ইমরান হোসাইন রুমেল
ইমরান হোসাইন রুমেল

কাজল কালো চোখের পাতায় রাজনীতি

ইমরান হোসাইন রুমেল : একদিকে “কাজল কালো চোখ” যা চিরন্তন প্রেমের প্রতীক, অন্যদিকে “বর্তমান সরকার” যা নাগরিক জীবনের এক অস্থির ও পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণ।

ভাবনাকে দুই ভাগে এভাবে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে:

১. কাজল কালো চোখের সেই চিরন্তন টান (রোমান্টিকতা)

সাহিত্যে কাজল কালো চোখ সবসময়ই এক গভীর রহস্য আর আশ্রয়ের নাম।

নিজেকে খুঁজে পাওয়া: কারো চোখের মায়ায় নিজেকে খুঁজে পাওয়ার অর্থ হলো সেই মানুষটির মাঝে নিজের অস্তিত্বের পূর্ণতা অনুভব করা। কবিরা বলেন, পৃথিবীর সব কোলাহল থেমে যায় যদি প্রিয়তমার চোখের ওই শান্ত কালো মনিতে একটু ঠাঁই পাওয়া যায়।

ভালোবাসার গভীরতা: এই কাজল কালো চোখ কখনো “বনলতা সেন”-এর মতো শান্তির নীড়, আবার কখনো এক অন্তহীন অপেক্ষার নাম। এখানে ভালোবাসা মানে কেবল আবেগ নয়, বরং হারিয়ে যাওয়ার এক প্রশান্তি।

২. বর্তমান সরকার ও সমসাময়িক প্রেক্ষাপট (বাস্তবতা)

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আপনি যখন “কাজল কালো চোখের” প্রশান্তি খুঁজছেন, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ:

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন: বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশ পরিচালনা করছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

সংস্কারের চেষ্টা: সরকার বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে। “জুলাই বিপ্লব”-এর চেতনাকে ধারণ করে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখা হচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ ও অনিশ্চয়তা: দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর রাজনৈতিক অস্থিরতা সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি করে রেখেছে। হয়তো এই অস্থির নাগরিক জীবন থেকে মুক্তি পেতেই মানুষ সেই “কাজল কালো চোখের” মায়ায় একটু শান্তি বা ভালোবাসা খুঁজে ফিরছে।

মনের সেই দ্বান্দ্বিক ভাবনা—একদিকে নাগরিক অস্থিরতা ও রাজনীতির উত্তাপ, অন্যদিকে প্রিয়তমার চোখের শীতল শান্তিনিড়—তাকে ধারণ করে একটি কবিতা এবং একটি ছোট গল্পের নির্যাস নিচে দেওয়া হলো।

​১. কবিতা: কারফিউ ও কাজল

​শহরে এখন মিছিলের শব্দ, স্লোগানে স্লোগানে কাঁপে বুক,

রাজপথে চলে সংস্কারের খেলা, বদলে যাচ্ছে চেনা মুখ।

টিভির স্ক্রিনে ব্রেকিং নিউজ, ডিক্রি জারি আর শাসনভার,

তারই মাঝে আমি ক্লান্ত পথিক, খুঁজি এক টুকরো ঘর আমার।

​বাইরে হয়তো বদলায় সরকার, নতুন নিশান ওড়ে আকাশে,

রক্তচক্ষু আর সতর্ক পাহারা, সব মিশে আছে বিষণ্ণ বাতাসে।

কিন্তু তোমার ওই কাজল কালো চোখ, সেখানে নেই কোনো বিভাজন,

সেখানে আমি মুক্ত স্বাধীন, ভুলে যাই সব রাজনৈতিক আয়োজন।

​রাষ্ট্রের যত জটিল সমীকরণ, যত ক্ষোভ আর হিসেব মেলা,

তোমার চোখের মায়ায় হারাই, ভুলে যাই সব নষ্ট খেলা।

নিজেকে খুঁজে পাই ওখানেই আমি, যেখানে শাসন নেই কোনো ত্রাসের,

কেবল মায়া আর ভালোবাসাই শেষ কথা—সে এক নতুন বাংলাদেশের।

২. গল্পের নির্যাস: নীল মলাটের ডায়েরি ও এক টুকরো আকাশ

​প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের এক বৃষ্টিভেজা বিকেল। ঢাকার শাহবাগ মোড়ে তখনও মানুষের জটলা, আগামী মাসের নির্বাচন নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় উঠছে।

​আসিফ বাসে বসা। জানালার বাইরে পুলিশ আর সেনাবাহিনীর টহল। পত্রিকার শিরোনামে বড় করে লেখা—’সংস্কারের পথে বাংলাদেশ’। কিন্তু আসিফের মাথায় ঘুরছে অন্য চিন্তা। গত তিন বছর ধরে সে বেকারত্বের সাথে লড়েছে, আন্দোলনের সময় রাজপথে স্লোগান দিয়েছে। আজ সে ক্লান্ত।

​বাস থেকে নেমে আসিফ যখন একটা ছোট ক্যাফেতে ঢুকল, সেখানে রুবাবা বসে ছিল। রুবাবা তাকাতেই আসিফের মনে হলো, চারপাশের এই ডামাডোল, সরকারের পরিবর্তন, মুদ্রাস্ফীতি—সবকিছু যেন এক নিমেষে ম্লান হয়ে গেল।

​রুবাবার চোখে গভীর কাজল। আসিফ লক্ষ্য করল, এই কাজল কালো চোখের মণিতে তার ক্লান্ত প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে।

রুবাবা মৃদু হেসে বলল, “দেশের খবর শুনেছো? আবার নতুন ঘোষণা এসেছে।”

আসিফ রুবাবার চোখের দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে উত্তর দিল, “বাইরে কে এলো আর কে গেলো তাতে আমার কী? আমি তো কেবল এই এক জোড়া চোখের মাঝেই নিজের মুক্তি খুঁজি। দেশের সব সমস্যার সমাধান হয়তো এই চোখের কোণেই লুকিয়ে আছে।”

​রুবাবা হাসল। সেই হাসিতে কোনো রাজনীতির প্যাঁচ নেই, নেই কোনো ক্ষমতার মোহ। আসিফ বুঝতে পারল, সরকার বদলালে মানুষের ভাগ্য বদলায় কি না তা সময়ের ব্যাপার, কিন্তু এই চোখের মায়া বদলায় না। এই ভালোবাসাই তার আসল নাগরিকত্ব।

​রাজনীতি আমাদের জীবনকে প্রভাবিত করে ঠিকই, কিন্তু দিনশেষে ভালোবাসা আর বিশ্বাসই মানুষকে বেঁচে থাকার শক্তি দেয়। মনের ভাবনাটি হয়তো এমন—বাইরের পৃথিবীটা (সরকার, রাজনীতি, অস্থিরতা) যখন খুব বেশি জটিল আর রূঢ় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ তার প্রিয় মানুষের চোখের মাঝেই নিজের হারানো সত্তা আর শান্তি খুঁজে পেতে চায়। রাজনীতি বদলায়, সরকার আসে-যায়, কিন্তু কাজল কালো চোখের সেই চিরন্তন ভালোবাসা অপরিবর্তিত থেকে যায়।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।