উপার্জিত অর্থ ব্যয় করেছেন সমাজসেবায়, সম্মানী নেননি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবেও

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ২৫ অক্টোবর, ২০২০ ১০:৫১ পূর্বাহ্ণ
প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিক-উল হক

দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে আলো ছড়িয়েছেন আইন পেশায়। ছিলেন আইনের শাসনের প্রতি আপসহীন। ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ন্যায়ের পথে ছিলেন সারা জীবন। আইনজীবীদের আদর্শ তিনি, ছিলেন সবার অভিভাবকও। সুখে দুঃখে সবাইকে সাথে নিয়েই চলেছেন। পেশাগত জীবনে অত্যন্ত সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও খ্যাতিমান আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক।

গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে তিনি আদালতকে সবসময় সহযোগিতা করেছেন। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যারিস্টার রফিক উল হক একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। আইনের শাসন এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর মৃত্যুতে দেশের আইন অঙ্গনে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো। বাংলাদেশের আইন পেশায় তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

১৯৯০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা তথা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন প্রয়াত এই আইনজীবী। কিন্তু অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে কোনো সম্মানী নেননি সদ্য প্রয়াত এ আইনজীবী। পেশাগত জীবনে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও সম্পৃক্ত হননি।

তবে, নানা সময়ে দেশের উচ্চ পর্যায়ের রাজনীতিবিদরা সবসময় তাকে পাশে পেয়েছেন। রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে সবসময়ই সম্মান পেয়েছেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। তার জীবনের উপার্জিত অর্থের একটা বড় অংশই ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণ ও সমাজসেবায়। তার এসব উদ্যোগকে বিরল বলে অ্যাখ্যায়িত করেছেন আইন অঙ্গনের অনেকেই।

প্রয়াত ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সামাজিক পরিচয় ছিল আইনের প্রাজ্ঞ বিচারক হিসেবে। একজন মানবতাবাদী আইনজীবী হিসেবেও তার বিশেষ খ্যাতি ছিল। এছাড়া বাংলাদেশের অন্যতম বিখ্যাত মানুষও তিনি। তবু সবকিছু ছাপিয়ে তার মানবিক ও সেবা-মনোভাবের অসামান্য গুণটি সামনে চলে আসে। তিনি তার জীবনের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণে। তার কাজ ও ভাবনায় একটি সমৃদ্ধ ও স্নিগ্ধ রুচির ছাপ পাওয়া যায়।

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক জীবনের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবই ব্যয় করেছেন সমাজসেবায়। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মানবতার সেবায়। বলতে গেলে তেমন টাকাপয়সা রাখেননি ব্যাংকে। তার জীবনের বড় ইচ্ছাই মানুষের সেবা করা; সেই লক্ষ্য থেকেই প্রতিষ্ঠা করেছেন বেশ কয়েকটি হাসপাতাল, এতিমখানা, মসজিদ ও মেডিকেল কলেজ।

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে একটি ১০০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করছেন। এছাড়া ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেছেন সুবর্ণ ক্লিনিক; ঢাকা শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায়ও ভূমিকা রাখেন তিনি। বারডেম হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ ও নূরজাহান ওয়ার্ড, আহছানিয়া মিশন ক্যান্সার হাসপাতালের চেয়ারম্যান, আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান রফিক-উল হক।

আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ ২৫টিরও বেশি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সরাসরি জড়িত। বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে আর্থিক অনুদানসহ নানা সহযোগিতা দিয়ে গেছেন।

ব্যারিস্টার রফিক উল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২ নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে এলএলবি পাশ করেন। ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে বার অ্যাট ল’ সম্পন্ন করেন। ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন।

বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করতে আইনি লড়াই করেন তিনি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় বরাবরই সোচ্চার রফিক উল হক। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন বর্ষীয়ান এই আইনজীবী।

জ্যেষ্ঠ আই আইনজীবীর বাবা মুমিন-উল হক পেশায় ছিলেন চিকিৎসক। মা নূরজাহান বেগম। ২০১১ সালে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চিকিৎসক স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিমুল হকও আইন পেশায় রয়েছেন।

উল্লেখ্য, শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর আদ-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এ আইনজীবী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।

রফিক-উল হকের প্রথম জানাজা আদ্-দ্বীন হাসপাতালে অনুষ্ঠিত হয়। ওই হাসপাতালের চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রথম জানাজায় ইমামতি করেন আদ্-দ্বীন জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ সাইদুল ইসলাম।

এরপর মরদেহ পল্টনের বাড়িতে নেয়া হয়। সেখান থেকে বায়তুল মোকাররমে নেয়ার পর অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জানাজা। শনিবার দুপুর ২টায় তার ৬০ বছরের বেশি সময়ের কর্মস্থল সুপ্রিমকোর্ট প্রাঙ্গণে তৃতীয় জানাজা হয়।

জানাজা শেষে তার মরদেহ বনানী কবরস্থানে নেয়া হয়। এ সময় বিপুলসংখ্যক আইনজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাকে শেষ বিদায় জানান।