মোকাররামুছ সাকলান
মোকাররামুছ সাকলান

‘গণঅভ্যুত্থান হলে সংবিধান অটোমেটিক অকার্যকর হয়’—এই ধারণার সমালোচনা

সাংবিধানিক স্থিতিস্থাপকতা ও গণ-সার্বভৌমত্ব

সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির ভাইয়ের একটি ফেসবুক পোস্ট সম্প্রতি আমার চোখে পড়েছে। তিনি লিখেছেন:

দুনিয়ার কোথাও সংবিধান মেনে গণঅভ্যুত্থান হয় না। গণঅভ্যুত্থান হলে সংবিধান অটোমেটিক অকার্যকর হয়ে যায়। যতই গুজামিল দেয়া হউক ছিদ্র থাকবেই। এটাই চরম বাস্তবতা।

— শিশির মনির, সিনিয়র অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ। ফেসবুক। ২৩ মার্চ, রাত ১১.৫০।

সুপ্রিম কোর্টের একজন সিনিয়র আইনজীবীর এমন বক্তব্য সাধারণ আলোচনায় একটা ধারণা তৈরি করেছে যে, গণঅভ্যুত্থান মানেই আগের সংবিধান আপনি-আপনি বাতিল হয়ে যায়। আর সেটাকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা মানে শুধু ‘গুজামিল’ (প্যাঁচানো বা জোড়াতালি) দেওয়া, যাতে ফাঁক থেকেই যায়।

এটা দেখতে যেমন সরল ও বাস্তবসম্মত মনে হতে পারে, তেমনই এটি আইনগত ও ব্যবহারিক দিক থেকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। হ্যাঁ, ইতিহাসে বড় বড় অভ্যুত্থান ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯), ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯), মিসরের আরব বসন্ত (২০১১) বা ৯০ এ বাংলাদেশের অভ্যুত্থান সব সময়েই সংবিধান নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে প্রতিটি অভ্যুত্থানই সংবিধানকে পুরোপুরি শেষ করে দেয়।

একটা মৌলিক কথা: রাজনৈতিক পটপরিবর্তন মানেই আইনি শূন্যতা তৈরি হয় এমনটা নয়। সংবিধান হঠাৎ করেই মরে যায় না, বরং সংকটের মধ্যে দিয়ে তার নতুন রূপ তৈরি হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, অভ্যুত্থানের পর মানুষ সংবিধানের কাঠামোতেই ফিরে যায়। আমেরিকার আইনবিদ ব্রুস অ্যাকারম্যান যেমন বলেছেন, বিপ্লবের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শাসনব্যবস্থা সংবিধানের শত্রু নয়, বরং তার উর্বর ভূমি।

আরও পড়ুন : স্বাধীনতা দিবসে স্মৃতিসৌধে প্রধান বিচারপতির শ্রদ্ধা নিবেদন

আইনের দার্শনিক ইমানুয়েল সিয়েয়েস বলেছিলেন, ‘জাতি’ নামক শক্তিই সব সংবিধানের উৎস। তাই জাতি যখন রাস্তায় নামে, তখন সে আগের সংবিধান বাতিল করতে পারে। কিন্তু সিয়েয়েসও বলেননি যে এই বাতিলের পর কোনো সংবিধান লাগবে না। বরং নতুন করে গঠনের জন্যই এই ক্ষমতার ব্যবহার। উদ্দেশ্য শুধু ধ্বংস করা নয়, নতুন করে তৈরি করা।

জার্মান আইনবিদ কার্ল শ্মিটের মতে, সংকটের সময় আইন স্থগিত হয়ে যায়। আর সেটা করার ক্ষমতাই প্রকৃত সার্বভৌমত্ব। গণঅভ্যুত্থান তো সবচেয়ে বড় সংকট। কিন্তু শ্মিটও বলেছেন, এই স্থগিত অবস্থা চিরস্থায়ী নয়। সংকট কেটে গেলে নতুন করে আইনের কাঠামো দাঁড় করাতেই হয়।

অস্ট্রিয়ান আইনবিদ হ্যান্স কেলসেনের ভাষায়, কোনো সংবিধানের ভিত্তি হলো একটি ‘মৌলিক নিয়ম’ (গ্রুন্ডনর্ম)। অভ্যুত্থানের পর সেই মৌলিক নিয়ম বদলে যেতে পারে। কিন্তু আদালত ও রাষ্ট্রের নানা কাঠামো যদি পুরনো নিয়মকেই বহাল রাখে, তাহলে সংবিধান অটোমেটিক শেষ হয়ে যায় এমনটা ভাবার কারণ নেই।

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ফরাসি বিপ্লবের সময়ও পুরনো আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি। বিপ্লবীরা অনেক কিছু ধরে রেখেছিলেন। আরও সাম্প্রতিক উদাহরণ পূর্ব ইউরোপের। ১৯৮৯-৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোস্লোভাকিয়ায় গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। কিন্তু সেখানে পুরনো সংবিধান পুরোপুরি বাতিল না করে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে পরিবর্তন আনা হয়। অর্থাৎ পুরনো কাঠামোর মধ্য দিয়েই নতুন গণতান্ত্রিক রূপ তৈরি হয়েছিল। আইনবিদ জন এলস্টার একে ‘সাংবিধানিক বুটস্ট্র্যাপিং’ বলেন অর্থাৎ যা আগে ছিল, সেটাকেই কাজে লাগিয়ে নতুন ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

দক্ষিণ আফ্রিকার উদাহরণও খুব প্রাসঙ্গিক। বর্ণবাদী শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের পর সেখানে সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি হয়নি। বরং পুরনো আইনের কিছু অংশ ধরে রেখে, আলোচনার ভিত্তিতে একটি অন্তর্বর্তী সংবিধান তৈরি করা হয়, যার ভিত্তিতেই পরবর্তী সংবিধান রচিত হয়। প্রধান বিচারপতি ইসমাইল মাহোমেদ একে ‘অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক সেতু’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

আরও পড়ুন : স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানালেন নবনিযুক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল

বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও অনেক কিছু শেখায়। ১৯৭৫-এর পরের সামরিক অভ্যুত্থান, ১৯৯০-এর গণঅভ্যুত্থান প্রত্যেকবারই সংবিধানে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশ সংবিধানের কাঠামোতেই ফিরেছে। সুপ্রিম কোর্ট ‘আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বনাম বাংলাদেশ’ মামলায় বলেছে, সংবিধানের কিছু মৌলিক কাঠামো আছে যা কোনো অভ্যুত্থান বা সংকটেও বিলুপ্ত হয় না। এমনকি ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পরও দেখা গেল, নতুন ব্যবস্থা দাঁড় করাতে সংবিধানের বিভিন্ন ধারা, বিচার বিভাগ ও আইনজীবী, নাগরিক সমাজের মতামতকে কাজে লাগানো হয়েছে। এটা কোনো ‘গুজামিল’ নয়, বরং সংকটে সংবিধানকে টিকিয়ে রাখার প্রক্রিয়া।

এই ‘অটোমেটিক অকার্যকর’ ধারণাটি সবচেয়ে বড় বিপদ ডেকে আনে যে, এটি স্বৈরতন্ত্রের পথ খুলে দেয়। যদি ধরে নেওয়া হয় অভ্যুত্থানের পর আর কোনো আইনি বাধা নেই, তাহলে যে কেউ ক্ষমতা দখল করলেই সে ইচ্ছেমতো শাসন করতে পারে। মিশরের কথা ধরা যাক। ২০১১ সালের জানুয়ারির অভ্যুত্থান হোসনি মুবারককে ক্ষমতাচ্যুত করে। কিন্তু ‘সংবিধান শেষ’ হয়ে যাওয়ায় ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, যা পূরণ করে সেনাবাহিনী। জনতার অভ্যুত্থানের ফল পায় সেনা শাসন। তাই অভ্যুত্থানের পর সংবিধান না থাকা জনগণের জয়কে পুঁজি করে স্বৈরাচার ডেকে আনে।

অনেকে মনে করেন, সংবিধান মানে শুধু শাসক ও শাসিতের মধ্যে একটা চুক্তি। তাই শাসকের বিরুদ্ধে জনগণ উঠলে সেই চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু সংবিধান তার চেয়ে অনেক বেশি। এটি শুধু সরকার গঠনের নিয়মকানুন নয়, এটি জনগণের অধিকার, স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা। অভ্যুত্থানের নামে যদি এই সব কিছু ‘অটোমেটিক’ বাতিল হয়ে যায়, তাহলে অভ্যুত্থান তার নিজের মূল উদ্দেশ্যকেই শেষ করে দেয়। কারণ অধিকার ফিরে পেতেই তো অভ্যুত্থান।

আরেকটি কথা, যেকোনো সংবিধানেই কিছু অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন বা ‘ছিদ্র’ থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে দাসপ্রথা বহু বছর ধরে ছিল, ভারতের সংবিধানের ভেতরেও নানা অসামঞ্জস্য আছে। এই টানাপোড়েনগুলো দুর্বলতার নিদর্শন নয়, বরং ভেতর থেকে গণতন্ত্রের বিকাশের জায়গা। যেমন আইনবিদ লরেন্স ট্রাইব বলেছেন, এগুলো ‘গঠনগত অস্পষ্টতা’, যা সংবিধানকে সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সাহায্য করে।

আরও পড়ুন : আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতির ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ হ্যাক, থানায় জিডি

আধুনিক আইনবিদ টম গিন্সবার্গ ও আজিজ হক ‘সাংবিধানিক স্থিতিস্থাপকতা’ (constitutional resilience) শব্দটা ব্যবহার করেছেন। তাদের গবেষণা বলছে, সংবিধান অভ্যুত্থান, সঙ্কট, অর্থনৈতিক পতন—সব পার করেও টিকে থাকে, যদি তার ভেতরে অভিযোজনের ক্ষমতা থাকে। যেমন সংস্কারের পদ্ধতি, বিচারিক পর্যালোচনা, জরুরি অবস্থার বিধান। আর রুটি টাইটেল, ভিকি জ্যাকসনের মতো আইনবিদরা ‘ট্রানজিশনাল কনস্টিটিউশনালিজম’ বলতে বোঝাচ্ছেন, অভ্যুত্থানের পর নতুন আইনি কাঠামো পুরনো ও নতুনের মিশ্রণে তৈরি হয়। এটা ‘প্যাঁচানো’ নয়, এটাই স্বাভাবিক পদ্ধতি।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র ও নির্বাচন সহায়তা সংস্থার (আইডিয়া) হিসাব অনুযায়ী, ১৯৪৫ সালের পর বিশ্বে যত সাংবিধানিক রূপান্তর হয়েছে, তার ১০ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে দুই বছরের বেশি সময় ধরে সাংবিধানিক শূন্যতা ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরনো সংবিধানের ধারাগুলো টিকিয়ে রাখা হয়েছে বা দ্রুত নতুন সংবিধান তৈরি করা হয়েছে।

এসব ক্ষেত্রে আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাকিস্তানে ১৯৯৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর জাফর আলী শাহ মামলায় সুপ্রিম কোর্ট অভ্যুত্থানকে বৈধতা দিলেও শর্ত দিয়েছিল এবং বেসামরিক শাসনে ফেরার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। পর্তুগালের কার্নেশন বিপ্লবের পর ১৯৭৬ সালের সংবিধান তৈরিতেও পুরনো সাংবিধানিক নীতিমালা কাজে লাগানো হয়। একইভাবে হাঙ্গেরি, কলম্বিয়া, নেপালেও আদালত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে।

পরিশেষে শিশির মনির ভাইকে বলতে চাই যে, গণঅভ্যুত্থান মানেই যে সংবিধান আপনি-আপনি বাতিল হয়ে যায় এই ধারণা ইতিহাস, আইন ও রাজনীতির সরলীকরণ মাত্র। সংবিধান তত্ত্ব, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা এবং গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে দেখা যায়, অভ্যুত্থানের পরও সংবিধান টিকিয়ে রাখার বা নতুন করে গড়ার প্রচেষ্টা চলে। আর সেই প্রচেষ্টায় ‘ছিদ্র’ থাকাটা দুর্বলতা নয়, বরং গণতন্ত্রের প্রমাণ। কারণ গণতন্ত্র কখনো নিখুঁত হয় না, এটি মানুষের মতোই ভুল-ভাঙার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলে।

আইনবিদ রুটি টাইটেলের ভাষায়, রূপান্তরকালীন সাংবিধানিকতার কাজই হলো আইনের মাধ্যম দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বাস্তবায়িত করা। এই পথচলা কখনো নিখুঁত হবে না। তাতে ছিদ্র থাকবেই। কিন্তু এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক পথ।

লেখক : মোকাররামুছ সাকলান, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।