এস. এম. আরিফ মন্ডল
এস. এম. আরিফ মন্ডল

একজন নবীন আইনজীবীর পথচলা

হাইকোর্টে ওকালতির শুরুতে প্রতিটি আইনজীবী বিখ্যাত হবার স্বপ্ন বুনতে থাকেন। প্রথম দিকে ডায়াসের সামনে কথা বলতে গেলে হাত-পা কাঁপতে থাকে, আর হৃদয়ের স্পন্দন বাড়তে থাকে। ডায়াসে দাঁড়ায়ে ঠিক মত উত্তর দিতে না পারলে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মহোদয়ের সামান্য ধমকে পিলে চমকানোর অবস্থা হয়। এভাবে মাস যায় বছর হয়। সিনিয়র আইনজীবীর সাথে ওকালতিতে বছর যায়। আস্তে আস্তে নবীন আইনজীবীর কাছে মামলা আসতে থাকে। শুরু হয় মানসিক চাপ। এমন কিছু মামলা আসে তখন নবীন আইনজীবীর একার ওকে লড়ার সাহসে কুলায় না, তখন সিনিয়র আইনজীবী নিয়োগ করতে হয়।

খুনের মামলায় জামিন শুনানি করতে গিয়ে নবীন আইনজীবীকে কোর্টের কাছে কত বকুনি হজম করতে দেখেছি ‌!মক্কেলের প্রত্যাশা বেশি -কাংখিত আদেশ পাইয়ে দিতে হবে। ব্যর্থ হলে অনাস্থা, সফল হলে নাম-যশের কাটতি। নবীন আইনজীবী ইতিবাচক আদেশ পাবার জন্য ছুটতে থাকেন সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি-সাধারন সম্পাদকসহ মিডিয়ায় বিখ্যাত টক শোতে অংশগ্রহণকারী বিজ্ঞ আইনজীবীগণের কাছে।অথবা সরকারে রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী বিজ্ঞ আইনজীবীগণ অথবা মাননীয় বিচারপতির পছন্দসই কোন আইনজীবীর কাছে।

ওকালতির শুরুতে প্রথমত: মক্কেলের সন্তুষ্টি তারপরে শুধু ব্রিফ আর ফিস! পড়ালেখা বেশি না পারলেও জাঁদরেল সিনিয়র আইনজীবী পাশে থাকলে ওকালতিতে সকল বাধা অতিক্রম করা অতি সহজ!ওকালতিতে এগিয়ে যেতে চাইলে মত,পথ, স্থান এবং মোসাহেবীর বিশেষ গুরুত্ব আছে! তবে নবীন আইনজীবী বান্ধব সিনিয়র আইনজীবী সবাই হতে পারেন না।

নবীন আইনজীবীর যা কিছু মুদ্রা দোষ

আইনজীবী হবার পরে একজন নবীন  আইনজীবীকে আদালতের ভিতরে এবং বাহিরে এমন কিছু প্রচলিত নিয়ম- রীতি মেনে চলতে হয় যা বইপত্রে পাওয়া যায় না।এই নিয়মাচার বিচারপতি মহোদয়, আইনজীবী সবাই জানেন এবং পরিপালন করেন।তবে পারত: পক্ষে নবীন আইনজীবীদের কে কেউ শিখিয়ে দেন না। যেসব নবীন আইনজীবীবৃন্দ চোখ-কান খোলা রাখেন; সকলেই আদালতের এই রীতি -রেওয়াজ রপ্ত করতে পারেন।তবে যাঁর হুস হবে না, তাঁর ওকালতির শেষ দিন এসেও নিজকে শুধরাতে পারবেন না। নবীন আইনজীবীদের কতিপয় মুদ্রা দোষসমূহ:

১. আইনজীবী হবার পরে মেধা মননে একটা ভাব চলে আসে-সমবয়সী কাউকে পেলেই লার্নেড- লার্নেড বলে সম্বোধন করেন। মূলত বিষয়টা হচ্ছে আমাকেও কেউ লার্নেড বলে সম্বোধন করুক। বিজ্ঞ আইনজীবীগণ শব্দটি কোর্টে মামলা শুনানির সময় প্রতিপক্ষ আইনজীবীকে লার্নেড বলে সম্মোধন করেন এবং তখন সবচেয়ে বেশি শ্রুতি মধুর লাগে। কোর্টের বাহিরে ভাই, ওকালতির বয়স বিবেচনায় স্যার বলে সম্বোধন করা যেতে পারে।

২. গাউন পরিহিত অবস্থায় প্রায়ই দেখা যায় আদালত চত্বরে বিজ্ঞ আইনজীবীগণ চা- কফি, সিগারেট খাচ্ছেন যা বড্ড বেমানান ।

৩. আদালত প্রাঙ্গণের বাহিরে হাইকোর্টের ব্যান্ড লাগিয়ে রিকসা, বাইকে, গণপরিবহনে চলাফেরা না করাটাই শ্রেয়।

৪. আদালত চত্বরে মক্কেলের সাথে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছেন! পেশার কতটা অসম্মান বয়ে আনছেন বুঝতে পারবেন না।

আরও পড়ুন : আইনজীবী আলিফ হত্যা: বিচারহীনতার এক বছর ও আমাদের দায়

৫. মক্কেলের জন্য অনেক পরিশ্রম করেন ভালো কথা। কিন্তু আপনার ফি বারান্দায় দাঁড়িয়ে  গ্রহণ করবেন সেটা অনুচিত।

৬. কোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাবেন সেটা মোটেও শোভনীয় নয়। ধুমপান করতেই পারেন, কিন্তু সেটা যতটা সম্ভব জনশূন্য স্থানে করাই শ্রেয়।

৭. নবীন আইনজীবী হয়েছেন ভালো কথা। কিন্তু সিনিয়রের গাউন  আপনার হাতে নিয়ে কখনো তাঁর পিছনে হাঁটবেন না। ফাইল-গাউন বহন করার জন্য তাঁর ক্লার্কই যথেষ্ট।

৮. নবীন আইনজীবীদের প্রায়শ: দেখা যায় পরিপার্টিতে তাদের অনীহা-যেমন: নিয়মিত গোঁফ- দাড়ি না কামানো, সাদা শার্টটি না ধোয়ার কারণে রং একেবারে হলুদ করানো, ব্যান্ডটি ময়লা হতে হতে পরিত্যক্ত ন্যাকড়ায় রূপান্তর করা, পরনের প্যান্ট কোনভাবেই সাদা সার্টের সঙ্গে ম্যাচিং না করানো, মাসে অন্তত কালো জুতা জোড়া পলিশ না করানো। আর ভদ্রমহিলা আইনজীবীগণ যখন মামলা শুনানি করবেন তখন মাথার চুলটা বেঁধেই করুন।

এজলাসের মধ্যে কতিপয় আচরণ থেকে বিরত থাকা

কোর্টে মামলা যখন শুনানী চলমান থাকে নবীন আইনজীবীদের কিছু অঘোষিত নিয়ম- কানুন মেনে চলতে হয়। এই নিয়মকানুন গুলোর বিষয়ে মাননীয় বিচারপতি মহোদয়, আইনজীবী কেউ বলবে না । বরং নিজ থেকে এই শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে। যেমন-মেনশন আওয়ারে লাইনে দাঁড়ালে অবশ্যই সিনিয়র আইনজীবীদের কে প্রাধান্য দিতে হবে। নবীন আইনজীবী যখনই দেখবে তার পিছনে আগে পারমিশন প্রাপ্ত কোনো আইনজীবী দাঁড়িয়ে আছেন- তাহলে অবশ্যই ওই আইনজীবীকে আগে মেনশন করার সুযোগ দিবেন। আপনি অনেক পড়ালেখা করে এসেছেন কিন্তু শুনানির সময় খুব ধীর- স্থির ভাবে আপনার বক্তব্য উপস্থাপন করুন।

আপনার প্রতিপক্ষ আইনজীবীকে সর্বোচ্চ সম্মান দেবার চেষ্টা করুন। এর ফলে বিচারপতি মহোদয় আপনার প্রতিও আরো বেশি মনোযোগী হবেন। আপনার আচরণ প্রতিপক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীর প্রতি কখনোই যেন বিরক্তির কারণ না হন,সেটা খেয়াল রাখতে হবে। ডায়াসে দাঁড়িয়ে কখনোই আদালতের প্রতি আঙ্গুল প্রদর্শন করে কোন সাবমিশন রাখবেন না। মাননীয় বিচারপতি মহোদয়গণ  যে প্রশ্নের উত্তর জানতে চায় শুধু সেটারই উত্তর দিবেন। এরপরেও যদি অতিরিক্ত বলার প্রয়োজন হয় -অবশ্যই মাননীয় বিচারপতির অনুমতি সাপেক্ষে বলবেন। বিজ্ঞ আদালত কে সবসময় অনুরোধ করবেন,অণুযোগ নয়।

এজলাসে মামলার শুনানিকালীন সিনিয়র আইনজীবীদের বসার ব্যবস্থা আগে করবেন, তারপর নিজে বসবেন। মোবাইলটি সব সময় ভাইব্রেট মোডে রাখবেন। আদালতের কার্যধারা চলাকালীন ফোন রিসিভ করে পারত: পক্ষে কথা বলবেন না। সম্ভব হলে আপনার কাছে থাকা ফাইলটি সামনে ধরে আড়াল করে সংক্ষিপ্ত কথা বলে ফোন রেখে দিবেন। শুনানি চলাকালীন পানি পানের প্রয়োজন হলে মুখ আড়াল করে পানের চেষ্টা করবেন।আদালত চলাকালীন কোন পরিচিত আইনজীবীর সঙ্গে করমর্দন না করাই শ্রেয়।  নিম্ন আদালতে প্রায়ই দেখা যায় আদালতের কার্যক্রম চলাকালীন পায়ের জুতা টেনে আওয়াজ করে আইনজীবীগন বিরক্তিকর শব্দে হাঁটতে থাকেন। অনেক আইনজীবী মুখে পান-সুপারি খেতে খেতে মামলার শুনানি করেন।

এই প্রাঙ্গনে যা কিছু দৃষ্টিকটু

প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় ক্যান্টিনের বয়দেরকে বিজ্ঞ আইনজীবীদগন ‘তুই’ বলে সম্বোধন করতে! মাঝেমধ্যে লাইব্রেরীতেও এমন ঘটনা ঘটে। বাহিরের কফির দোকানে তো কথাই নেই! বিজ্ঞ আইনজীবীগন উচ্চ শিক্ষিত হয়ে থাকেন। ফলে এইসব জায়গায় সংশ্লিষ্টদের  প্রতি যথাযথভাবে সম্মানের সাথে কথা বলা উচিত। তা না হলে আপামর জনসাধারণের কাছে আইনজীবীদের আচরণ সম্পর্কে একটি ভুল বার্তা যাবে।

আইনজীবীদের ব্যস্ততায় বিড়ম্বনা

ওকালতির শুরুতেই নবীন আইনজীবীগন যখন কোর্টে আসেন তখন মন-মর্জিমত টাকার অভাবে খেতে পারেন না।  কয়েক বছর পর ব্যস্ত আইনজীবী হইতে পারলে -দুপুর বেলার খাবার সময় থাকে না! ওকালতিতে যখন স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন তখন অনেক বয়স হয়ে যায়। এ সময় ডায়বেটিকস্, হৃদপিন্ডের অসুখ, উচ্চ রক্তচাপের কারনে পেয়ারা, কলা বা অন্যান্য ফল ছাড়া অন্য কিছু খাইতে পারেন না। তবে খুব কম সংখ্যক বিজ্ঞ আইনজীবী তাঁর জুনিয়র সহকর্মী কে নিয়ে  দুপুরে একসঙ্গে খেতে বসেন।

এই প্রাঙ্গণের অনেক জুনিয়র আইনজীবীর স্বপ্ন থাকে -সিনিয়রের সাথে একদিন একবেলা বসে খাবার খাবেন! এ প্রত্যাশা শুধু ক্ষুধা নিবারণের বিষয় না- একটা সম্মান ও মর্যাদার। একজন নবীন আইনজীবীর মক্কেল যখন কোন সিনিয়র আইনজীবীর অথবা তার নিজের সিনিয়রের মক্কেল হয়ে যায় -তখন ওই নবীন আইনজীবীর দুঃখের আর সীমা থাকে না। মক্কেল হারানোর ভয় সবসময় থাকবে, কিন্তু নবীন আইনজীবীর মেধা-যোগ্যতা এবং সক্ষমতা থাকলে এই প্রাঙ্গণে আপনার মক্কেলের কখনো অভাব হবে না।

উপরোক্ত বিষয়গুলো একজন নবীন আইনজীবী মানবেন কিনা -সেটা তার একান্ত নিজস্ব ব্যাপার। তবে আদালতের ম্যানার্স জানা থাকলে মাননীয় বিচারপতি, আইনজীবী সবাই আপনাকে সামনে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিবেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবেন । উল্লেখ্য-বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এর ‘পেশাগত আচরণ ও শিষ্টাচার বিধিমালা’ (Canons of Professional Conduct and Etiquette) রয়েছে। যেখানে আইনজীবীদের প্রতি পারস্পরিক আচরণ, মক্কেলের প্রতি আচরণ, আদালতের প্রতি দায়িত্ববোধ, জনসাধারণের প্রতি আইনজীবীদের আচরণসহ ইত্যাদি বিষয়ক আলোচনা করা হয়েছে। উপরোক্ত আচরণগুলির প্রতি মনোনিবেশ করা সংশ্লিষ্ট বিধিমালার ব্যাখ্যা স্বরূপ এবং পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

নবীন আইনজীবীদের ভবিষ্যৎ

বিচারপতি, সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এই মর্যাদাপূর্ণ পদগুলো অলংকৃত করবেন আজকের নবীন আইনজীবীবৃন্দ। সুতরাং তাদের আচার-আচরণ, পড়ালেখায় আদর্শ মানে পৌঁছতে না পারলে আগামীতে বাংলাদেশের আইনজগতে একটি শূন্যতার সৃষ্টি হতে পারে। শুধু জামিন মামলার শুনানি করলেই দেশ উপকৃত হবে না, এর বাহিরে হাইকোর্ট বিভাগে সকল শ্রেণীর মামলা করার আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে হবে।

অনেকেই আছেন হাইকোর্ট  চত্তরের বাহিরে কোথাও ওকালতি করতে যেতে চান না। প্রকৃত এবং দক্ষ আইনজীবী হতে চাইলে সকল আদালত, ট্রাইব্যুনালে মামলা পরিচালনা করতে যাওয়া উচিত। এর ফলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী যেমন দক্ষতায় সমৃদ্ধ হবেন এবং তেমনি দেশ একজন যোগ্য আইনজীবীকে পাবে। নবীন আইনজীবী বৃন্দকোর্টের ওকালতিটা এজলাসেই চেষ্টা করুন, পিছনের বারান্দার চিন্তাও করবেন না। এই বিল্ডিংটার চোখ- কান খোলা, কোন একদিন আপনার সকল অপকর্মের কথা ফাঁস করে দিবে। সুপ্রিম কোর্ট বারে যেকোনো পদে  নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গেলে দেখবেন-এই প্রাঙ্গণে আপনার সকল আচরণ প্রতিটি ভোটারের কাছে মূল্যায়িত হবে।

লেখক : এস. এম. আরিফ মন্ডল; আইনজীবী, হাইকোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট। ই-মেইল : mondolarif@yahoo.com