নারীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা: চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার আলোকে বিশ্লেষণ
অ্যাডভোকেট মনজিলা ঝুমা

নির্বাচনী ইশতাহার: রাজনীতি নাকি দায়মুক্তি?

অ্যাডভোকেট মনজিলা সুলতানা ঝুমা : নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের সামনে তাদের নির্বাচনী ইশতাহার প্রকাশ করে। এতে তারা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে, ক্ষমতায় গেলে কী ধরনের নীতি ও কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে, দেশের প্রশাসন কীভাবে পরিচালিত হবে এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এটি বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক দেশে স্বীকৃত ও প্রচলিত একটি প্রথা। বাংলাদেশেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতাহার ঘোষণা করে থাকে।

নির্বাচনী ইশতাহার আসলে কী

নির্বাচনী ইশতাহার হলো একটি রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র। এতে একটি দলের আদর্শ, লক্ষ্য, নীতি, উন্নয়ন পরিকল্পনা, সামাজিক কল্যাণমূলক উদ্যোগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়। শুধু সরকার গঠন করলে কী করবে, তা নয়; বিরোধী দলে থাকলে গণতন্ত্র রক্ষায় কী ভূমিকা রাখবে, সেটিও ইশতাহারে থাকা উচিত। ভোটাররা বিভিন্ন দলের ইশতাহার পড়ে ও তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেন, কোন দলের প্রতিশ্রুতি তাদের আশা আকাঙ্ক্ষা ও মূল্যবোধের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। উন্নত গণতন্ত্রে ইশতাহার নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্ক হয়। কিন্তু আমাদের দেশে শীর্ষ পর্যায়ের এমন গঠনমূলক বিতর্ক খুব একটা দেখা যায় না।

তবে প্রশ্ন হলো, প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার মধ্যে কি ব্যবধান থাকে?

প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, নির্বাচনের আগে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বাস্তবায়িত হয় না। সরকার নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলে সময় নেয় অথবা পরবর্তী নির্বাচনে আবার একই প্রতিশ্রুতি দেয়। অনেক সময় এমন বিষয়েও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, যা বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলের আইনগত ক্ষমতার মধ্যেই পড়ে না। এর একটি বড় কারণ হলো, এই প্রতিশ্রুতি না রাখলেও কার্যকর কোনো জবাবদিহি ব্যবস্থা নেই।

গণমাধ্যম নিয়মিতভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রশ্ন তুলতে পারে, ইশতাহারের কোন প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে এবং কোনটি হয়নি কেন। সংসদে বিরোধী দলও সরকারকে এ বিষয়ে চাপের মুখে রাখতে পারে। এতে রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সময় আরও সতর্ক হবে এবং বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণে আগ্রহী হবে।

স্থানীয় পর্যায়ে ইশতাহারের ঘাটতি

জাতীয় নির্বাচনে ইশতাহার গুরুত্ব পেলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এর ব্যবহার খুবই সীমিত। অধিকাংশ প্রার্থী দলীয় ইশতাহারের ওপর নির্ভর করায় এলাকার নির্দিষ্ট সমস্যা ও প্রয়োজনগুলো লিখিতভাবে প্রতিফলিত হয় না। অথচ একটি এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, জাতিগোষ্ঠীর আনুপাতিক সংখ্যা, তাদের চাহিদা এবং জীবনযাপনের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে স্থানীয় উন্নয়নের জন্য স্পষ্ট এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা থাকা জরুরি। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক চর্চায় এ ধরনের পরিকল্পিত ইশতাহার এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।

বর্তমান আইন ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে জনগণের প্রধান জবাবদিহির মাধ্যম এখনো ভোট। অধিকাংশ দেশে, বাংলাদেশসহ, নির্বাচনী ইশতাহার আদালতের মাধ্যমে সরাসরি বলবৎযোগ্য নয়। ফলে সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে জনগণ সাধারণত পরবর্তী নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক জবাব দেয়। তবে এর পাশাপাশি গণমাধ্যম, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা, নাগরিক সমাজের চাপ এবং নির্বাচন কমিশনের নজরদারির মাধ্যমে সরকারের ওপর জবাবদিহির চাপ সৃষ্টি করা যায়।

অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাজ্যে নির্বাচনী ইশতাহারে প্রতিশ্রুতির আর্থিক দিক ব্যাখ্যা করা বাধ্যতামূলক। ভুটানে নির্বাচন কমিশন ইশতাহার যাচাই করে অনুমোদন দেয়। কিন্তু ভারতে আদালত স্পষ্টভাবে বলেছেন, নির্বাচনী ইশতাহার আইনিভাবে বলবৎযোগ্য নয়।

আইনি বাধ্যবাধকতার সম্ভাব্য ঝুঁকি

নির্বাচনী ইশতাহারকে আইনি বাধ্যবাধকতায় পরিণত করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে। তবে এর সঙ্গে জটিল আইনি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি যুক্ত। ইশতাহারকে আদালতের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা হলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবর্তে লেনদেনমূলক হয়ে যেতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলো তখন ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট, সীমিত বা শর্তসাপেক্ষ ভাষায় প্রতিশ্রুতি দিতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে আইনগত দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া যায়।

এতে বড় ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দলগুলো আইনি পরামর্শ ও তহবিলের সুবিধা নিয়ে এগিয়ে থাকবে, আর ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তুলনামূলকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাছাড়া, কোনো প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে দায় কার ওপর বর্তাবে, ক্ষতিপূরণ কীভাবে নির্ধারিত হবে বা সংসদে গৃহীত আইনের সঙ্গে ইশতাহারের সংঘাত হলে কোনটি প্রাধান্য পাবে, এসব বিষয় স্পষ্ট নয়। জোট সরকারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দলের আলাদা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন আরও জটিল হয়ে ওঠে।

তবে আদালতের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক না করেও কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদনের সঙ্গে ইশতাহার বাস্তবায়নের অগ্রগতি সংযুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে পারে। এতে কোন প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনটি হয়নি এবং কেন হয়নি, তা জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

উপসংহার

নির্বাচনী ইশতাহার কোনো সাধারণ কথার তালিকা নয়; এটি জনগণের প্রতি রাজনৈতিক নেতাদের দেওয়া একটি প্রকাশ্য অঙ্গীকার। আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও এর নৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব গভীর। এই অঙ্গীকার ভঙ্গ হলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়, আর সেই আস্থাভঙ্গের রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত নেতাদেরই দিতে হয়। এই সত্যটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সর্বদা স্মরণে রাখা উচিত।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।