নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাদের কৌশলে বিচারিক আকাংখা পুরন ও আইনি বিতর্ক

প্রতিবেদক : বার্তা কক্ষ
প্রকাশিত: ৩ আগস্ট, ২০২১ ৩:৫৮ অপরাহ্ণ
মোঃ আব্দুল বাতেন

মোঃ আব্দুল বাতেন: 

ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুসারে বিচার বিভাগ প্রশাসন/নির্বাহী বিভাগ থেকে আলাদা হবার পরে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। যেখানে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর থেকেই প্রশাসন/নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাগন তাদের হারানো বিচারিক ক্ষমতা ফিরে পেতে মরিয়া হয়ে উঠে। যা এখন ফৌজদারি বিচারিক ক্ষমতা পেরিয়ে দেওয়ানি বিচারিক ক্ষমতা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে চলছে। তবে এতে আইনী তর্ক বিতর্ক রয়েছে। নিম্নে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ফৌজদারি আকাংখা ও আইনি বিতর্ক:

বিগত ২০০৭ সালে বিচার বিভাগ পৃথক হওয়ার পর খাদ্যে ভেজাল-বিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাহি ম্যাজিষ্ট্রেটদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে মোবাইল কোর্ট অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২০০৯ সালে এটি আইনে পরিণত হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তথা ভ্রাম্যমান আদালতের কর্মকান্ড নিয়ে প্রায়ই হস্তক্ষেপ করতে হয় উচ্চ আদালতকে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের কার্যক্রম যখনই সংবিধান পরিপন্থি এবং প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে চলে যায়-তখনই সেটি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বিগত ২০১১ সালে ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদন্ড দেয়া হয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিক কামরুজ্জামান খানকে। মোবাইল কোর্টের দেয়া এ কারাদন্ড ভোগের ৬ দিন তিনি জামিনে মুক্তি পান। বেরিয়ে এসে তিনি মোবাইল কোর্ট অ্যাক্ট’র ৫ ধারা এবং ৬(১), ৬(২), ৬(৪), ৭, ৮(১), ৯, ১০, ১১, ১৩, ১৫ ধারা-উপধারা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেন। পরে আরো ১৯ সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি পৃথক আরো ৩টি রিট করেন। শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেন এবং পরে রুল চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ৫ মে মোবাইল কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। পরে সরকার লিভ টু আপিল করলে আদালত ২০১৮ সালের ৯ জানুয়ারি সরকারকে নিয়মিত আপিল করতে বলেন। আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মোবাইল কোর্ট চলবে-মর্মে আদেশ দেন। বাংলাদেশে মোবাইল কোর্ট এখন চলছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের স্থগিতাদেশ দিয়ে।

দেওয়ানি আকাংখা ও আইনি বিতর্ক:

দেওয়ানি আদালতে বেশির ভাগ মোকদ্দমা দায়ের হয় জমি জমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে। আবার জমি জমার মোকদ্দমার বেশির ভাগ হলো রেকর্ড সংশোধন সংক্রান্ত। প্রশাসন/নির্বাহী কর্মকর্তারা এবার রেকর্ড সংশোধনের মোকদ্দমার বিচার ও নিষ্পত্তি সুযোগ নিতে চাচ্ছে এবং কৌশলে এগোচ্ছে। গতো বৃহস্পতিবার (২৯ জুলাই) ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে একটি পরিপত্র জারি করা হয়।যাতে বলা হয়, “ভূমি জরিপের পর চূড়ান্তভাবে মুদ্রিত ও প্রকাশিত খতিয়ানের করণিক ভুল, প্রতারণামূলক লিখন এবং যথার্থ ভুল সংশোধন তথা রেকর্ড সংশোধন করবে এসিল্যান্ডদের (সহকারী কমিশনার-ভূমি)”।

তবে এতেও রয়েছে আইনী বিতর্ক।কারন জরিপ চলাকালিন সময়ে খতিয়ানে কোন ভুল ধরা পরলে তখন সেটেলমেন্ট অফিসারের নিকট রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ত্ব আইন -১৯৫০ এর ৩০ ধারা ও ৩১ ধারায় আপত্তি দাখিল করে খুব সহজেই ভুলগুলো সংশোধন করে নেওয়া যায়। কিন্তু যদি এই সময়ের মধ্যে ভুলগুলো সংশোধন করা না হয় এবং চূড়ান্ত খতিয়ান প্রকাশিত হয়ে যায় , তবে উক্ত খতিয়ান সংশোধনের ক্ষমতা আর সেটেলমেন্ট অফিসারের থাকে না। তখন এই খতিয়ান সংশোধন করার জন্য দেওয়ানি আদালতে মমোকদ্দমা দায়ের করতে হয়। এই সংক্রান্ত বিষয়ে উচ্চ আদালতের একাধিক সিদ্ধান্ত/নজির রয়েছে,যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি উল্লেখ করা হলো ,”Once the Record of Rights,whether it was prepared wrongly or rightly has already been published in official Gazette, the Respondents have no legal authority under section 144 of the Act, to cancel the same by any administrative order.The same can only be cancelled or altered or corrected by the competent court of civil jurisdiction.” 71 DLR (2019) 181

সুতরাং স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে এসি ল্যান্ড কর্তৃক রেকর্ড সংশোধনের ক্ষমতা দিয়ে জারি করা পরিপত্র নিয়ে উচ্চ আদালতে আইনগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া লাগতে পারে।যা দেওয়ানি মোকদ্দমা সংক্রান্ত বহু বিতর্ক অবসান করতে পারে।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।