কতজন আইনজীবী এমপি হলেন, কারা জিতলেন

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন

একসময় জাতীয় সংসদে আইনজীবীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আইন প্রণয়নের মূল জায়গায় যাঁরা পেশাগতভাবে সবচেয়ে প্রস্তুত, তাঁদের মনোনয়ন দেওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক ধারা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলেছে। ব্যবসায়ী ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী প্রার্থীদের দাপটে সংসদে আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্ব ধীরে ধীরে কমেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই পরিবর্তিত বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে আইন অঙ্গনের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামেন। কেউ সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, কেউ আবার পরিবারের সদস্যদের পক্ষে ভোট চান। আইনজীবী থেকে আইনপ্রণেতা হওয়ার এই দৌড়ে কে জিতলেন, কে হারলেন—তা নির্ধারিত হয়েছে ব্যালটের রায়ে।

নির্বাচনে আইনজীবী প্রার্থীদের অংশগ্রহণ

এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন দল থেকে লড়েছেন বেশকিছু আইনজীবী। এর মধ্যে ধানের শীষের প্রার্থীরা হলেন- বরিশাল-৩: বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান ও বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, নোয়াখালী-১: বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন, ঝিনাইদহ-১: সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান, নেত্রকোনা-১: জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ও বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, মাগুরা-২: সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, টাঙ্গাইল-৮: বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান, কিশোরগঞ্জ-৪: বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান, পঞ্চগড়-১: বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির, চট্টগ্রাম-৫: দলটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, পাবনা-২: জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, নাটোর-১: অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমীন পুতুল, লালমনিরহাট-১: ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান, সিলেট-৬: অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী এবং ভোলা-১: বিএনপি জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান (পার্থ)।

অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লার আইনজীবী প্রার্থীরা হলেন- পাবনা-১ ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, সুনামগঞ্জ-২ মোহাম্মদ শিশির মনির, কুড়িগ্রাম-৩ ব্যারিস্টার মাহবুব আলম সালেহী, ঢাকা-১ ব্যারিস্টার মো. নজরুল ইসলাম, ঢাকা-১৪ ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) এবং চট্টগ্রাম-১ আসনে সাইফুর রহমান।

নির্বাচনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) শাপলা কলি প্রতীকের প্রার্থীরা হলেন- ঢাকা-৯ জাবেদ মিয়া রাসিন এবং নারায়ণগঞ্জ-৪ আবদুল্লাহ আল আমিন।

এছাড়া ঈগল প্রতীকে বরিশাল-৩ আসনে লড়েছেন ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বহিষ্কৃত বিএনপি নেত্রী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

ধানের শীষে জয়ী আইনজীবীরা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত দুইশরও বেশি প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে ধানের শীষ প্রতীকে সুপ্রিম কোর্টের ১৩ জন আইনজীবী নির্বাচিত হয়েছেন।

আইনজীবীদের মধ্যে বরিশাল-৩ আসনে বিএনপি ভাইস চেয়ারম্যান এবং বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন পেয়েছেন ৮০ হাজার ৯৩০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোট মনোনীত ঈগল প্রতীকের প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ভূঁইয়া পেয়েছেন ৬১ হাজার ১৯২ ভোট। জয়নুল আবেদীন ১৯ হাজার ৭৩৮ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।

মাগুরা-২ আসনে সাবেক মন্ত্রী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী ৩১ হাজার ৬৯৭ ভোটে জয়ী হয়েছেন। বেসরকারি ফলাফলে নিতাই রায় চৌধুরী ১ লাখ ৪৬ হাজার ৬৯৬ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড়িপাল্লার মুশতারশেদ বিল্লাহ পেয়েছেন ১ লাখ ১৪ হাজার ৯৯৯ ভোট।

টাঙ্গাইল-৮ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আহমেদ আযম খান ৩৮ হাজার ৩৯১ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। বেসরকারি ফলাফলে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ১৪ হাজার ৩০১ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী শিল্পপতি সালাউদ্দিন আলমগীর রাসেল হরিণ প্রতীকে পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৯১০ ভোট।

কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মো. ফজলুর রহমান ৭৭ হাজার ৭০৪ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। ধানের শিষ প্রতীক নিয়ে অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০৩ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট রোকন রেজা শেখ পেয়েছেন ৫৪ হাজার ৭৯৯ ভোট।

আরও পড়ুন : ‘বিজয়ী’ ধানের শীষ প্রার্থীকে অভিনন্দন জানালেন আলোচিত আইনজীবী শিশির মনির

নোয়াখালী-১ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন পেয়েছেন ১ লাখ ২৬ হাজার ৮৩৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের জেলা শূরা ও কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা মো. ছাইফ উল্যাহ (দাঁড়িপাল্লা) পেয়েছেন ৯৮ হাজার ৩৬ ভোট। ব্যারিস্টার এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন ২৮ হাজার ৭৯৭ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন।

পাবনা-৫ আসনে ১৭ হাজার ৯৮৩ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৮১ হাজার ১৬৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রিন্সিপাল ইকবাল হোসাইন পেয়েছেন ১ লাখ ৬৩ হাজার ১৮৬ ভোট।

ঝিনাইদহ-১ আসন থেকে সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল মো.আসাদুজ্জামান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৯৮ ভোট। তার বিপরীতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট পড়েছে ৫৫ হাজার ৫৭৭। মো. আসাদুজ্জামান ১ লাখ ১৬ হাজার ২১ ভোটে জয়ী হয়েছেন।

নেত্রকোনা-১ আসনে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের মহাসচিব ও বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ধানের শীষ প্রতীকে বিজয়ী হয়েছেন। প্রাপ্ত ভোটের তথ্য অনুযায়ী, ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৪৩ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের শরিকদল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের গোলাম রব্বানী রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৭ হাজার ৪৮৮ ভোট। ৭০ হাজার ৮৫৫ ভোটে জয়ী হন এ বিএনপি নেতা।

পঞ্চগড়-১ আসনে বিএনপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির ৮ হাজার ১২০ ভোটের ব্যবধানে জয় পেয়েছেন। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৯ ভোট পান। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সারজিস আলম শাপলা কলি প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট।

আরও পড়ুন : বিপুল ভোটে হেরে গেলেন ব্যারিস্টার ফুয়াদ

চট্টগ্রাম-৫ আসনে সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ধানের শীষ প্রতীকে ৯৯ হাজার ৯৬৫ ভোটের বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। বিএনপির এ নেতা পেয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৯৬৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন মুনির (রিকশা প্রতীক) পেয়েছেন ৪৪ হাজার ভোট।

নাটোর-১ আসনে অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমীন পুতুল ১২ হাজার ৭৮৪ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। তিনি ১ লাখ ২ হাজার ১৯৭ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থী আবুল কালাম পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৪৩১ ভোট।

লালমনিরহাট-১ আসনে ৭ হাজার ৩০৯ ভোটে জিতেছেন ব্যারিস্টার হাসান রাজীব প্রধান। তিনি ৯২ হাজার ৭৯৮ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রার্থী জামায়াতের আনোয়ারুল ইসলাম রাজু দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ৮৫ হাজার ৪৮৯ ভোট।

সিলেট-৬ আসনে ১০ হাজার ৮৮৫ ভোটের ব্যবধানে দাঁড়িপাল্লার সেলিম উদ্দিনকে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন ধানের শীষ প্রতীকের অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। এমরান আহমদ চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৮ হাজার ৬২২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মো. সেলিম উদ্দিনের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রাপ্ত ভোট ৯৭ হাজার ৭৩৭।

ভোলা-১ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান (পার্থ) দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হয়েছেন।

বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান গরুর গাড়ি প্রতীক নিয়ে ১ লাখ ৫ হাজার ৫৪৩ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৩৩৭ ভোট। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের ওবায়দুর রহমান হাতপাখা প্রতীকে ২৫ হাজার ৩৪৫ ভোট পেয়েছেন।

দাঁড়িপাল্লায় জয়ী আইনজীবীরা

দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন জোট-নির্ভর দল হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজস্ব শক্তির প্রদর্শন করেছে। ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হওয়া এই নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফলে দলটি এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে, যা তাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ। জোটগত হিসাবে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৭। ফলে সরকার গঠনের পর্যায়ে না পৌঁছালেও বিরোধী দলের আসনে বসতে যাচ্ছে জামায়াত।

এককভাবে ৬৮টি আসনে জয় জামায়াতে ইসলামীর তিনজন আইনজীবী নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্যে পাবনা-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলটির সাবেক আমির ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ড. ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন নির্বাচিত হয়েছেন। দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে তিনি ১ লাখ ২৮ হাজার ৪৬৭ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ভিপি শামসুর রহমান (ধানের শীষ) প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৬৬৩ ভোট।

কুড়িগ্রাম-৩ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুব আলম সালেহী ১ লাখ ৭ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এই আসনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী তাসভীর উল ইসলাম (ধানের শীষ) পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৩৫২ ভোট। এ আসনে ভোটের হার ৬১ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

এছাড়া ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ব্যারিস্টার আহমদ বিন কাশেম আরমান বিজয়ী হয়েছেন। আসনটির মোট ১৭৩ কেন্দ্রের ফলাফল থেকে জানা যায়, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ব্যারিস্টার আরমান ৯৬ হাজার ৭৮৪ ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সানজিদা ইসলাম তুলি ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে পেয়েছেন ৮০ হাজার ৯২৭ ভোট। ব্যারিস্টার আরমান ১৫ হাজার ৮৫৭ ভোটের ব্যবধানে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন।

ব্যারিস্টার আরমান আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে প্রায় আট বছর ধরে গুমের শিকার ছিলেন। তিনি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শহীদ মীর কাসেম আলীর ছেলে।

এনসিপি ও স্বতন্ত্র আইনজীবীদের সাফল্য

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ছয়টি আসনে জয়লাভ করেছে তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এ ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন ১৫-এর বেশি প্রার্থী। গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া দলটির প্রার্থীরা এ নির্বাচনে মোট ২৩ লাখ ৬৫ হাজার ৫০১ ভোট পেয়েছেন, যা মোট ভোটের প্রায় ১ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন নির্বাচিত হয়েছেন। আব্দুলাহ আল আমিন শাপলা কলি প্রতীকে ১,০৪,৪৮২ ভোট পেয়েছেন।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি সমর্থিত জোট জমিয়তে ওলামা ইসলামের প্রার্থী মনির হোসাইনসাইন কাসেমী ৮০,১৩৮ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ শাহ আলম (হরিণ প্রতিক) ৩৯,৩৮৩ ভোট পেয়েছেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ বহিষ্কৃত বিএনপি নেত্রী ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বিজয়ী হয়েছেন। তিনি হাঁস প্রতীকে মোট পেয়েছেন ৭০ হাজার ৯০২ ভোট। এ আসনে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ জুনায়েদ আল হাবীব পেয়েছেন ৪৬ হাজার ৯৩৭ ভোট।

এছাড়া জাতীয় পার্টির দপ্তর সম্পাদক মো. আলমের তথ্যমতে, এবার তাদের দল থেকে ১৫ জন আইনজীবীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তবে দলটির মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী ছাড়া কোন আসনে কে লড়ছেন তাদের নাম জানাতে পারেননি। জাতীয় পার্টির কোন প্রার্থী এবারের নির্বাচনে জয়ী হতে পারেননি।

আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২৯৮টি আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে আইনজীবী ছিলেন মাত্র ২৫ জন। তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী অন্তর্ভুক্ত। প্রচলিত ধারা অনুযায়ী আইন প্রণয়নের উদ্যোগ সাধারণত সরকারের পক্ষ থেকেই আসে; তবে সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো আইন কার্যকর করা সম্ভব নয়। সংসদে বিল আকারে উত্থাপিত কোনো আইন প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে একজন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগত কিংবা সমষ্টিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে আইনপ্রণেতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারেন।

পরিসংখ্যান বলছে, দশম জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসনসহ মোট ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে আইনজীবী ছিলেন ৫১ জন, যা মোট সদস্যের ১৪ দশমিক ৫৭ শতাংশ। একাদশ সংসদে এই হার ছিল প্রায় ১৩ শতাংশ। তবে দ্বাদশ সংসদে নির্বাচিত আইনজীবীর সংখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ হার কমে ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রাপ্ত তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে আইনজীবীর সংখ্যা আরো কমেছে। এবারের নির্বাচনে ২৯৭টি আসনে সব দল মিলিয়ে জয় পেয়েছেন মাত্র ১৯ জন আইনজীবী, যা মোট সদস্যের ৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

নির্বাচনে আইনজীবীদের অংশগ্রহণের সংখ্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, এবারের নির্বাচনে অধস্তন আদালত থেকে উঠে আসা প্রার্থীদের তেমন কাউকে চোখে পড়েনি। অথচ সংসদের প্রধান কাজ হলো আইন প্রণয়ন। সে বিবেচনায় সংসদে আইনজীবীদের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়াই স্বাভাবিক।

তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশের সংসদেই আইনজীবীদের প্রাধান্য দেখা যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশেরও বেশি। কিন্তু আমাদের দেশে চিত্রটি ভিন্ন।

ড. শাহদীন মালিক বলেন, মনোনয়নপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে আইনজীবীরা প্রায়ই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। কারণ ব্যবসায়ীরা সাধারণত অর্থনৈতিকভাবে বেশি শক্তিশালী। ফলে সংসদ সদস্যদের মূল দায়িত্ব আইন প্রণয়ন হলেও সংসদে পেশাগতভাবে আইনজীবীর সংখ্যা ক্রমাগত কমছে।