এম. আই. মিরাজ : আইনজীবী হওয়ার স্বপ্ন কখনোই সহজ ছিল না—এমন বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে নবীন আইন শিক্ষানবিশদের মধ্যে আবারও আলোচনার জন্ম দিয়েছে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের দীর্ঘ ও অনিশ্চিত পরীক্ষা প্রক্রিয়া। লিখিত পরীক্ষা, রিভিউ, ভাইভা এবং সর্বশেষ সনদ—এই ধাপে ধাপে দীর্ঘসূত্রতা একজন শিক্ষানবিশের জীবনের মূল্যবান সময় কেড়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নবীনদের ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও পরীক্ষার ফল প্রকাশ না হওয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমার অভাব এবং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তাদের মানসিক ও পেশাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অনেকেই বলছেন, আইন পেশায় প্রবেশের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা যেন এক ধরনের “নীরব পরীক্ষা”, যেখানে মেধার পাশাপাশি ধৈর্য ও ভাগ্যও বড় ভূমিকা রাখে।
আইন শিক্ষানবিশরা বার কাউন্সিলকে অভিভাবক হিসেবে দেখলেও সেই অভিভাবকত্বের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তাদের মতে, অভিভাবকের দায়িত্ব শুধু পরীক্ষা নেওয়ায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং সময়মতো, স্বচ্ছ ও মানবিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নবীনদের পাশে দাঁড়ানোও এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
আরও পড়ুন : বরিশালে বার ও বেঞ্চ: এক রথের দুই চাকা যখন মুখোমুখি!
তুলনামূলকভাবে দেশ-বিদেশে আইন পেশায় প্রবেশের জন্য সুসংগঠিত ও সময়সীমাবদ্ধ ব্যবস্থা থাকলেও বাংলাদেশে এখনো অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘসূত্রতা কাটেনি। এতে করে একজন শিক্ষানবিশের শ্রম, মেধা ও স্বপ্নের প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
শিক্ষানবিশদের দাবি, তারা কোনো দয়া চান না—চান ন্যায্যতা ও স্বচ্ছতা। একই সঙ্গে তারা আধুনিক, সময়সীমাবদ্ধ ও প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষা পদ্ধতি চালুর আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, পরবর্তী প্রজন্মকে এই দীর্ঘ অপেক্ষার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত করা না গেলে আইন পেশা দুর্বল হয়ে পড়বে, যার প্রভাব পড়বে পুরো বিচারব্যবস্থার ওপর।
বর্তমানে ভাইভা পরীক্ষার ফল এখনো প্রকাশ হয়নি। শিক্ষানবিশদের ধারণা, লিখিত পরীক্ষার রিভিউ ফল শিগগিরই প্রকাশিত হতে পারে, এরপর ঈদের পর ভাইভা পরীক্ষা এবং তার পর মূল সনদের ফলাফল। অর্থাৎ সামনে আরও অন্তত দুই মাসের অপেক্ষা।
অনেক শিক্ষানবিশ মনে করছেন, এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তারা না পাচ্ছেন বার কাউন্সিলের যথাযথ মূল্যায়ন, না পাচ্ছেন আদালতের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। এতে নিজেদের ‘অদৃশ্য’ ও ‘অবমূল্যায়িত’ মনে হওয়ার অনুভূতি তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা আশা করছেন, Bangladesh Bar Council সময়ের বাস্তবতা অনুধাবন করে আইন পেশায় প্রবেশের পথকে অনৈতিক লেনদেন ও অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রতা থেকে মুক্ত করবে। দেশ-বিদেশের আধুনিক ও স্বচ্ছ মডেল অনুসরণ করে একটি কার্যকর, সময়োপযোগী ও মানবিক ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
শিক্ষানবিশদের ভাষায়, তারা শুধু একটি সনদের জন্য অপেক্ষা করছেন না—তারা অপেক্ষা করছেন ন্যায়ের পথে দাঁড়ানোর বৈধ অধিকারটির জন্য।
লেখক : শিক্ষানবিশ আইনজীবী, রাজশাহী জজ কোর্ট।

