অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক
অ্যাডভোকেট সিরাজ প্রামাণিক

এক চেকে দুই লিগ্যাল নোটিশ: আইনি জটিলতা ও সমাধানের পথ!

সিরাজ প্রামাণিক : চেকের মামলায় (এন.আই এ্যাক্ট ১৩৮) আসামির প্রতি লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো মামলার প্রথম ধাপ। কিন্তু দুইবার লিগ্যাল নোটিশ দেওয়ার বিষয়টি খুবই সংবেদনশীল। আপনি যদি দুইবার নোটিশ পাঠিয়ে থাকেন, তবে মামলার ফলাফল মূলত ‘কেন’ এবং ‘কীভাবে’ দ্বিতীয় নোটিশটি দেওয়া হয়েছে তার ওপর নির্ভর করবে।

আইনের দৃষ্টিতে, চেক ডিজঅনার হওয়ার পর নোটিশ দেওয়ার ৩০ দিন পর মামলা করার সময় শুরু হয়। দুইটি নোটিশের ক্ষেত্রে মামলাটি টিকবে কি-না তা নিচের তিনটি পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

১। যদি প্রথমবার ডিজঅনার হওয়ার পর নোটিশ দিয়ে মামলা না করে, আপনি চেকটি পুনরায় ব্যাংকে জমা দিয়ে নতুন করে ডিজঅনার স্লিপ সংগ্রহ করেন এবং তারপর দ্বিতীয় নোটিশ পাঠান,তবে আপনার মামলাটি আইনত সম্পূর্ণ বৈধ। এক্ষেত্রে নতুন করে ‘কজ অব একশন’ তৈরি হয়েছে এবং আদালত এটিকে ইতিবাচকভাবে দেখবে।

২। একই ডিজঅনার স্লিপের ওপর দুইবার নোটিশ পাঠানো (ঝুঁকিপূর্ণ) যদি চেকটি পুনরায় জমা না দিয়ে, একই ডিজঅনার স্লিপের ওপর ভিত্তি করে আপনি দ্বিতীয়বার নোটিশ পাঠান, তবে মামলাটি খারিজ হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।

কারণ আইন অনুযায়ী, প্রথম নোটিশ দেওয়ার সাথে সাথেই আপনার মামলার সময় ‘কজ অব একশন’ গণনা শুরু হয়। প্রথম নোটিশের ৩০ দিন পর থেকে ৩০ দিনের মধ্যে মামলা না করলে সেটি তামাদি হয়ে যায়। দ্বিতীয় নোটিশ দিয়ে আপনি এই তামাদি সময়কে আর বাড়াতে পারবেন না।

৩। যদি প্রথম নোটিশটি ভুল ঠিকানায় পাঠানো হয়, অথবা আইনি কোনো ত্রুটি থাকে (যেমন: ভুল অংক বা ভুল রেফারেন্স), তবে আদালত দ্বিতীয়বার সঠিক নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। সেক্ষেত্রে আপনাকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে যে, কেন প্রথম নোটিশটি কার্যকর ছিল না।

আরও পড়ুন : চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিশ: আসামী খালাস পেতে পারে!

সৈয়দ মোজাফফর হোসেন বনাম রাষ্ট্র (৫১ ডিএলআর, এডি, পৃষ্ঠা ২০৩) মামলায় আপিল বিভাগ সিদ্ধান্ত দিয়েছে যে, যদি একজন পাওনাদার একবার নোটিশ দেন এবং সেই নোটিশের ভিত্তিতে মামলা না করে আবার দ্বিতীয়বার নোটিশ দেন, তবে দ্বিতীয় নোটিশটি আইনগতভাবে অকার্যকর হবে। অর্থাৎ, প্রথম নোটিশের মাধ্যমেই মামলার সময়সীমা শুরু হয়ে যায়।

সদানন্দন ভদন বনাম মাধবন সুনীল কুমার (এআইআর ১৯৯৮, সুপ্রিম কোর্ট, ৩০৪০) এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স। যদিও এটি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়, তবে বাংলাদেশের এন.আই অ্যাক্টের মামলায় এটি ব্যাপকভাবে অনুসরণ করা হয়। এই রায়ের মূল কথা হলো: একটি চেকের বিপরীতে পাওনাদার একাধিকবার ব্যাংকে উপস্থাপন করতে পারেন। কিন্তু যদি একবার লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে দেন, তবে ওই চেকের বিপরীতে একটি মাত্র ‘কজ অব একশন’ তৈরি হবে। পরবর্তীতে পুনরায় চেক উপস্থাপন করে দ্বিতীয়বার নোটিশ পাঠিয়ে নতুন করে সময়সীমা শুরু করা যাবে না।

এ জাতীয় ঘটনায় আসামীপক্ষ মামলাটি খারিজ করার জন্য দুটি উপায়ে আগাতে পারেন:

১। ডিসচার্জ পিটিশন: মামলাটি বর্তমানে যে আদালতে আছে (যুগ্ম জেলা জজ বা দায়রা আদালত), সেখানে অভিযোগ গঠনের সময় আপনি ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬৫(সি) ধারায় একটি আবেদন করতে পারেন। সেখানে যুক্তি দেবেন যে, বাদী প্রথম নোটিশের পর নির্ধারিত সময়ে মামলা না করে দ্বিতীয় নোটিশের মাধ্যমে তামাদি মামলা করেছেন।

২। কোয়াশমেন্ট: যদি ট্রায়াল কোর্ট আপনার আবেদন গ্রহণ না করে, তবে আপনি মহামান্য হাইকোর্টে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারায় মামলাটি বাতিল বা ‘কোয়াশ’ করার জন্য আবেদন করতে পারেন। হাইকোর্ট সাধারণত এ ধরনের টেকনিক্যাল গ্রাউন্ড বা আইনগত ত্রুটি থাকলে মামলা বাতিল করে দিতে পারেন।

এজন্য আপনাকে কিছু প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস সংগ্রহ করতে হবে, যেমন ক। প্রথম লিগ্যাল নোটিশের কপি এবং সেটি গ্রহণের তারিখ (এডি কার্ড), খ। দ্বিতীয় লিগ্যাল নোটিশের কপি, গ। দুই নোটিশের মধ্যবর্তী সময়ের ব্যবধান।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও আইন গবেষক। ই-মেইল:seraj.pramanik@gmail.com