ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৮ ধারায় মামলা অচল, অবৈধ!

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২০ অক্টোবর, ২০২০ ৮:৪৬ অপরাহ্ণ
অ্যাডভোকেট সাব্বির এ মুকীম

সাব্বির এ মুকীম: এগারো (১১তম) সুপ্রীম কোর্ট অনলাইন বুলেটিন (২০১৯) হাইকোর্ট ডিভিশনের ১০২নং পৃষ্ঠা হতে ছাপা হওয়া মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনের ২০১৫ইং সনের ৩২০৯৮ নং ফৌজদারী বিবিধ মামলায় বিচারপতি মোঃ রেজাউল হাসানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চের প্রদত্ত রায়ের ২৬তম প্যারায় রায়ের অথর জাজ বিচারপতি কাশেফা হোসেন লিখেছেন:

“We are of the considered view that an application under section 98 of the Code of Criminal Procedure not being isolatedly entertainable or lawfully maintainable at all, therefore in this case the application filed under section 98 of the Code of Criminal Procedure before the Magistrate Court is not maintainable and is liable to be dismissed not being sustainable in the eye of law.”

এছাড়াও ১৯ প্যারায় লিখেছেন:

Accordingly, upon scrutiny into Section 98 and after scanning through the preceding sections under Chapter VII including other provisions of the Code, and after an understanding into the meaning and intention of the statute, we are of the considered view that the law as it exists does not provide any scope to file or initiate a separate case or proceeding in an isolated manner under Section 98 in the absence of a pending case or proceeding filed in pursuance of an FIR or complaint whatsoever under any of the provisions of the Penal Code”

সারমর্ম বঙ্গানুবাদ হলো ফৌজদারি কার্যবিধির ৯৮ ধারা মোতাবেক কোনো মামলা রক্ষনীয় নয়, তাই ৯৮ ধারার মামলা অবৈধ, অচল। কেবল মাত্র চলমান কোনো মামলায় ৯৮ ধারায় দরখাস্ত দেয়া যাবে।

আইন প্র্যাকটিসের অভিজাত অঙ্গনে ৯৮ ধারার মামলা ম্লেচ্ছ, যবণ, অতীব আতরাফ শ্রেনীর। ৯৮ ধারা নিয়ে কোনো আইনী আলাপ শোনা যায় না বললেই হয়। তবে বটতলা, হাটে, মাঠে, ঘাটের আইন প্র্যাকটিসে ৯৮ধারার মামলা ‍বহুল চর্চিত। লোক শ্রুতিতে ৯৮ ধারার মামলা মূলত উদ্ধারের মামলা হিসেবে পরিচিত এবং ৯৮ধারার মামলা মানেই হলো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের মামলা।

স্বামী-স্ত্রী আলাদা থাকে এবং দুধের শিশুকে স্বামী নিয়ে গেছে, স্ত্রীকে দিয়ে ঐ শিশু উদ্ধারে ৯৮ ধারায় মামলা হয়। ৯৮ ধারার মামলা মাঠে বেশ দ্রুত প্রতিকার দিচ্ছে বলে দেখা যায়। একপক্ষ জোর কোরে ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, চেক এমনকী সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়ে গেছে, সংক্ষুব্ধ পক্ষকে দিয়ে সেসব উদ্ধারে ৯৮ ধারায় মামলা করিয়ে দেয়া হয়। আলোচ্য মামলায় মূল মামলা করা হয়েছিলো ঐ ৯৮ ধারাতেই- গাড়ী উদ্ধারের জন্য।

ঘটনা সংক্ষেপ এমনতর
আবদুর রহিম নামীয় এক ব্যক্তি ফরিয়াদী হয়ে মোঃ মাহতাব হোসেন মোল্লাকে অভিযুক্ত করে ২০১৪ সালের ২৪ মার্চ বরগুনার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ৯৮ ধারায় এক নালিশ দায়ের করেন। নালিশে ফরিয়াদী বলেন, ব্যাংক থেকে তিনি ঢাকা-মেট্রো-চ-১৩-৫৪৫৫ নম্বরের প্রাইভেট কারটি কিনেন। নালিশ দায়েরের দিন অবধি ব্যাংকের নিকট তিনি ২ লক্ষ ৪ হাজার টাকা ঐ গাড়ী বাবদ দেনা। ফরিয়াদী ২রা নভেম্বর, ২০১৩ ইং তারিখে ৬০ হাজার টাকা মাসিক ভাড়ায় গাড়ীটি অভিযুক্তর নিকট হস্তান্তর করেন।

এরপর ২রা ফেব্রুয়ারী, ২০১৪ ইং তারিখে বরগুনার টাউন হল রোডস্থ ফরিয়াদীর বাড়ীতে ফরিয়াদী নালিশী গাড়ীটি এনে রাখেন। সেদিনই অভিযুক্ত ফরিয়াদীর নিকট হতে গাড়ীটি ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে অভিযুক্তের নিজের জিম্মায় রাখে। বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ২০০ ধারায় ফরিয়াদীর জবানবন্দি নেন এবং ফরিয়াদীর নালিশ ২০১৪ সালের ২১১ নং বিবিধ (৯৮ ধারার) মামলা হিসেবে গৃহীত হয়। বিজ্ঞ আদালত বরগুনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) নালিশী গাড়ীর মালিকানা সংক্রান্ত তথ্যসহ তদন্ত প্রতিবেদন দিতে আদেশ দেন। অভিযুক্ত সমন পায়। ১০ই এপ্রিল, ২০১৪ ইং তারিখে ওসি, বরগুনা সদর থানা তাঁর প্রতিবেদন বিজ্ঞ আদালতে দাখিল করেন। অভিযুক্ত মামলা হতে অব্যাহতি প্রার্থনা করে।

২রা জুন ২০১৪ইং তারিখে বিজ্ঞ আদালত উভয় পক্ষের শুনানী গ্রহণ করে নথি পর্যালোচনাক্রমে অভিযুক্তের পক্ষে রায় প্রদান করেন। বিজ্ঞ আদালত নালিশী গাড়ীর প্রকৃত মালিক জনৈক আবুল কালাম আজাদ হতে অভিযুক্ত ঐ গাড়ীটি কিনেছেন মর্মে সিদ্ধান্ত নেন এবং ওসি, বরগুনা সদর থানাকে নির্দেশ দেন নালিশী গাড়ীটি অভিযুক্ত বরাবরে হস্তান্তর করতে।

ফরিয়াদী এই আদেশের বিরুদ্ধে বগুড়া দায়রা (সেশন) আদালতে ২০১৪ সনের ৬৯ নং ফৌজদারী রিভিশন দায়ের করেন। বগুড়ার বিজ্ঞ এডিশনাল সেশন জজ বিগত ২৫শে জুন ২০১৫ইং তারিখের সে রিভিশনের রায়ে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন এবং ওসি, বরগুনা সদর থানাকে নালিশী গাড়ীটি ফরিয়াদীর নিকট হস্তান্তর করার আদেশ দেন।

রিভিশন আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে আলোচ্য ফৌজদারী বিবিধ মামলাটি দায়ের করেন। এ মামলায় বিজ্ঞ হাইকোর্ট ডিভিশন কেবল রিভিশন আদেশটিই বাতিল করেননি বরং মূল মামলাটিও তথা নিম্ন আদালতের মামলাটিও অচল, অরক্ষনীয় ঘোষণা করেন। নালিশী গাড়িটি আদেশের ১০ দিনের মধ্যে অভিযুক্ত বরাবরে হস্তান্তর করতে ওসি, বরগুনা সদর থানাকে আদেশ দেন। অগভীর পর্যালোচনায় বিজ্ঞ হাইকোর্ট বিভাগ রিভিশন আদেশ বাতিল করে নিম্ন আদালতের আদেশ পুনরায় বহাল করেছেন বলে মনে হলেও আদতে বিজ্ঞ হাইকোর্ট পুরো মামলাটা শুরু হতেই বাতিল করে দিয়েছেন।

উভয় নিম্ন আদালত ল’ পয়েন্টে না গিয়ে কেবল মাত্র ফ্যাক্ট এর উপর ভিত্তি করে স্বীয় স্বীয় আদেশ প্রদান করায় বিজ্ঞ হাইকোর্ট ডিভিশন রায়ের ২৫ প্যারায় সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের প্রতি এবং ২৫ ও ২৯ প্যারাদ্বয়ে সংশ্লিষ্ট রিভিশন আদালতের প্রতি মৃদু এবং পরোক্ষ উষ্মা প্রকাশ করেন।

এই রায়ে ৯৮ ধারায় দরখাস্ত করতে হলে বিজ্ঞ হাইকোর্ট নিম্ন লিখিত উপাদানের উপস্থিতির বিধান দেন।

  • আগে হতেই চলমান একটি মামলা থাকতে হবে; সে মামলা জিআর মামলাও হতে পারে অথবা সিআর মামলাও হতে পারে।
  • দরখাস্তের বিষয়বস্তু চুরির অথবা জাল-জালিয়াতির হতে হবে।
  • দরখাস্তটি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট বা ৯৮ ধারার ক্ষমতা সম্পন্ন বিচারিক হাকিমের আদালতে করতে হবে।

শেষ পয়েন্টটি রায়ের ২০ প্যারা হতে প্রাপ্ত। প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে আলোচ্য ৯৮ ধারায় সুস্পষ্টভাবে কেবল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ডিসট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কথা বলা হয়েছে, বিচারিক হাকিমদের কথা স্পষ্টভাবেই ৯৮ ধারায় অনুপস্থিত।

আলোচ্য বিরোধে নালিশী গাড়ীটি চুরির গাড়ী ছিলো না। নালিশের কোথাও কিংবা পুলিশ প্রতিবেদনে নালিশী গাড়ীকে চুরির গাড়ী বলা হয়নি। তাই নালিশী গাড়ী নিয়ে কোনো ভাবেই ৯৮ ধারায় এমনকি দরখাস্তও চলে না। এক্ষেত্রেও বিজ্ঞ হাইকোর্ট ডিভিশন সমাধান দেন এবং তা হলো ফৌজদারী কার্যবিধির ৫১৬ (এ) ধারা এবং ৫১৭ ধারায় দরখাস্ত; সে দরখাস্তর ক্ষেত্রেও বিজ্ঞ হাইকোর্ট নিম্ন লিখিত উপাদানের উপস্থিতির বিধান দেন।

  • আগে হতেই চলমান একটি মামলা থাকতে হবে; সে মামলা জিআর মামলাও হতে পারে অথবা সিআর মামলাও হতে পারে।
  • মামলাটি ফৌজদারী কার্যবিধির ৬(১) ধারা মোতাবেক প্রতিষ্ঠিত ফৌজদারী আদালতে চলমান থাকতে হবে।
  • বিজ্ঞ আদালতের ৫১৬ (এ) এবং ৫১৭ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা থাকতে হবে।
  • দরখাস্তের বিষয়বস্তু উক্ত চলমান মামলায় নালিশকৃত অভিযোগ সংশ্লিষ্ট হতে হবে।

এই সিদ্ধান্তে বিজ্ঞ হাইকোর্ট ডিভিশনের মূল যুক্তি ছিলো ফৌজদারী কার্যবিধি একটি প্রক্রিয়াগত আইন। আর মোকাদ্দমা হয় মূল আইনে এবং কেবল ও কেবল মাত্র মূল আইনে। কেবল এবং কেবল মাত্র প্রক্রিয়াগত আইনে কোনো মামলা করা যায় না, কেবল চলমান মামলায় দরখাস্ত করা যায়।

এই মামলায় অভিযুক্ত পক্ষে নিযুক্তীয় বিজ্ঞ আইনজীবী যুক্তিতর্কের একপর্যায়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ৯৮ ধারার দরখাস্ত নেয়ার ক্ষমতা নেই মর্মে দাবী করেন এই যুক্তিতে যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রকৃত ফৌজদারী আদালত নয়। এই দাবীর ব্যাপারে বিজ্ঞ আদালত রায়ের ৩০ প্যারায় বলেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আসলেই ফৌজদারী আদালত কী না তা আলোচ্য মামলার বিচার্য বিষয় নয়। সঠিক ফোরামে সঠিক পন্থায় সে দাবী উত্থাপিত হলে বিজ্ঞ হাইকোর্ট বিভাগ অবশ্যই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়ারের সীমা (আলোচ্য রায়ে ফৌজদারী সংক্রান্ত) নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতেন।

আমার কাছে এর একটা মানে হলো দৈনন্দিন আইন প্র্যাকটিসে ৯৮ ধারা খুব তুচ্ছ হিসেবে অনুভূত হলেও ভবিষ্যতে হয়তো এই ৯৮ ধারাকে কেন্দ্র করেই এক বিপুল এসপার-ওসপার করা সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত হবে।

সাব্বির এ মুকীম: আইনজীবী; কুমিল্লা জজ কোর্ট। ই-মেইল: samukim1@gmail.com