রাজধানীর ডেমরা থানাধীন কোনাপাড়া এলাকায় অবৈধভাবে বিপজ্জনক মেডিকেল বর্জ্য ও লেড অ্যাসিড ব্যাটারি পোড়ানোর মাধ্যমে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবিতে একজন আইনজীবী লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন।
ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আনিস উদ্দিন মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) জনস্বার্থে একটি “Public Interest, Preventive and Pre Litigation Notice” প্রেরণ করেন।
লিগ্যাল নোটিশটি পাঠানো হয়েছে মহাপরিচালক, পরিবেশ অধিদপ্তর; প্রশাসক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন; জেলা প্রশাসক, ঢাকা জেলা; এবং অফিসার ইনচার্জ, ডেমরা থানা-এর নিকট। অনুলিপি পাঠানো হয়েছে মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং পুলিশ কমিশনার, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর কাছেও।
নোটিশে বলা হয়, ডেমরা থানাধীন কোনাপাড়া এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে গভীর রাতের আঁধারে বিপজ্জনক মেডিকেল বর্জ্য ও পুরাতন লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি খোলা স্থানে পোড়ানোর অবৈধ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। এই কর্মকাণ্ড পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য এবং আইনের শাসনের জন্য একটি গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়, ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, স্যালাইনের ব্যাগ, রক্তমাখা গজ, সংক্রামক চিকিৎসা বর্জ্যসহ বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান কোনো ধরনের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ছাড়াই খোলা স্থানে আগুন দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে পুরাতন লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি গলিয়ে সিসা সংগ্রহের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এর ফলে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত ধোঁয়া ও ভারী ধাতব কণা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে এবং আশপাশের পরিবেশ মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
নোটিশে আরও বলা হয়, এসব কার্যক্রমের ফলে বাতাসে সিসা (Lead), ডাইঅক্সিন (Dioxins), ফিউরান (Furans) এবং অন্যান্য বিষাক্ত রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ছে। এসব উপাদান মানবদেহে প্রবেশ করে স্নায়ুতন্ত্র, ফুসফুস, কিডনি ও মস্তিষ্কের মারাত্মক ও স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, যা একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন : ভূমি জালিয়াতি বন্ধে বাধ্যতামূলক ‘রিয়েল এস্টেট এজেন্ট’ চালুর দাবিতে আইনি নোটিশ
স্থানীয় বাসিন্দাদের উদ্ধৃতি দিয়ে নোটিশে বলা হয়, এলাকাবাসী নিয়মিত শ্বাসকষ্ট, তীব্র কাশি, বুকে চাপ, চোখ ও গলায় জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা এবং শারীরিক দুর্বলতায় ভুগছেন। বিষাক্ত ধোঁয়ার তীব্রতা এতটাই বেশি যে অনেক সময় দরজা-জানালা বন্ধ রেখেও এর ক্ষতিকর প্রভাব এড়ানো যাচ্ছে না। ফলে এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং বসবাসের পরিবেশ ক্রমেই অনিরাপদ হয়ে উঠছে।
আইনি নোটিশে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, পবিত্র রমজান মাসে এই অবৈধ কার্যক্রমের কারণে স্থানীয় রোজাদার জনগণ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সেহরি ও তাহাজ্জুদের সময় বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে ধর্মীয় ইবাদত-বন্দেগিতে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি হচ্ছে। রোজাদার ব্যক্তি, শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ বিশেষভাবে শারীরিক কষ্ট ও দুর্ভোগের সম্মুখীন হচ্ছেন, যা মানবিক ও সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক ও অগ্রহণযোগ্য বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
নোটিশে বলা হয়, এসব কার্যক্রম স্পষ্টভাবে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫, মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০০৮ এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর বিধানসমূহের গুরুতর লঙ্ঘন। একই সঙ্গে এটি নাগরিকদের নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে বসবাসের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
এই প্রেক্ষাপটে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোরালো দাবি জানানো হয়েছে—অবিলম্বে ঘটনাস্থলে তদন্ত পরিচালনা করে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি উক্ত অবৈধ কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ নিশ্চিত করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জোরদার করতে হবে।
আইনি নোটিশে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, নোটিশ প্রাপ্তির সাত দিনের মধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে জনস্বার্থে হাইকোর্ট বিভাগ-এ রিট পিটিশন দায়েরসহ প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। এর ফলে উদ্ভূত সকল দায়-দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই বহন করতে হবে বলে নোটিশে উল্লেখ করা হয়।

