আইনজীবীদের জন্য গাউন পরা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। সিভিল রুলস এন্ড অর্ডার (ভলিউম ১) এর ৮২৬ নং বিধির ৩নং নোটে এই ব্যাতিক্রম করার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

নামজারির জন্য আবেদন করা হয় সংশ্লিষ্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) দপ্তরে। মাননীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর আদেশের বিরুদ্ধে যেতে হয় জেলা প্রশাসকের দপ্তরে। মাননীয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এর আদেশের বিরুদ্ধে যেতে হয় বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে। এরপরও সংক্ষুব্ধ হলে যেতে হবে ভূমি আপিল বোর্ডে।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) দপ্তরে ১ম পক্ষ হিসাবে নামজারির জন্য আবেদনের সময় স্বার্থ থাকতে পারে এমন সকলকে ২য় পক্ষ করতে হয়। তহশিলদারকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। তহশিলদারের প্রতিবেদন এবং পক্ষগণের দাবী বিবেচনায় নিয়ে মাননীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।

চাঁদপুরের মাননীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) সে দপ্তরের ৪১৯১/২০১১-১২ নং নামজারি আবেদন, ৫৮২৪/২০১১-১২ নং নামজারি আবেদন এবং ৫৮২৫/২০১১-২০১২ নং নামজারি আবেদনে আবেদনকারীদের নামে স্ব স্ব আবেদনের বিপরীতে মোট তিনটি নামজারি খতিয়ান লিপির সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। আদেশের পর নতুন এক পক্ষ সহকারী কমিশনার (ভূমি) দপ্তরে ঐ তিনটি নামজারি খতিয়ান লিপির বিরুদ্ধে আপত্তি উল্লেখ করে লিখিত দরখাস্ত দাখিল করেন। সে লিখিত দরখাস্তকে মাননীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি), চাঁদপুর তাঁর দপ্তরের ১৫৪/২০১২-১৩ নং নামজারি রিভিউ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সকল পক্ষের বক্তব্য শুনে পূর্বের তিনটি খারিজ খতিয়ান লিপির আদেশ বাতিল করেন। তিনটি খারিজ খতিয়ান লিপি বাতিলের এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল হয় এবং আপিল মঞ্জুরক্রমে তিনটি খারিজ খতিয়ান লিপির আদেশ পুনরায় বহাল হয়। আপিল আদেশের বিরুদ্ধে সেই নতুন পক্ষ মাননীয় জেলা প্রশাসকের বরাবের আপত্তি সহকারে পূর্নবিবেচনার আবেদন করলে সে আপত্তিকে ৩২/২০১৩ নং নামজারি আপিল হিসেবে গ্রহণ করে তিন নামজারী পক্ষর বিরুদ্ধে সমন নোটিশ জারী হয়। সেই সমন নোটিশ এবং সমন নোটিশের বয়ানের ভিত্তিতে ৫৮২৫/২০১১-২০১২ নং নামজারি আবেদনে আবেদনকারীদের একজন মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে এক রিট দায়ের করেন।

বিগত ২৭-০৪-২০১৫ ইং তারিখে বিচারপতি মোঃ এমদাদুল হক এবং বিচারপতি খুরশিদ আলম সরকার উক্ত রিট এ রায় প্রদান করেন। ৬৭ ডিএলআর (২০১৫) হাইকোর্ট বিভাগ এর ৫৫৪ পৃষ্ঠায় ছাপা হওয়া জাহাঙ্গীর মাজি বনাম সরকার ও অন্যান্য শিরোনামে বিচারপতি খুরশিদ আলম সরকারের লিখিত সে রিট এর রায়ে নামজারি সংক্রান্ত আইন তথা প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এ কিছু সংশোধন করেন ও নামজারি মামলা সংক্রান্ত গাইডলাইন প্রদান করেন।

প্রজাস্বত্ব আইনের ১৫০ নং ধারার (২) ধারায় সংশোধন আনা হয়। সংশাধনের আগে পুরোনো ধারাটি ছিলো এমনতরঃ-

No Appeal shall lie from an order rejecting an application for review or confirming on a review or confirming on a review any previous order.

Confirming শব্দটি কর্তন করে তাহা Reversing শব্দটি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয় এবং সংশোধিত হয়ে ধারাটি দাঁড়ায়-

No Appeal shall lie from an order rejecting an application for review or reversing on a review or confirming on a review any previous order.

এই রিভিউ কে আইনের ছাপার ভুল বা করণিক ভুল সংশোধন এর নিমিত্তে জুডিশিয়াল রিভিউ হিসেবে বিবৃত করে আলোচ্য রায়ে এমনতর জুডিশিয়াল রিভিউ করার জন্য বিজ্ঞ আদালতের ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রমান দিতে গিয়ে বিজ্ঞ আদালত বিভিন্ন দেশী ও বিদেশী নজির টানেন। বিজ্ঞ আদালত নিজের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার বিবরণও দেন রায়ের ৪১ প্যারায় এই বলে যে, সংসদের কোনো আইনের এমনকী ১টি শব্দ পরিবর্তনের ক্ষমতাও আদালতের নাই। তবে আলোচ্য ক্ষেত্রে পরিবর্তিত শব্দটির পরিবর্তন আদতে সংসদের প্রণীত আইনের ব্যাখ্যায় নিশ্চিত অস্পষ্টতাকে সংসদের ইচ্ছের আলোকে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আবার রায়ের ৪৫ প্যারায় এই পরিবর্তনকে সংসদের আইন হিসেবে পরিণত করার বা নতুন আইন প্রণয়ন করার সংসদীয় ক্ষমতাকে পূর্ণ স্বাধীনতাকে পুনরায় ঘোষণা করা হয়।

এই রায়ে নামজারি সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে যে গাইড লাইন প্রদান করা হয়, তার সারমর্ম নীচে দেয়া হলো:

(১) প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর ১৫০ ধারায় প্রদত্ত রিভিউ এর ক্ষমতা কেবল এবং কেবল মাত্র সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর।

(২) রিভিউ করার ক্ষমতা জেলা প্রশাসকের ও নেই, বিভাগীয় কমিশনারেরও নেই এমনকী ভূমি আপিল বোর্ডের নেই। তবে প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এ ভূমি আপিল বোর্ড সর্বোচ্চ ফোরাম হওয়ায় ভূমি আপিল বোর্ডের নিজের সিদ্ধান্ত নিজে রিভিউ করার ক্ষমতা রাখেন কিন্তু নীচের কোনো কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত ভূমি আপিল বোর্ডে রিভিউ হবে না।

(৩) রিভিউ এর ক্ষমতা না থাকা স্বত্বেও কোনো কর্তৃপক্ষ রিভিউ আদেশ করে ফেললে প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ এর ১৪৭ ধারা মোতবেক সে কর্তৃপক্ষের পরবর্তি উচ্চতর কর্তৃপক্ষ একই আইনের ১৪৯ ধারায় প্রদত্ত রিভিশন ক্ষমতা বলে সে ভুল সংশোধন করবেন।

(৪) জেলা প্রশাসকগন যখনই সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর কোনো নামজারি আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্দ পক্ষের দরখাস্ত পাবেন সে দরখাস্তকে প্রযোজ্য ক্ষেত্র মোতাবেক আপিল অথবা রিভিশন হিসাবে গ্রহণ করবেন। দরখাস্ত যদি সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর নামজারি আদেশের বিরুদ্ধে হয় তবে জেলা প্রশাসক তা আপিল হিসেবে নিবেন। আর দরখাস্ত যদি সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর নামজারি-রিভিউ আদেশের বিরুদ্ধে হয় তবে জেলা প্রশাসক তা রিভিশন হিসেবে নিবেন।

(৫) বিভাগীয় কমিশনারগণ যখনই জেলা প্রশাসকের এর কোনো নামজারি সংক্রান্ত আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্দ পক্ষের দরখাস্ত পাবেন সে দরখাস্তকে প্রযোজ্য ক্ষেত্র মোতাবেক আপিল অথবা রিভিশন হিসাবে গ্রহণ করবেন। দরখাস্ত যদি জেলা প্রশাসকের এর নামজারি-আপিল আদেশের বিরুদ্ধে হয় তবে বিভাগীয় কমিশনার তা আপিল হিসেবে নিবেন। আর দরখাস্ত যদি জেলা প্রশাসকের এর নামজারি-রিভিশন আদেশের বিরুদ্ধে হয় তবে জেলা প্রশাসক তা রিভিশন হিসেবে নিবেন।

(৬) ভূমি আপিল বোর্ডে যখনই বিভাগীয় কমিশনারের এর কোনো নামজারি সংক্রান্ত আদেশের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্দ পক্ষের দরখাস্ত পাবেন সে দরখাস্তকে প্রযোজ্য ক্ষেত্র মোতাবেক আপিল অথবা রিভিশন হিসাবে গ্রহণ করবেন। দরখাস্ত যদি বিভাগীয় কমিশনারের এর নামজারি-আপিল আদেশের বিরুদ্ধে হয় তবে ভূমি আপিল বোর্ডে তা আপিল হিসেবে নিবেন। আর দরখাস্ত যদি বিভাগীয় কমিশনার এর নামজারি-রিভিশন আদেশের বিরুদ্ধে হয় তবে ভূমি আপিল বোর্ডে তা রিভিশন হিসেবে নিবেন।

(৭) রায়ের প্যারা ৪৯ এর মর্ম মোতাবেক সংক্ষুব্ধ পক্ষ যেকোনো আদেশের বিরুদ্ধে ১৪৭ ধারা মোতাবেক উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নিকট আপিল করতে পারবে। কিন্তু যদি আইনের ১৫০ ধারা মোতাবেক সহকারী কমিশনার (ভূমি) বরাবরে রিভিউ করে বসে তবে সংক্ষুব্ধ পক্ষ সে রিভিউ আদেশেও সংক্ষুব্ধ হয়ে উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবে না, পূর্বে বর্ণিত মতেই রিভিউ ও করতে পারবে না, কেবল এবং কেবল মাত্র রিভিশন করতে পারবে। অর্থাৎ আপিল রিভিশন আদেশের বিরুদ্ধে কেবল উচ্চতর কর্তৃপক্ষের নিকট রিভিশনই করা যাবে, আপিল নয়। আপিল করতে হলে নিম্নতর কর্তৃপক্ষের আদেশ কোনোভাবেই রিভিশন আদেশ হতে পারবে না। একবার রিভিশন ফোরামে চলে গেলে কোনো আপিল চলবে না।

(৮) রায়ের প্যারা ২২ মোতাবেক যদিও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ আইনের ১৪৭ অনুচ্ছেদে ভূমি প্রশাসন বোর্ড এর কথা বলা আছে কিন্তু বাস্তবে এই নামে কোনো সংস্থা নেই। বরং আইন করে এই ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে ভূমি আপিল বোর্ডকে। তাই সংসদ কর্তৃক সংশোধনের আগ পর্যন্ত ভূমি আপিল বোর্ডকে ১৪৭ ধারার ভূমি প্রশাসন বোর্ড হিসেবে ধরে নেয়া হবে।

(৯) প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ আইনে খতিয়ান সংক্রান্ত সর্বোচ্চ ফোরাম হওয়ায় ভূমি আপিল বোর্ড খতিয়ান সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।

উপরোক্ত নীতিগুলোর আলোকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) চাঁদপুরের ১৫৪/২০১২-১৩ নং নামজারি রিভিউ এর বিরুদ্ধে জেলাপ্রশাসক দপ্তরে দায়ের করা আপিল টি প্রকৃতপক্ষে আপিল নয় বরং রিভিশন। তাই সে রিভিশনের আদেশর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত জেলা প্রশাসক দপ্তরেই দায়েরকৃত ৩২/২০১৩ নং নামজারি আপিলটি প্রকৃতপক্ষে নামজারি রিভিউ যার এখ্তিয়ার নেই জেলা প্রশাসকের। সংক্ষুব্ধ পক্ষের বরং উচ্চতর কতৃপক্ষের নিকট রিভিশন করা উচিত ছিলো। এই আলোকে আলোচ্য ৩২/২০১৩ নং নামজারি আপিল এ প্রদত্ত সমন নোটিশকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়।

সাব্বির এ মুকীম: আইনজীবী; কুমিল্লা জজ কোর্ট। ই-মেইল: samukim1@gmail.com