আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলায় রিপন দাসের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ

চট্টগ্রামে আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলায় চিন্ময় দাসসহ ৩৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন

চট্টগ্রামে আদালত প্রাঙ্গণে সংঘটিত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় বহিষ্কৃত ইসকন নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীসহ মোট ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ (চার্জ) গঠন করেছেন আদালত। এর মাধ্যমে বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর এই মামলার বিচার কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোঃ জাহিদুল হক উভয় পক্ষের শুনানি শেষে চার্জ গঠনের আদেশ দেন। আগামী ধার্য তারিখ থেকে মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে।

পলাতক ১৬ আসামিদের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে অ্যাডভোকেট দুলাল চন্দ্রনাথ এবং চন্দন কুমার ধর, চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এর পক্ষে অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বাকি উপস্থিত আসামিদের পক্ষে তিনজন আসামী আদালতে সরাসরি তাদের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। বাদি পক্ষে আমি এপিপি অ্যাডভোকেট মোঃ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী ও পিপি অ্যাডভোকেট এস ইউ নুরুল ইসলাম বক্তব্য রাখেন।

মামলার হাজতি আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস নিজেই বক্তব্য রাখেন ২৫ মিনিট। আর অন্যান্য আসামিদের মধ্যে ২জন আদালতে সরাসরি তাদের আত্বসাপেক্ষ বক্তব্য রাখেন।

আদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য ও মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন।

আরও পড়ুনআট জেলা আদালতে চালু হচ্ছে ই-বেইলবন্ড, ২১ জানুয়ারি উদ্বোধন

শুনানিকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই চট্টগ্রাম আদালতপাড়ায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আদালতের প্রধান ফটকে বসানো হয় তল্লাশি চৌকি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন করা হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল পৌনে ১০টার দিকে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ২৩ জন হাজতি আসামিকে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। মামলার বাকি ১৬ আসামি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

এই নিরাপত্তা তৎপরতার কারণে আদালতের আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েন।

শুনানির সময় চিন্ময় দাসের আইনজীবী অপূর্ব কুমার ভট্টাচার্য তাকে নির্দোষ দাবি করে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানান। রাষ্ট্রপক্ষ এ আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী উক্ত হত্যাকাণ্ডের সহযোগিতাকারী ও প্রত্যক্ষ উস্কানিদাতা। তার নির্দেশ ও প্ররোচনায় অন্যান্য আসামিরা সংঘবদ্ধভাবে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। আসামিদের এই কার্যকলাপ বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৪৭/১৪৮/১৪৯/৩০২/১০৯/৩৪ ধারায় শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ।

বাদীপক্ষের আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মোঃ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন “এটি একটি সংবেদনশীল, আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা, যা দেশের জনগণ, আইনজীবী সমাজ, বিচারপ্রার্থী মানুষ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। রাষ্ট্রপক্ষ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, উপস্থাপিত প্রমাণাদির আলোকে আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হবে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।”

আরও পড়ুন : বার কাউন্সিল মৌখিক পরীক্ষার ফল আটকে দেড় মাস, হতাশ ৭,৯১৭ পরীক্ষার্থী

আদালত উপস্থিত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাঠ করে শোনালে চিন্ময় দাস নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন এবং চার্জশিটকে ত্রুটিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তবে উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত সকল ৩৯ আসামির বিরুদ্ধেই চার্জ গঠন করেন।

আজ চট্টগ্রাম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোঃ জাহিদুল হক মামলার এজাহার, চার্জশিট, ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের জবানবন্দি, জব্দকৃত আলামত (ধারালো অস্ত্র, লাঠি, রড প্রভৃতি), সুরতহাল রিপোর্ট, ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, ফরেনসিক রিপোর্ট এবং আসামিদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় প্রদত্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি—এসব উপাদান সহ বিচার বিশ্লেষণ করে আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ গঠন করেন।

আসামি চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী এর বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/১০৯ এবং  অন্যান্য আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৭/৪৪৮/৪৪৯/৩০২/৩৪ ধারায় চার্জ গঠন করা হয়েছে।

এ মামলায় বহিষ্কৃত ইসকনের নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ তার উগ্রবাদী অনুসারী ২৩ জন হাজতি আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। ১৬ জন আসামি পলাতক। মামলার চার্জশিটভুক্ত মোট আসামি ৩৯ জন।

আদালতে উপস্থিত ছিলেন নিহত আইনজীবীর বাবা ও মামলার বাদী জামাল উদ্দিন। বিচার শুরুর আদেশে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, তিনি চান দ্রুত বিচার শেষ হোক এবং মৃত্যুর আগে সন্তানের হত্যার ন্যায়বিচার দেখে যেতে পারেন।

২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন নামঞ্জুর হওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদালত চত্বরে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে সংঘবদ্ধভাবে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চন্দন দাস ও রিপন দাসসহ ১৫ থেকে ২০ জন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় এবং উসকানিদাতা হিসেবে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ১ জুলাই ৩৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলেও বাদীর নারাজির প্রেক্ষিতে সংশোধিত চার্জশিটে ৩৯ জনকে অভিযুক্ত করা হয়।

মামলার অন্যতম তিন আসামি চন্দন দাস, রিপন দাস ও রাজীব ভট্টাচার্য ইতোমধ্যে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।