তিনদিন পর বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে বরিশাল আদালত প্রাঙ্গণ। পূর্বঘোষিত আদালত বর্জন কর্মসূচি স্থগিত করে রোববার (১ মার্চ) সকাল থেকে আদালতে ফিরেছেন আইনজীবীরা। এতে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বিচারপ্রার্থীরা।
এর আগে বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার মো. ইউনুস–এর জামিন আদেশ ঘিরে আদালত প্রাঙ্গণে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। বিচারকের উপস্থিতিতেই অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের এজলাসে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে বিএনপিপন্থি আইনজীবীদের বিরুদ্ধে। ওই ঘটনায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতিসহ অন্তত ২০ জনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের করা হয়।
মামলায় জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এস এম সাদেকুর রহমান লিংকন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
কর্মসূচি স্থগিতের সিদ্ধান্ত
ওই ঘটনার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ নেতার জামিন বাতিল, সংশ্লিষ্ট বিচারকের অপসারণ এবং সমিতির সভাপতি লিংকনের মুক্তির দাবিতে টানা তিন দিন আদালত বর্জন কর্মসূচি পালন করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।
পরে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতি আদালত বর্জনের কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করে। একই সিদ্ধান্তে সায় দেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, বরিশাল ইউনিট।
জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মির্জা মো. রিয়াজ হোসেন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিচারপ্রার্থী জনগণের দুর্ভোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে ১ মার্চ থেকে পূর্বঘোষিত কর্মসূচি স্থগিত করা হলো।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম বরিশাল জেলা ইউনিটের আহ্বায়ক মো. নাজিম উদ্দিন আহমেদ পান্না ও সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ ইমন পৃথক নোটিশে জানান, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আদালত বর্জন স্থগিত থাকবে।
বিচারপ্রার্থীদের স্বস্তি
মেহেন্দিগঞ্জ থেকে হাজিরা দিতে আসা মো. কালাম হোসেন বলেন, “বুধবার এসে ফিরে গেছি, তখন আইনজীবীরা আদালত বর্জন করেছিলেন। আজ আবার এসেছি, আশা করছি জামিন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারবো।”
বরিশাল মহানগর হাকিম আদালতের এপিপি হাফিজ আহমেদ বাবলু বলেন, আদালত ও আইনজীবীদের মধ্যে যে ভুল বোঝাবুঝি ছিল, তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে এগিয়েছে।
তবে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ ইমন বলেন, উভয় পক্ষ সমঝোতার দিকে এগোচ্ছে। আলোচনার প্রক্রিয়া চলমান থাকায় আপাতত কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়েছে।
আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীদের প্রতিবাদ
এদিকে আদালতের এজলাসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা। আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের ৪৯ জনের স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আদালত চলাকালে বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং আদালতের আসবাবপত্র ভাঙচুরের তীব্র প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাধারণ আইনজীবীদের মতামত উপেক্ষা করে আইনজীবী সমিতির নামে আদালত বর্জনের সিদ্ধান্তে তারা একমত নন।
ঘটনার পটভূমি
২০১৭ সালের হত্যাচেষ্টা ও অঙ্গহানির ঘটনায় ২০২৪ সালের নভেম্বরে দায়ের করা একটি মামলায় ২৩ ফেব্রুয়ারি বরিশালের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করেন তালুকদার মো. ইউনুস। আদালত তাকে জামিন দেন। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২৪ ফেব্রুয়ারি মুখ্য মহানগর হাকিম ও অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত বর্জন করেন বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা।
পরে আদালত চলাকালে এজলাসে প্রবেশ করে বিচার কাজে বাধা, ভাঙচুর ও বিচারকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ ওঠে কয়েকজন আইনজীবীর বিরুদ্ধে। বেঞ্চ সহকারীর দায়ের করা মামলায় সভাপতি, সম্পাদক এবং পিপি এপিপিসহ মোট ১২ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সভাপতি লিংকনকে গ্রেপ্তার করে। এর প্রতিবাদে ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য আদালত বর্জন কর্মসূচি শুরু হয়।
রোববার থেকে বরিশালের আদালতগুলোতে স্বাভাবিক বিচারিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয়েছে।

