একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তার যুবসমাজের ওপর।
এই কথাটি শুধু একটি সাধারণ বক্তব্য নয়; এটি একটি বাস্তব সত্য। কারণ যে সমাজে তরুণরা সৃজনশীলতা, শিক্ষা ও কর্মের মাধ্যমে এগিয়ে যায়, সেই সমাজ দ্রুত উন্নতির পথে এগোয়। কিন্তু যখন সেই তরুণদের একটি বড় অংশ মাদকাসক্তির অন্ধকারে ডুবে যেতে শুরু করে, তখন সেই জাতির ভবিষ্যৎও অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
মাদকাসক্তি এমন একটি সামাজিক সংকট, যা হঠাৎ বিস্ফোরণের মতো দৃশ্যমান হয় না। এটি ধীরে ধীরে একটি সমাজকে ভিতর থেকে ক্ষয় করে। পরিবার ভেঙে যায়, স্বপ্ন ভেঙে যায় এবং একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্ম হারিয়ে যেতে থাকে।
বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনমিতিক সময় পার করছে। দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ। অর্থনীতিবিদরা একে “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” বলে অভিহিত করেন। এই তরুণ শক্তিই দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার কথা। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো—এই তরুণদের একটি অংশ ক্রমেই মাদকাসক্তির দিকে ঝুঁকছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা (UNODC)-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো ধরনের মাদক ব্যবহার করে। প্রতিবছর মাদকাসক্তির কারণে অসংখ্য মানুষ মৃত্যুবরণ করছে এবং লক্ষ লক্ষ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে।
কেন তরুণরা মাদকের দিকে ঝুঁকছে?
মাদকাসক্তির পেছনে একাধিক সামাজিক ও মানসিক কারণ কাজ করে।
প্রথমত, বন্ধুমহলের প্রভাব।
কিশোর ও তরুণ বয়সে বন্ধুদের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী। অনেক সময় কৌতূহল বা বন্ধুদের উৎসাহে প্রথমবার মাদক গ্রহণ করা হয়। পরে তা অভ্যাসে এবং শেষে আসক্তিতে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, পারিবারিক অবহেলা।
পরিবারে পর্যাপ্ত স্নেহ, যোগাযোগ এবং মানসিক সমর্থনের অভাব তরুণদের বিচ্ছিন্ন করে তোলে। সেই শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে অনেকেই মাদককে আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়।
তৃতীয়ত, বেকারত্ব ও হতাশা।
শিক্ষিত বেকারত্ব অনেক তরুণকে হতাশ করে তোলে। ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তাদের মানসিকভাবে দুর্বল করে দেয়।
চতুর্থত, মাদকের সহজলভ্যতা।
সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে ইয়াবা ও অন্যান্য মাদক সহজেই দেশে প্রবেশ করছে।
মানবিক ট্র্যাজেডি: মাদক যে স্বপ্ন ভেঙে দেয়
মাদকাসক্তির প্রকৃত ভয়াবহতা বোঝাতে বাস্তব জীবনের গল্পগুলো অত্যন্ত শক্তিশালী।
মেধাবী ছাত্র থেকে পুনর্বাসন কেন্দ্রে
ঢাকার একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল রাশেদ। স্কুল ও কলেজে সে ছিল অত্যন্ত মেধাবী। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় প্রথমে গাঁজা এবং পরে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে পড়ে।
ধীরে ধীরে তার পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যায় এবং পরীক্ষায় খারাপ ফল করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে বহিষ্কার করে। বর্তমানে সে একটি পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন।
মাদকের জন্য মায়ের গয়না বিক্রি
চট্টগ্রামের সোহেল কলেজে পড়ার সময় ফেনসিডিল সেবন শুরু করে। পরে সে হেরোইনে আসক্ত হয়ে পড়ে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে একসময় সে মায়ের গয়নাও বিক্রি করে দেয়। পরিবার শেষ পর্যন্ত তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে বাধ্য হয়।
মাদক থেকে অপরাধে
রাজশাহীর মিজান ইয়াবার নেশায় জড়িয়ে পড়ে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সে চুরি শুরু করে এবং পরে একটি ডাকাতি মামলায় জড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে সে কারাগারে বন্দি।
স্বপ্নভঙ্গের গল্প
তানভীর ছিল একজন কলেজ শিক্ষার্থী, যার স্বপ্ন ছিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার। কিন্তু আইস ও ইয়াবার নেশা তার স্নায়ুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এখন সে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে না।
বাংলাদেশের আইন ও বাস্তবতা
বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই আইনে মাদক উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিপুল পরিমাণ মাদক পাচারের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়ার বিধান রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র কঠোর আইন প্রয়োগ সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মাদক সমস্যার মোকাবিলায় ভিন্ন ভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে।
সিঙ্গাপুর কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মাদক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।
পর্তুগাল ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য অল্প পরিমাণ মাদককে অপরাধ হিসেবে না দেখে স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে সেখানে মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন “War on Drugs” নীতি অনুসরণ করলেও এখন অনেক অঙ্গরাজ্যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
করণীয়: সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন
মাদকাসক্তি প্রতিরোধের জন্য একটি সমন্বিত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। এটি কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব নয়।
প্রথমত, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। বাংলাদেশের অনেক মাদক সীমান্তবর্তী দেশ থেকে চোরাচালানের মাধ্যমে আসে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে সীমান্ত নজরদারি বাড়াতে হবে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা শিক্ষা চালু করা দরকার। স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদকবিরোধী কর্মসূচি, কাউন্সেলিং এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, পরিবারের ভূমিকা শক্তিশালী করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং তাদের মানসিক অবস্থার প্রতি নজর রাখা জরুরি।
চতুর্থত, পুনর্বাসন ও চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত করা দরকার। অনেক মাদকাসক্ত ব্যক্তি চিকিৎসা নিতে চাইলেও পর্যাপ্ত সুযোগ পায় না। মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র বাড়াতে হবে।
পঞ্চমত, যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। বেকারত্ব হতাশা তৈরি করে, আর সেই হতাশা অনেক সময় মাদকাসক্তির দিকে ঠেলে দেয়।
ষষ্ঠত, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করা দরকার। তরুণদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা গেলে তারা নেতিবাচক পথ থেকে দূরে থাকবে।
সপ্তমত, গণমাধ্যমের ভূমিকা বাড়ানো জরুরি। গণমাধ্যম সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অষ্টমত, কমিউনিটি পর্যায়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার। স্থানীয় সমাজ, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলো মাদকবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষকথা
মাদকাসক্তি কেবল একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি একটি সামাজিক ও জাতীয় সংকট। এটি এমন একটি নীরব মহামারী, যা ধীরে ধীরে একটি প্রজন্মকে গ্রাস করছে।
এই সমস্যার সমাধান শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রয়োজন পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ।
কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই শুরু হয় তার যুবসমাজকে রক্ষা করার মধ্য দিয়েই।
লেখক : শাহিনুর রহমান সাগর; PhD Scholar, মঙ্গলায়তন বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।

