মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ
মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ

জুনিয়র আইনজীবী: বিচারালয়ের নেপথ্য কারিগর

মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ : জীবনের রূঢ়তম সত্য হলো- যারা সাফল্যের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে, তারাই দিনশেষে চরম অবহেলার শিকার হয়। এই অবহেলার চিত্রটি সবচেয়ে প্রকটভাবে ধরা পড়ে আমাদের আদালত পাড়ায়, যেখানে নবীন আইনজীবীরা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নিরন্তর লড়াই চালিয়ে যান।

সম্প্রতি বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর, সেই ‘ভিত্তি গড়ার কারিগরদের’ কথা ভেবে স্মৃতিপটে ভেসে উঠছে। কয়েক বছর আগের একটি ঘটনা। একটি আইনজীবী সমিতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমরা কয়েকজন বিচারক আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। উপলক্ষ ছিল তেরোজন নবীন আইনজীবীর পেশাগত জীবনের অভিষেক। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা একে একে তাঁদের উত্তরসূরিদের অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন এবং সোনালি ভবিষ্যতের আশাবাদ ব্যক্ত করছিলেন।

আমার বক্তব্যের শুরুতেই জনৈক সিনিয়র আইনজীবী নেপথ্য থেকে কিছুটা টিপ্পনী কেটে বললেন, “এখানে জুনিয়রদের মনোবল ক্ষুণ্ণ করার জন্য কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।” তাঁর কণ্ঠস্বর ছিল অনমনীয় এবং ভঙ্গিটি বেশ রূঢ়।

কিন্তু আমি কী এমন বলেছিলাম?

আমি কেবল এইটুকুই বলেছিলাম- আপনার জুনিয়র আইনজীবীকে পরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য করুন। তাঁদের কখনো রিক্তহস্তে ফিরিয়ে দেবেন না। সব জুনিয়র সরাসরি মক্কেলের কাছ থেকে পারিশ্রমিক পান না। দিনশেষে সিনিয়র হিসেবে আপনি যা প্রদান করেন, সেটুকুই তাঁদের একমাত্র অবলম্বন। অনেক সিনিয়রের ধারণা, “সে তো আমার কাছে শিখতে এসেছে, আমি কেন তাকে অর্থ দেব?” তাঁরা মনে করেন, ‘লার্নিং’ এবং ‘আর্নিং’ কখনো সহাবস্থান করে না।

এই মানসিকতা শোচনীয়ভাবে ভ্রান্ত। কারণ সেই জুনিয়র সারাটা দিন আপনার পেশাগত সাফল্যের ভিত্তি নির্মাণেই নিজেকে উৎসর্গ করেন। এক আদালত থেকে অন্য আদালতে নথিপত্র হাতে ছুটে চলা আর আপনার মূল্যবান সময় বাঁচিয়ে দেওয়াই তাঁর ধ্যান-জ্ঞান। অথচ অনেক সময় তাঁর নিজের মধ্যাহ্নভোজটুকুও জোটে না।

বাস্তবতা হলো, অনেক জুনিয়রের পরিবার সম্পূর্ণভাবে আপনার দেওয়া ওই সামান্য সাম্মানিকের ওপর নির্ভরশীল। ঘরে হয়তো তাঁর সন্তান পথ চেয়ে থাকে- বাবা আজ ঈদের নতুন পোশাক আনবে তো? আমার কথায় সেই সিনিয়র আইনজীবী যখন লজ্জায় নুইয়ে পড়ছিলেন, তখন নবীনদের চোখেমুখে আমি আগামীর এক নতুন দিগন্ত দেখতে পাচ্ছিলাম।

সেদিন আমি দুটি বিশেষ জীবন-দর্শন দিয়ে বক্তব্য শেষ করেছিলাম:

প্রথমত, কোনো মামলাতেই মক্কেলকে অলীক নিশ্চয়তা দেবেন না। আমি নিজ চোখে দেখেছি, জামিন অযোগ্য একটি গুরুতর মামলায় আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে আদালতে ‘শুধু উঠবেন আর নামবেন’। কিন্তু আসামিরা ওঠার পর আর নামার সুযোগ পাননি, সরাসরি তাঁদের কারাগারে যেতে হয়েছিল।

ক্ষুব্ধ স্বজনরা তখন প্রকাশ্যেই আইনজীবীর লাঞ্ছনা করে অর্থ ফেরত চাইছিল- সেই দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। তাই সর্বদা পেশাদারিত্ব বজায় রেখে বলুন, আপনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এবং সাফল্যের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এই পেশার প্রারম্ভিক দিনগুলো প্রচণ্ড কণ্টকাকীর্ণ। প্রতিদিন মনে হতে পারে সব ছেড়ে চলে যাই। কিন্তু যারা ধৈর্য, শ্রম ও অদম্য একাগ্রতায় অন্তত পাঁচ বছর এই মাটির কামড় ধরে টিকে থাকতে পারবে, সাফল্য তাদের পদচুম্বন করবেই। এখানে জ্ঞান কেউ বিলিয়ে দেবে না; আহরণ করতে হবে নিজ তাগিদে।

শুধু নিজ সিনিয়র নয়, অন্য অভিজ্ঞ আইনজীবীদের সওয়াল-জবাব ও যুক্তি উপস্থাপনের কৌশলগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করুন। আইনি রেফারেন্সগুলো নিয়মিত ডায়েরিতে টুকে রাখুন। সময়ের পরিক্রমায় আপনি নিজেই হয়ে উঠবেন এক জীবন্ত রেফারেন্স।

আরও পড়ুন : অযৌক্তিকভাবে আইন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে: আইনমন্ত্রী

আইন অঙ্গনে এমন অনেক প্রাজ্ঞ আইনজীবী আছেন যারা প্রতি শুনানিতে বিপুল অংকের ফি গ্রহণ করেন। কিছুদিন আগে একটি অনলাইন ম্যাগাজিনে দেখেছিলাম, ভারতের শীর্ষ কিছু আইনজীবী শুনানি প্রতি ১৫-২৫ লক্ষ টাকা ফি নেন। এই উচ্চতা কোনো আকস্মিক প্রাপ্তি নয়; বরং বছরের পর বছর আদালতের অলিন্দে কাটানো কঠোর পরিশ্রমের ফসল। তবে মনে রাখবেন, আইনজীবীর প্রকৃত সার্থকতা পারিশ্রমিকের অংকে নয়, বরং মক্কেলের আস্থায়। আপনি সৎ ও আন্তরিক হলে মানুষ আপনাকে খুঁজে নেবেই।

দুঃখজনকভাবে, এই দীর্ঘমেয়াদী সংগ্রামের ধৈর্য অনেকের নেই। ফলে আমরা অনেক মেধাবী আইন-কারিগর হারাচ্ছি, বিশেষ করে সিভিল প্র্যাকটিসে এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। দক্ষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক তরুণ আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে চলে যাচ্ছেন। সব চেম্বারের পক্ষেও পর্যাপ্ত সম্মানী দেওয়া সম্ভব হয় না- এটিও এক রূঢ় বাস্তবতা।

ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় বার কাউন্সিল ও সমিতিগুলোর কার্যকর উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি। এনরোলমেন্ট-পরবর্তী প্রথম পাঁচ বছর নবীনদের জন্য অন্তত ৫০০০ টাকা মাসিক বৃত্তি, উৎসব ভাতা এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়া ড্রাফটিং কর্মশালা ও প্রতিটি বারে অনলাইন লিগ্যাল ডাটাবেস (যেমন:বিডিলেক্স, সিএলসিবিডি) ব্যবহারের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

মৌলিক চাহিদা পূরণ না হলে কোনো মানুষের পক্ষেই পেশাগত উৎকর্ষ অর্জন করা সম্ভব নয়। একটি মানবিক ও শক্তিশালী বিচারব্যবস্থা গড়তে তরুণ আইনজীবীদের সুপরিকল্পিত পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা আজ অনস্বীকার্য।

লেখক: মো. সাইফুল ইসলাম পলাশ; অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, নাটোর।