মোঃ রওশন জাদীদ : চীন-কানাডীয় লেখক Dan Wang-এর একটি বহুল আলোচিত উক্তি হলো, “চীন গড়ে উঠেছে ইঞ্জিনিয়ারদের দ্বারা, আমেরিকা আইনজীবীদের দ্বারা এবং ভারত তথা আমরা গড়ে উঠেছি রাজনীতিবিদদের দ্বারা।” উক্তিটি নিছক একটি মন্তব্য হলেও এর মধ্যে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রগঠনের পেছনে নেতৃত্বের ধরন সম্পর্কে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত রয়েছে।
আজকের আমেরিকা তথা যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ও উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। সেমিকন্ডাক্টর, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ আধুনিক প্রযুক্তির বিভিন্ন ক্ষেত্রে এবং সামরিক শক্তির দিক থেকেও দেশটি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। অথচ এই যুক্তরাষ্ট্রই একসময় ব্রিটিশদের একটি উপনিবেশ ছিল। বরং আমাদের এই অঞ্চলের তুলনায় আরও আগে। ১৬০৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশরা সেখানে তাদের প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করে, ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনা ঘটে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জন এবং পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র হিসেবে তার দ্রুত অগ্রগতির পেছনে একদল আইনজীবীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি উপনিবেশে ব্রিটিশ সরকার অন্যায্যভাবে স্ট্যাম্প অ্যাক্ট (১৭৬৫) আরোপ করলে James Otis, John Adams এবং Patrick Henry-এর মতো আইনজীবীরা সংগঠিতভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। তাদের যুক্তিনির্ভর আন্দোলন ও সাংবিধানিক বিতর্ক উপনিবেশবাসীর মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তীকালে Thomas Jefferson এবং Alexander Hamilton-এর মতো প্রখ্যাত আইনজীবীরা আমেরিকার স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একটি বড় অংশই ছিলেন আইনজীবী।
১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে যে রাষ্ট্রব্যবস্থার সূচনা হয়, তার ভিত্তিতেই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, নাগরিক অধিকার এবং সাংবিধানিক শাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ নীতিগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়। একইসঙ্গে আইনি দর্শন, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার (Natural Justice), স্বাধীনতা এবং সরকারের জবাবদিহিতার মতো মৌলিক ধারণাগুলোও শুরু থেকেই রাষ্ট্রকাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন : কোয়ান্টামের যুগে সেকেলে বিচার ব্যবস্থা: পরিবর্তনের সময় কি আসেনি?
স্বাধীনতার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পাঁচজন রাষ্ট্রপতির মধ্যে চারজনই ছিলেন আইনজীবী। তারা নতুন রাষ্ট্রের জন্য একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে প্রধান বিচারপতি John Marshall বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনা (Judicial Review) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংবিধানকে একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ফলে সংবিধান ও আইনের শাসন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তিতে পরিণত হয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, আধুনিক যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি গঠনে আইনজীবী সমাজের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতীয় উপমহাদেশেও আইনজীবীরা রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। একইভাবে শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের মতো আইনপেশার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। পরবর্তীকালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠন ও সংবিধান প্রণয়নেও আমীর-উল ইসলাম এবং ড. কামাল হোসেনের মতো আইনজীবীদের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমান সময়ে আইনজীবী সমাজের কাছ থেকে যে ধরনের গঠনমূলক ভূমিকা প্রত্যাশিত ছিল, বাস্তবে তা অনেক ক্ষেত্রে অনুপস্থিত বলে প্রতীয়মান হয়। অনেক সময় পেশাগত ঐক্যের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিভাজনই বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অথচ আইনের মূল দর্শন হলো সকল নাগরিকের জন্য সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে আইনজীবীদের উচিত ব্যক্তিগত বা দলীয় অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা।
একটি রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী করতে আইনের শাসন অপরিহার্য। আর সেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আইনজীবী সমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই রাষ্ট্র ও সমাজের বৃহত্তর স্বার্থে আইনজীবীদের দায়িত্বশীল, ন্যায়নিষ্ঠ এবং পেশাগতভাবে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করাই সময়ের দাবি।
লেখক : অ্যাডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ। ই-মেইল : rawsan.zadid@yahoo.com

