আওয়ামী লীগ শাসনামলে শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিতে এসে ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণের মুখে পড়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত ইকবাল করিম ভূঁইয়া। জেরার এক পর্যায়ে তাকে উদ্দেশ করে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আপনি উত্তরপাড়ার বিশেষজ্ঞ, আমরা দক্ষিণপাড়ার বিশেষজ্ঞ। আপনাকে এত প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে হবে না। আপনি বুঝেশুনে উত্তর দিবেন।’
রোববার (১ মার্চ) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল ১ এ মন্তব্য করেন। এদিন আসামির উপস্থিতিতে জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্য ও জেরা গ্রহণের চতুর্থ দিন ছিল।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলাটিতে একমাত্র আসামি মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত জিয়াউল আহসান। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সংঘটিত শতাধিক গুম ও খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে।
আসামিপক্ষে জেরা করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো। শুনানিকালে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তী জেরার জন্য ৩ মার্চ দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
গুমের সংখ্যা ও ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য
জেরায় ইকবাল করিম বলেন, তিনি সেনাপ্রধান থাকাকালে কতজন গুম হয়েছেন তার সঠিক সংখ্যা বলতে পারবেন না। গুম হওয়া ব্যক্তিদের কাউকে উদ্ধারের চেষ্টা করেননি বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, বিষয়টি তার দায়িত্বাধীন ছিল না এবং কে কখন কোথায় গুম হয়েছেন সে তথ্যও তার জানা ছিল না।
তিনি আরও বলেন, কে বা কারা গুম হচ্ছেন সে বিষয়ে সামরিক গোয়েন্দা পরিদপ্তর সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি। তবে গুমের ঘটনা ঘটছে বলে তারা তাকে জানিয়েছিল।
গুমের সংস্কৃতি প্রতিরোধে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করলেও এ সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেননি তিনি। সুপার চিফ বা প্রধানমন্ত্রী বরাবরে কোনো লিখিত চিঠি দেননি বলেও স্বীকার করেন সাবেক সেনাপ্রধান।
‘জলসিঁড়ি’ প্রকল্প নিয়ে জেরা
পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর আবাসন প্রকল্প ‘জলসিঁড়ি’ নিয়ে বিস্তারিত প্রশ্ন করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী। জবাবে ইকবাল করিম বলেন, তিনি ওই প্রকল্পের প্রধান ছিলেন। রূপগঞ্জ থানার কায়েতপাড়া এলাকার ২৪টি মৌজায় জমি কেনা নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনা স্বীকার করেন তিনি।
তার বক্তব্য, সেনা ক্যাম্পে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আত্মরক্ষার্থে গুলি চালানো হয়েছিল। ঘটনাকালে জেনারেল মুবিন সেনাপ্রধান ছিলেন এবং সেনাবাহিনীর সামরিক অপারেশন পরিদপ্তর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছিল।
জমির মূল্য সম্পর্কে তিনি বলেন, বিঘাপ্রতি ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকায় জমি কেনা হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া তার এখতিয়ারের মধ্যে ছিল না। তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো কোর্ট অব ইনকোয়ারি হয়নি বলেও তিনি জানান।
জাতীয় প্রকল্প ও পোস্টিং ইস্যু
পদ্মা সেতু ও ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্পে সেনাবাহিনীর সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক প্রকল্পে সেনাবাহিনী যুক্ত ছিল, তবে সুনির্দিষ্ট সংখ্যা তার মনে নেই। এসব প্রকল্পে দুর্নীতি হয়েছিল কি না, তা তার জানা নেই বলেও উল্লেখ করেন।
জেরার এক পর্যায়ে কর্মকর্তাদের পোস্টিং বিষয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিলে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা তাকে সতর্ক করে বলেন, এটি সর্বোচ্চ আদালত। সাবধানে কথা বলতে হবে। কোনো বক্তব্য তার নিজের বা মামলার ক্ষতির কারণ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

