বাল্যবিবাহ রোধ : পাঠ্যবইয়ে এখনো পুরোনো আইন!

প্রতিবেদক : ল'ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ
প্রকাশিত: ৯ জানুয়ারি, ২০১৮ ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ

বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সরকার গত বছর বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন করেছে। এ আইনের মাধ্যমে ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত আইনটি রহিত করা হয়েছে। তবে চলতি বছরের সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইতে পুরোনো আইন এবং এ আইন অনুযায়ী বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে জরিমানা ১ হাজার টাকাই বহাল আছে। অথচ নতুন আইনে তা ১ লাখ টাকা।

এ ছাড়া পাঠ্যবইয়ে বাল্যবিবাহের শাস্তি এক মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ডের কথা উল্লেখ থাকলেও নতুন আইনে তা অনধিক দুই বছর করা হয়েছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) এই পাঠ্যবইয়ের প্রথম প্রকাশ ২০১১ সালের অক্টোবরে। এরপর ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর এবং সর্বশেষ ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে পরিমার্জিত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। অন্যদিকে সরকারের নতুন আইনটি গেজেট আকারে প্রকাশ পেয়েছে গত বছরের ১১ মার্চ।

নতুন আইনে অপ্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ (২১ বছর পূর্ণ না হওয়া পুরুষ) এবং নারীর (১৮ বছর পূর্ণ হয়নি এমন নারী) বিবাহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ১৯২৯ সালের আইনেও ছেলে ও মেয়ের বিয়ের বয়স একই ছিল। নতুন আইনে বাল্যবিবাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সাজার পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে।

এনসিটিবির চোখে নতুন আইনের বিষয়টি ধরা পড়েনি। জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘পাঠ্যপুস্তক প্রতিবছর হালনাগাদ করা হয় না। আইনের বিষয়টি দেখব, প্রয়োজন হলে সংযোজন, পরিমার্জন করে দেব।’

এনসিটিবির পঞ্চম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ে নারী অধিকার লঙ্ঘনবিষয়ক অধ্যায়ে বলা হয়েছে, নির্যাতন দমনের জন্য ২০১২ সালে সরকার জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি করেছে। তবে সঠিক তথ্য হলো, সরকার নীতিটি করেছে ২০১১ সালে। দুই বছর আগে প্রথম আলোতেই এ নিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশ করা হয়। এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ তখনো আশ্বাস দিয়েছিল বিষয়টি সংশোধন করার। তবে ২০১৮ শিক্ষাবর্ষের জন্য ছাপানো বইয়ে ভুল তথ্যই দেওয়া আছে।

সপ্তম শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের ‘বাংলাদেশের সামাজিক সমস্যা’ বিষয়ক দশম অধ্যায়ে যৌতুক ও বাল্যবিবাহ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অধ্যায় পাঠ শেষে শিক্ষার্থীরা বাল্যবিবাহের ধারণা, প্রভাব, প্রতিরোধে করণীয় এবং বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটি ব্যাখ্যা করতে পারবে। অথচ এতে নতুন আইন নিয়ে কিছুই বলা হয়নি। এ অধ্যায়ে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে শিশু-কিশোরদের উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, কেননা শিক্ষিত হলে তারা সচেতন হবে এবং বাল্যবিবাহের কুফল সম্পর্কে ধারণা লাভ করবে।

এ অধ্যায়ে বাল্যবিবাহের পেছনে বিভিন্ন কারণের মধ্যে যৌতুককে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এতে বলা হয়েছে, ‘যৌতুকের ক্ষেত্রেও অনেক ছেলের বাবা কিশোরী কন্যাকে ঘরের বউ হিসেবে গ্রহণ করে।’ তবে গত বছর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পপুলেশন কাউন্সিলের এক ভিত্তি জরিপে বলা হয়েছে, মেয়ের বয়স কম থাকলে যৌতুকের পরিমাণও কমে। তাই অভিভাবকেরা কম বয়সে মেয়েকে বিয়ে দিতে উৎসাহী হন।

পাঠ্যবইতে পুরোনো আইনের তথ্য বহাল থাকা সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কমিশনের পক্ষ থেকে বইটি দেখে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে কড়া ভাষায় চিঠি দেব। আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি, সেখানে এ অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।’

সরকার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে প্রচারের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০১৪ সালে ইংল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড গাল৴সামিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে বাল্যবিবাহকে শূন্য করা, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের বাল্যবিবাহের হার এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহ পুরোপুরি নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছেন।

সরকার যেখানে প্রচারমাধ্যমে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিচ্ছে, সেখানে পাঠ্যবইয়ে বাল্যবিবাহ-সংক্রান্ত ভুল তথ্য কোনোভাবেই কাম্য নয় বলে উল্লেখ করেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনটির গুরুত্ব বিবেচনায় সম্প্রতি উচ্চ আদালত বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেন। গত ১৯ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন থেকে জারি করা এক পরিপত্রে বলা হয়েছে, বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় প্রণীত একটি বিশেষ আইন।  সূত্র : প্রথম আলো