অভিযোগ ছিল মাত্র ৫ পয়সার। সেই সামান্য অভিযোগের জেরে চাকরি হারাতে হয় এক বাস কন্ডাক্টরকে। এরপর নিজের নির্দোষ প্রমাণ করতে টানা ৪০ বছর আইনি লড়াই চালিয়ে যান তিনি। এই ঘটনা একদিকে যেমন বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে, অন্যদিকে তেমনি এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ ধৈর্য, আত্মসম্মান এবং সত্যের প্রতি অটল থাকার বিরল উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
এই ঘটনার কেন্দ্রীয় চরিত্র দিল্লির বাস কন্ডাক্টর রণবীর সিং যাদব। ১৯৭৩ সালে তিনি দিল্লি ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (ডিটিসি)-এর অধীনে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ ওঠে, তিনি এক নারী যাত্রীকে ১৫ পয়সার পরিবর্তে ১০ পয়সার টিকিট দিয়ে অতিরিক্ত ৫ পয়সা নিজের কাছে রেখে দেন।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয় এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তে অভিযুক্ত হওয়ায় ১৯৭৬ সালে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। মাত্র ৫ পয়সার অভিযোগে চাকরি হারানোয় ক্ষুব্ধ হয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে আইনি লড়াই শুরু করেন রণবীর।
সে সময় তার পরিবারের দায়িত্ব ছিল তার ওপর, ছিল ছোট দুই সন্তান। চাকরি হারানোর পর শুধু আর্থিক সংকটই নয়, সামাজিক অপমানও তাকে সহ্য করতে হয়। সমাজে তাকে ‘চোর’ হিসেবে অপবাদ দেওয়া হয়। এমনকি তার নিজের সন্তানরাও একসময় প্রশ্ন করেছিল—“বাবা, তুমি কি সত্যিই চুরি করেছ?”
আরও পড়ুন : একাধিক বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হলেও ভোট একবারই—কলকাতা হাইকোর্ট
এই অপমান ও কষ্টই তাকে সত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অটল রাখে। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় পার হয়ে যায় আদালতের সিঁড়ি ভেঙে। অন্যরা যখন তীর্থযাত্রায় যেতেন, তখন তিনি আদালতে যেতেন নিজের সম্মান ফেরানোর আশায়।
১৯৯০ সালে ইন্ডিয়ান লেবার কোর্ট তার বরখাস্তকে ভুল বলে রায় দেয়। এতে আশার আলো দেখেন রণবীর। কিন্তু ডিটিসি কর্তৃপক্ষ সেই রায় মেনে না নিয়ে বিষয়টি হাইকোর্টে নিয়ে যায়। এদিকে ১৯৯৪ সালে ভারত সরকার ৫ পয়সার মুদ্রা বাতিল করে দিলেও মামলা চলতেই থাকে।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর অবশেষে ২০১৬ সালে দিল্লি হাইকোর্ট রণবীর সিং যাদবের পক্ষে রায় দেয়। আদালত তাকে ৩০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ, ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা গ্র্যাচুইটি এবং ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা কন্ট্রিবিউটরি প্রভিডেন্ট ফান্ড দেওয়ার নির্দেশ দেয়। এ মামলায় ডিটিসি কর্তৃপক্ষের খরচ হয় প্রায় ৪৭ হাজার টাকা, যদিও রণবীরের ব্যক্তিগত ব্যয়ের পরিমাণ জানা যায়নি।
রায় পাওয়ার পর এক সাক্ষাৎকারে রণবীর জানান, এই অভিযোগ তার ব্যক্তিগত জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। নিজের সন্তানদের কাছেও তাকে নির্দোষ প্রমাণ করতে হয়েছে। তার স্ত্রী বিমলা বলেন, “লড়াইটা ছিল ৫ পয়সার, কিন্তু এর মূল্য আমরা লক্ষ লক্ষ টাকায় দিয়েছি।”
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ঘটনা আবারও আলোচনায় আসে। অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আইনি লড়াইয়ে জয় এলেও জীবনের সেরা সময় হারিয়ে ফেলেছেন তিনি। আদালতও স্বীকার করেছে, এত দীর্ঘ লড়াই একজন সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের ট্র্যাজেডি।
এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার যদি বিলম্বিত হয়, তবে সেই বিচার অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়ে।

