আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হোমিওপ্যাথিক, বায়োকেমিক, হারবাল ও ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না করে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জাতীয় তালিকা প্রণয়ন ও প্রাপ্যতা নিশ্চিতে করণীয় বিষয়ে সুপারিশের জন্য ১৮ সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন প্রশ্নে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
রুলে এসব শাখার বিশেষজ্ঞসহ সব অংশীজনকে টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।
একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দেন।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সংশ্লিষ্ট আইনজীবী বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রিট ও আইনজীবীর বক্তব্য
বাংলাদেশ ইউনানি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেল এ কে মাহবুবুর রহমান হাইকোর্টে রিট আবেদনটি দায়ের করেন।
রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ কে এম জগলুল হায়দার আফ্রিক। তিনি আদালতকে জানান, অতীতে এ ধরনের টাস্কফোর্সে অ্যালোপ্যাথিকের পাশাপাশি আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হোমিওপ্যাথিক, বায়োকেমিক ও হারবালসহ সব শাখার প্রতিনিধিত্ব থাকত। কিন্তু সর্বশেষ গঠিত টাস্কফোর্সে কেবল অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা শাখার প্রতিনিধিদের রাখা হয়েছে এবং অন্যান্য শাখার প্রতিনিধিদের সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত আইন, নীতি এবং সরকারের নিজস্ব নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেই কারণেই টাস্কফোর্স গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিটটি দায়ের করা হয়েছে।
উপদেষ্টা পরিষদের নির্দেশনা ও টাস্কফোর্স গঠনের পটভূমি
রিট আবেদন সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদ (মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ) অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা অনুমোদন সংক্রান্ত বিষয়ে একটি নির্দেশনা দেয়।
ওই নির্দেশনায় বলা হয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রণীত ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা’ সময়োপযোগী হলেও সেটি সব অংশীজনের সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স দ্বারা পুনঃপর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে আরও সিদ্ধান্ত দেওয়া হয় যে, অত্যাবশ্যকীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সহজলভ্যতা ও প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ সব অংশীজনের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করবে। এই টাস্কফোর্স অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়ন এবং ওষুধের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করবে।
১৮ সদস্যের টাস্কফোর্স ও প্রজ্ঞাপন
পরবর্তীতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের জাতীয় তালিকা প্রণয়ন ও প্রাপ্যতা নিশ্চিতে করণীয় বিষয়ে সুপারিশের জন্য বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক শাহিনুল আলমকে সভাপতি এবং স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব (ঔষধ প্রশাসন অনুবিভাগ) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খানকে সদস্যসচিব করে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়।
এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন গত বছরের ২৪ জুলাই স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ঔষধ প্রশাসন-১ শাখা থেকে জারি করা হয়।
রিটে বলা হয়, এই টাস্কফোর্সে অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা শাখা ছাড়া আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হোমিওপ্যাথিক, বায়োকেমিক, হারবাল ও ভেটেরিনারি শাখার কোনো প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যা আইন ও সরকারি নির্দেশনার পরিপন্থী।
ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ এর ১৩ ধারা
২০২৩ সালের ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের ১৩ ধারায় জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন ও এর দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই ধারার বিধান অনুযায়ী, সরকার একজন চেয়ারম্যান এবং উপযুক্ত সংখ্যক সদস্য নিয়ে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করবে। এই পরিষদ সরকারকে জাতীয় ওষুধনীতি বাস্তবায়ন, দেশীয় ওষুধশিল্পের উন্নয়ন এবং দেশের চাহিদা পূরণে ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ বিষয়ে পরামর্শ দেবে।
আইনের ১৩ ধারায় আরও বলা হয়েছে, দেশীয় ওষুধশিল্পের উন্নয়ন এবং দেশের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে অ্যালোপ্যাথিক, আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হোমিওপ্যাথিক, বায়োকেমিক, হারবাল ও ভেটেরিনারি ওষুধের মধ্য থেকে কিছু ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ’ হিসেবে ঘোষণা করে তালিকা প্রকাশ করতে হবে এবং প্রতি দুই বছর অন্তর সেই তালিকা হালনাগাদ করতে হবে।
রুলে যেসব প্রশ্ন জানতে চাওয়া হয়েছে
রিটে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠনে ২০২৩ সালের ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের ১৩ ধারা লংঘনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদের নির্দেশনা ও আইন মেনে সব অংশীজনকে টাস্কফোর্স রাখতে নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় রিটে।
রুলে ২০২৩ সালের ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের ১৩ ধারার পাশাপাশি ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের নির্দেশনার লঙ্ঘন করে আয়ুর্বেদিক, ইউনানি, হোমিওপ্যাথিক, বায়োকেমিক, হারবাল, ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞদের বাদ দিয়ে ১৮ সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স গঠন-সংক্রান্ত গত বছরের ২৪ জুলাইয়ের মেমো (প্রজ্ঞাপন) কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালের ওষুধ ও কসমেটিকস আইনের ১৩ ধারার পাশাপাশি ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর উপদেষ্টা পরিষদের নির্দেশনা অনুসারে সব অংশীজনের টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্তিতে নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, রুলে সে বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়েছে।
আইনের ১৩ ধারার পাশাপাশি উপদেষ্টা পরিষদের ওই নির্দেশনা অনুসারে সব অংশীজনকে টাস্কফোর্সে অন্তর্ভুক্ত করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।

