টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না। টাকা দিলে কাজ হয় দ্রুতগতিতে। আদালতের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ নতুন নয়। বিশেষ করে অধস্তন আদালতে ‘ঘুষ’ নামের এই ভোগান্তির শিকার হাজার হাজার বিচারপ্রার্থী। তবে আদালতে দেওয়া ঘুষের এই টাকা কর্মচারীদের ভাষায় খরচাপাতি। খরচাপাতিড় মোড়োকে ঘুষের এই টাকাকে আদালতের কিছু কিছু উকিল, মুহুরি, পিয়ন, পেশকার ও পুলিশ কেউই ‘ঘুষ’ বলতে নারাজ। তাদের ভাষ্য- নির্বিঘে কাজ শেষ করতে ‘বকশিশ’ দিতে হয়।
আইনজীবী সমিতির বিতর্কিত রেজ্যুলেশন
দেশের মধ্যাঞ্চলের ঢাকা বিভাগের প্রশাসনিক অঞ্চল শরীয়তপুর জেলার আইনজীবী সমিতি তো রীতিমত বকশিশের নামে উৎকোচ দেওয়ার ‘মেন্যুকার্ড’ পাশ করেছে রেজ্যুলেশন করে। এমন একটি রেজ্যুলেশন ল’ইয়ার্স ক্লাব বাংলাদেশ ডটকমের হাতে এসেছে। যাতে শরীয়তপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভায় কোন কাজে, কাকে বকশিশের নামে কত উৎকোচ প্রদান করা হবে তা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট সুলতান হোসেন মিয়া সভাকক্ষে গত ৬ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জাহাঙ্গীর আলম কাশেমের সভাপতিত্বে সভা পরিচালনা করেন সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ কামরুল হাসান। সভায় এজেন্ডা ভিত্তিক আলোচনায় নির্বাহী কমিটির সকল সদস্য অংশগ্রহণ করেন। সভায় নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তসমূহ সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় –
১. পেশকার/পিয়নকে সি.আর ফাইলিং এ ১০০ টাকার বেশি দেওয়া যাবে না।
২. যেকোন দরখাস্ত জি.আর/সি.আর ১০০ টাকার বেশি দেওয়া যাবে না।
৩. জামিননামা দাখিলের খরচ মামলা প্রতি ১০০ টাকার কম না, আবার ২০০ তাকার বেশি দেওয়া যাবে না।
৪. গারদখানায় ওকালতনামা স্বাক্ষরে ১০০ টাকা, সিভিল ফাইলিং এ সর্বোচ্চ ২০০ টাকা ও হলফনামায় ১০০ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
খোদ আইনজীবী সমিতির এমন সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্টদের হতবাক করেছে। বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে তবে কি এখন থেকে আদালতের বিচারিক কার্যক্রমে কর্মচারীদের ঘুষ গ্রহণ একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেল? ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, বিচারালয়সহ নানা অঙ্গনে লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। কিন্তু আদালতপাড়ায় বকশিশের নামে উৎকোচের মহোৎসব সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। যেকোনো একটি মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘাটে ঘাটে বকশিশের নামে দিতে হয় উৎকোচ।
বিচারাঙ্গনে দুর্নীতি ও অভিযোগ
আদালতের কর্মচারীরা ঘুষ চান, এমন তথ্য এসেছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে। খোদ বিচারকরাও মনে করেন ঘুষ চান তাদের সাপোর্ট স্টাফরা। সংস্কার কমিশন পরিচালিত অনলাইন জরিপে ৬৬ শতাংশ বিচারক এমন মত দিয়েছেন। জরিপের অংশ নিয়ে আদালতের কর্মীদের ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে মত দিয়েছেন সাধারণ নাগরিক ও আইনজীবীরাও।
কমিশনের প্রতিবেদনে বিচারাঙ্গনের দুর্নীতি-অনিয়মের সম্ভাব্য আটটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয় উল্লেখ করে কিছু সুপারিশও করেছে কমিশন।
প্রতিবেদনে নাগরিক, বিচারক ও আইনজীবীদের ওপর অনলাইনে পরিচালিত জরিপের ফলাফল তুলে ধরা হয়েছে। জরিপে প্রশ্ন ছিল, ‘আদালতের কর্মচারী সম্পর্কে আপনার ধারণা কেমন?’। এতে অংশ নেন ১১ হাজার ২২৫ জন নাগরিক। ৯ হাজার ৫৩০ জন মনে করেন, আদালতের কর্মচারীরা ঘুষ চান। যা মোট অংশগ্রহণকারীর ৮৪ দশমিক ৯০ শতাংশ।
একই প্রশ্নে আইনজীবীদের জরিপে, ৯১ দশমিক ৭০ শতাংশ আইনজীবী মনে করেন আদালতের কর্মচারীরা ঘুষ চান। এখানে মোট ২২৮ জন আইনজীবী অংশ নেন। জরিপে বিচারকদের কাছে প্রশ্ন ছিল ‘কোর্ট সাপোর্ট স্টাফদের সম্পর্কে আপনার ধারণা কেমন?’ অংশ নেওয়া ১৮৮ জন বিচারকের মধ্যে ১২৪ জনই বলেন, সাপোর্ট স্টাফরা ঘুষ চান। যা অংশগ্রহণকারী বিচারকদের ৬৬ শতাংশ।
বিচারাঙ্গনে দুর্নীতির কারণ
বিচারাঙ্গনে দুর্নীতি-অনিয়মের সম্ভাব্য কারণ উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ ও অধস্তন আদালত মিলিয়ে মোট বিচারকের সংখ্যা ২ হাজার ৩০০ জনের কিছু বেশি। এই স্বল্পসংখ্যক বিচারকের মাধ্যমে ৪৩ লাখ মামলা নিষ্পত্তি করতে গিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হচ্ছে। আবার বিচার প্রক্রিয়ায় বিচারক ছাড়াও অপরিহার্য অংশীজন হচ্ছেন আইনজীবী, পুলিশ, আইনজীবী সহকারী, আদালতের সহায়ক জনবল।
একজন বিচারপ্রার্থীকে এসব ব্যক্তিদের সঙ্গে মামলার বিভিন্ন প্রয়োজনে যোগাযোগ করতে হয়। তাদের কারও কারও দ্বারা বিচারপ্রার্থীরা হয়রানির শিকার হন। আর এই হয়রানি এড়াতে অনেকে বাধ্য হন ঘুষ বা বিভিন্নভাবে অর্থ প্রদান করতে। আবার কেউ অবৈধ সুবিধা পেতেও ঘুষ দেন।
বিচারাঙ্গনে দুর্নীতি-অনিয়মের আটটি উল্লেখযোগ্য কারণ তুলে ধরা হয়েছে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে।
এক. বিচারক ও বিচার সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী বিচারক, আইনজীবী, আদালতের কর্মচারী, আইনজীবী সহকারী, পুলিশ বা তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতার ঘাটতি।
দুই. মামলার কার্যতালিকা আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতা।
তিন. আদালত প্রাঙ্গণে তথ্য সেবা প্রদানের জন্য তথ্য কেন্দ্র না থাকা।
চার. সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নৈতিক কর্মঘণ্টার সর্বোচ্চ ব্যবহার না করা।
পাঁচ. আদালতের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের সিটিজেন চার্টার প্রদর্শন না করা।
ছয়. আইনজীবীদের মধ্যে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের উদ্যোগহীনতা।
ছয়. রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের তদারকি ব্যবস্থায় ঘাটতি।
সাত. বিচারক বা অফিস প্রধানদের অধীন কর্মচারীদের তদারকি ব্যবস্থায় ঘাটতি।
আট. অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা বা অভিযোগ বক্সের অনুপস্থিতি।
প্রতিরোধমূলক সুপারিশ
সুপ্রিম কোর্টের দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়ে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্টে দুর্নীতি প্রতিরোধের জন্য সংবিধান অনুসারে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে সময়ে সময়ে অভিযোগ গ্রহণ ও তা নিষ্পত্তি করাসহ আনুষঙ্গিক বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের (প্রেষণে কর্মরত জুডিশিয়াল অফিসার) বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য হাই কোর্ট বিভাগের তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ ও তা নিষ্পত্তি করাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
প্রতিবেদনে একইভাবে অধস্তন আদালতের দুর্নীতি প্রতিরোধে জাতীয় ও জেলাপর্যায়ে বিচারকদের সমন্বয়ে পৃথক পৃথক কমিটি গঠন করতে বলা হয়েছে। এর মধ্যে বিচারকদের বিষয়ে অনুসন্ধানে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সমন্বয়ে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি এবং অধস্তন আদালতের সহায়ক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির জন্য স্থানীয় ‘দুর্নীতি অনুসন্ধান ও প্রতিরোধ কমিটি’ গঠন করতে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনের সুপারিশে তিন বছর পরপর এবং অবসর নেওয়ার ছয় মাস আগে বিচারকদের ও তাদের ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের সম্পদের বিবরণ সংগ্রহ করে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে তা পরীক্ষানিরীক্ষা ও প্রকাশ করার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি বিচারিক দক্ষতা, আদালত ব্যবস্থাপনা, মামলা ব্যবস্থাপনা, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বিচারকদের আচরণ পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনার কাজও সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল করবে, মর্মে বিধান করতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মোমিনুর রহমানকে প্রধান করে আট সদস্যের এই কমিশন গঠন করা হয়েছিল। গত ৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার প্রধানের কাছে কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। ৩৫২ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ৩১টি অধ্যায়ে বিচার বিভাগ সংস্কার নিয়ে নানা সুপারিশ ও প্রস্তাব তুলে ধরা হয়েছে।